Ajker Patrika

ইসলামে দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের মর্যাদা

মুফতি খালেদ কাসেমি
ইসলামে দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের মর্যাদা
ছবি: সংগৃহীত

মহানবী (সা.) আরবের সমাজে প্রচলিত বৈষম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা আমূল বদলে দিয়েছিলেন। তিনি দরিদ্রদের দূর দূর না করে পরম স্নেহে বুকে টেনে নিয়েছিলেন, তাদের উপযুক্ত সামাজিক মর্যাদা দিয়েছেন এবং নিজেকেও চিরকাল তাদের কাতারে শামিল রাখতে ভালোবেসেছিলেন। হজরত জুলাইবিব (রা.) নামে এক সাধারণ সাহাবির জীবনের ঘটনাই এর বড় প্রমাণ।

জুলাইবিব (রা.) ছিলেন নিতান্তই দরিদ্র ও আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ চেহারার একজন মানুষ; কোনো সম্ভ্রান্ত বংশের পরিচয়ও তাঁর ছিল না। সে যুগের সাধারণ মদিনাবাসী তাঁকে খুব একটা গুরুত্ব দিত না। কিন্তু নবীজির (সা.) হৃদয়ে তাঁর স্থান ছিল অনেক উঁচুতে। এক যুদ্ধ শেষে মহানবী (সা.) উপস্থিত সাহাবিদের কাছে জানতে চাইলেন, ‘তোমাদের পরিচিত কেউ কি শহীদ হয়েছে?’ সাহাবিরা কয়েকজন প্রখ্যাত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করলেন। সব শুনে নবীজি (সা.) করুণ কণ্ঠে বললেন, ‘কিন্তু আমি যে জুলাইবিবকে খুঁজে পাচ্ছি না!’

অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেল, ময়দানে সাতজন শত্রুকে পরাস্ত করে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে তিনি নিজে শাহাদাতবরণ করেছেন। প্রিয় সাহাবির মরদেহ দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে মহানবী (সা.) বললেন, ‘জুলাইবিব আমার থেকে, আর আমি জুলাইবিবের থেকে!’ এরপর আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজে পরম মমতায় তাঁর মরদেহ বহন করে কবরে শায়িত করলেন। (সহিহ মুসলিম)। সামাজিক বিচারে যিনি ছিলেন নিতান্তই নিঃস্ব, নবীজি (সা.)-এর ভালোবাসায় তিনি লাভ করলেন জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদা।

নবীজি (সা.) কেবল দরিদ্রদের ভালোই বাসেননি, তাঁর নিজের জীবনযাপনও ছিল অত্যন্ত অনাড়ম্বর ও সাদামাটা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী (সা.)-এর পরিবার তাঁর ওফাত পর্যন্ত একাধারে তিন দিনও তৃপ্তিসহকারে আহার করতে পারেননি।’ (সহিহ বুখারি)। যিনি চাইলে আরবের অধিপতি হয়ে রাজকীয় সুখে দিন কাটাতে পারতেন, সেই নবী স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন সাধারণ অনাহারী মানুষের জীবন।

সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্বল মানুষের আখিরাতের মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমি কি তোমাদের জান্নাতিদের পরিচয় দেব না? তারা হলো সেই সব সরল ও দুর্বল মানুষ, যাদের সাধারণ সমাজ দুর্বল মনে করে অবহেলা করে। অথচ তারা যদি কোনো বিষয়ে আল্লাহর নামে শপথ করে ফেলে, তবে আল্লাহ তাদের শপথ রক্ষা করেন।’ (সহিহ বুখারি)। অর্থাৎ, দুনিয়ার মানদণ্ডে যারা সাধারণ, রবের দরবারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা অপূরণীয়।

মক্কার স্বার্থবাদী কুরাইশ নেতারা একবার মহানবী (সা.)-কে প্রস্তাব দিয়েছিল, বিলাল, সুহাইব কিংবা আম্মার (রা.)-এর মতো দরিদ্র ও প্রাক্তন ক্রীতদাসদের যদি দরবার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবেই কেবল তারা নবীজি (সা.)-এর মজলিশে বসতে রাজি। কিন্তু মানবতার নবী কখনো সেই বৈষম্যমূলক শর্ত মেনে নেননি। উল্টো আসমান থেকে ওহি নাজিল করে আল্লাহ তাআলা তাঁর হাবিবকে জানিয়ে দেন, ‘যারা সকাল-সন্ধ্যায় নিজেদের রবের সন্তুষ্টির আশায় তাঁকে ডাকে, আপনি তাদের তাড়িয়ে দেবেন না।’ (সুরা আল-আনআম: ৫২)। বিলাল, সুহাইব ও আম্মার (রা.)-দের মতো নিঃস্ব সাহাবিদের তিনি বানিয়েছিলেন নিজের সবচেয়ে নিকটজন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আধুনিক যুগে এসেও আমরা প্রায়ই দরিদ্র ও মেহনতি মানুষের অবমূল্যায়ন করি, তাদের সঙ্গে বসতে বা কথা বলতে সংকোচ বোধ করি। অথচ আমাদের প্রিয় নবী (সা.) আমাদের শিখিয়ে গেছেন বিপরীত এক সৌন্দর্যের পাঠ—দরিদ্রকে পরম আদরে আপন করে নেওয়ার পাঠ, ইনসাফ ও সাম্যের পাঠ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত