Ajker Patrika

মায়ের মর্যাদা ও সন্তানের দায়িত্ব

কাউসার লাবীব
মায়ের মর্যাদা ও সন্তানের দায়িত্ব

পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ, নির্ভরযোগ্য এবং অকৃত্রিম ভালোবাসার নাম হলো ‘মা’। একজন মানুষ যখন প্রথম পৃথিবীর আলো দেখে, তখন তার প্রথম আশ্রয়, প্রথম নিরাপত্তা এবং মমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন মা। মাতৃত্ব নারীর অহংকার। সন্তান গর্ভে ধারণ করা এবং জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা আল্লাহ তাআলা একমাত্র নারীকেই দিয়েছেন। পৃথিবীতে মানুষের জন্মপরম্পরা ধরে রাখতে এটিই আল্লাহর অমোঘ বিধান। ইসলাম এই পবিত্র সম্পর্কটিকে শুধু আবেগ বা পারিবারিক বন্ধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; মায়ের মর্যাদাকে উন্নীত করেছে ইবাদতের পর্যায়ে এবং সম্মানের সর্বোচ্চ শিখরে।

গর্ভধারণ ও প্রসব: মধুর যন্ত্রণা ও অসীম পুরস্কার

সন্তান গর্ভে ধারণ করা এবং প্রসবের কঠিন যন্ত্রণা সহ্য করা সন্তানের প্রতি মায়ের বিরাট অনুগ্রহ। একজন গর্ভবতী নারী শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় ভোগেন, নানা রকম সমস্যার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৯ মাস সময় পার করেন। তবে নিদারুণ কষ্টের পর একজন নারী যখন সন্তান জন্ম দেন, তখন সন্তানের ফুটফুটে নিষ্পাপ চেহারার দিকে তাকিয়েই অতীতের সব কষ্ট-বেদনা মুহূর্তেই ভুলে যান। এই মধুর যন্ত্রণা থেকেই নারীর সহজাত বৈশিষ্ট্য পূর্ণতা লাভ করে।

ইসলাম এই কষ্টের প্রতিদান দিয়েছে অসামান্য। কোনো মুসলিমের গায়ে একটি ছোট কাঁটা বিঁধলেও আল্লাহ তার বিনিময়ে গুনাহ মাফ করে দেন, সেখানে সন্তান প্রসবের নিদারুণ কষ্টের বিনিময় বহু গুণ বেশি। এক হাদিসে এসেছে, ‘যে নারী গর্ভাবস্থায় মারা যান, তিনি শহীদ।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩১১১)

মায়ের অবহেলা করা এবং তাঁর অবাধ্য হওয়াকে ইসলামে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা মায়ের অবাধ্য হওয়াকে তোমাদের জন্য হারাম করে দিয়েছেন।’ (সহিহ মুসলিম: ৪৫৮০)

কোরআনের আয়নায় মায়ের অবদান

মা-বাবার আনুগত্যের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ যে আয়াতগুলো নাজিল করেছেন, তাতে বিশেষভাবে মায়ের এই অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমরা মানুষকে তার মা-বাবার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করেন, আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। আমারই কাছে তো ফিরতে হবে।’ (সুরা লোকমান: ১৪)

একইভাবে সুরা আহকাফের ১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মায়ের গর্ভধারণ ও দুধপানের এই সময়কালকে ‘ত্রিশ মাস’ উল্লেখ করে মায়ের সীমাহীন ত্যাগের প্রতি সন্তানের কৃতজ্ঞ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি মহান আল্লাহ তাঁর নবীদেরও মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন হজরত ইসা (আ.)-এর জবানিতে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আমি যেন আমার মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করি।’ (সুরা মারইয়াম: ৩২)

মায়ের সেবায় জান্নাত লাভ

একজন মুমিনের জন্য জান্নাত লাভের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মায়ের সেবা। হজরত মুআবিয়া ইবনে জাহিমা আসসালামি (রা.) যখন রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে জিহাদে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন নবীজি (সা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার মা কি বেঁচে আছেন?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’। তখন রাসুল (সা.) ঐতিহাসিক সেই ইরশাদটি করেন, ‘মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকো, কেননা তাঁর পায়ের নিচেই জান্নাত।’ (সুনানে নাসায়ি: ৩১০৪)

শুধু তা-ই নয়, মায়ের প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টিতেও রয়েছে বিপুল সওয়াব। হাদিসে এসেছে, যখন কোনো অনুগত সন্তান নিজের মা-বাবার দিকে অনুগ্রহের ও মহব্বতের নজরে তাকায়, আল্লাহ তাআলা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে ‘কবুল হজের’ সওয়াব দান করেন। (সুনানে বায়হাকি)

মায়ের সেবা করে ইসলামের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন উয়াইস আল কারনি (রহ.)। তিনি মহানবী (সা.)-এর যুগের মানুষ হয়েও শুধু বৃদ্ধ ও অসুস্থ মায়ের সেবা করার কারণে মদিনায় এসে নবীজি (সা.)-এর সাক্ষাৎ লাভ করতে পারেননি। অথচ মহানবী (সা.) তাঁর এই ত্যাগের প্রশংসা করে সাহাবিদের বলেছিলেন, ইয়েমেন থেকে উয়াইস নামের এক ব্যক্তি আসবে, যার শুধু মা ছাড়া আর কেউ নেই। তোমরা কেউ যদি তার সাক্ষাৎ পাও, সে যেন তাকে দিয়ে নিজের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ে নেয়। (সহিহ মুসলিম: ২৫৪২)

মাতৃত্ব আল্লাহর বিশেষ রহমত এবং দুনিয়া-আখিরাতে বিপুল কল্যাণ লাভের মাধ্যম। মায়ের এই ঋণ কোনো সন্তান কখনো শোধ করতে পারবে না, কিন্তু প্রতিনিয়ত সেবা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মাধ্যমে তাঁর মুখে হাসি ফোটানো প্রতিটি সন্তানের ওপর অবশ্যপালনীয় কর্তব্য।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত