Ajker Patrika

ইটনা শাহি মসজিদ: হাওরে ৫০০ বছরের মোগল স্থাপত্য

মাহমুদ হাসান ফাহিম 
আপডেট : ১২ মে ২০২৬, ১২: ৩৯
ইটনা শাহি মসজিদ: হাওরে ৫০০ বছরের মোগল স্থাপত্য
ইটনা শাহি মসজিদ, কিশোরগঞ্জ। ছবি: সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরবেষ্টিত উপজেলা ইটনা। জল ও স্থলের এই মিতালির মাঝে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মোগল স্থাপত্যশৈলীর এক বিস্ময়—‘ইটনা শাহি মসজিদ’। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি ‘গায়েবি মসজিদ’ নামেই বেশি পরিচিত। উপজেলার সদর ইউনিয়নের বড়হাটি এলাকায় অবস্থিত মসজিদটি পর্যটক ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

নির্মাণ ইতিহাস ও পটভূমি

নির্ভুল শিলালিপি না থাকায় মসজিদটির সঠিক বয়স নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। তবে জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ বছর আগে বারোভূঁইয়ার প্রধান ঈসা খাঁর সভাসদ মজলিশ দেলোয়ার এটি নির্মাণ করেন। তৎকালীন হাওরাঞ্চলে এটি ছিল তাঁর প্রশাসনিক কেন্দ্র। ১৯৯৪ সালে এক ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষার তথ্যানুযায়ী, স্থাপনাটি ৫০০ থেকে ৬০০ বছরের পুরোনো হতে পারে।

স্থাপত্যশৈলী ও কারুকার্য

মোগল ও সুলতানি স্থাপত্যরীতির এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায় এই মসজিদে। এটি একটি উঁচু বেদির ওপর নির্মিত, যার চারপাশ মোটা দেয়াল দিয়ে ঘেরা। মসজিদের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  1. আকার ও বুরুজ: মসজিদটি ২৪ মিটার দীর্ঘ এবং ৯ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত। এর চার কোণে চারটি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ রয়েছে।
  2. গম্বুজ: ছাদের ওপর রয়েছে বিশালাকৃতির তিনটি গম্বুজ, যা দূর থেকে পথচারীদের দৃষ্টি কাড়ে।
  3. মেহরাব: মসজিদের ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে তিনটি অর্ধগোলাকার মেহরাব রয়েছে। মূল মেহরাব ও তার দুপাশের অলংকরণে ফুলদানি, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার ছোঁয়া রয়েছে।
  4. চিনি-টিকরিশিল্প: মসজিদের প্রবেশদ্বার ও মেহরাবগুলোতে চিনি-টিকরি (চীনামাটির পাত্রের ভাঙা অংশ ও কাচের টুকরা) দিয়ে তৈরি সূক্ষ্ম নকশা আজও অমলিন।

অনন্য ক্যালিগ্রাফি

সাধারণ মোগল স্থাপত্যে সচরাচর দেখা যায় না—এমন কিছু ক্যালিগ্রাফি এই মসজিদের অন্যতম বিশেষত্ব। সদর ফটক ও প্রবেশদ্বারগুলোতে কোরআনের আয়াত ও হাদিসের বাণী খোদাই করা আছে:

  • সদর ফটক: সুরা জিনের ১৮ নম্বর আয়াতের অংশ—‘মসজিদসমূহ আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করার জন্য, সুতরাং, তোমরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কারও ইবাদত কোরো না।’
  • প্রবেশদ্বার: তিন দরজার ওপর ধারাবাহিকভাবে কালেমা শাহাদাত উৎকীর্ণ করা আছে।
  • মেহরাব: মূল মেহরাবের ওপর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ এবং অন্যান্য দেয়ালে ‘লা তাকনাতু মিন রাহমাতিল্লাহ’ খোদাই করা।

প্রাকৃতিক শীতাতপ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য

মসজিদটির দেয়াল এমনভাবে তৈরি যে, প্রচণ্ড গরমেও এর অভ্যন্তর ভাগ শীতল থাকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, উপযুক্ত নকশার কারণে বিদ্যুৎ ছাড়াও দিনের বেলা মসজিদটি বেশ আলোকিত থাকে। দেয়ালের পাথরের কাজগুলো শত বছর পরেও এখনো উজ্জ্বল দেখায়।

ঐতিহ্যের ধারক ইটনাবাসী

স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে গর্বিত। তাঁদের মতে, এটি কেবল একটি মসজিদ নয়; এটি বাংলার হাওরাঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। শত শত বছর পুরোনো এই মসজিদে নামাজ আদায় করতে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ভিড় জমান। সংস্কারের ছোঁয়ায় এর আসল কারুকার্য কিছুটা ঢাকা পড়লেও এর প্রবেশদ্বার ও তোরণগুলো আজও মোগল আমলের আভিজাত্যের জানান দেয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত