Ajker Patrika

ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী অভিযানে শ্রমিক-সংকটে মার্কিন মাংসশিল্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩: ২১
ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী অভিযানে শ্রমিক-সংকটে মার্কিন মাংসশিল্প
যুক্তরাষ্ট্রে গরুর সংখ্যা ৭৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের চালানো অভিবাসনবিরোধী অভিযানের প্রভাব পড়ছে দেশটির বড় শিল্পগুলোতেও। সম্প্রতি কানসাসে অভিযান চালিয়েছে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। গরু মোটাতাজাকরণ খামার ও পশু জবাইখানার জন্য পরিচিত অঞ্চলটিতে অভিযানের প্রভাব এরই মধ্যে পড়েছে গরুর মাংসের শিল্পে। স্থানীয় সংগঠক ও কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মীদের একটি বড় অংশ কাজে না আসায় মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে কাজ ধীর হয়ে গেছে। এতে জবাইয়ের অপেক্ষায় থাকা গরুর সংখ্যাও বেড়েছে।

দুজন কমিউনিটি সংগঠক এবং পশুপালন খাতের প্রতিনিধিত্বকারী তিনটি সংগঠন রয়টার্সকে জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় অভিবাসী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ কাজে যাননি। ফলে গরুর মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে কাজের গতি কমেছে এবং খামারগুলোতে গরু জমে গেছে।

আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে গরুর মাংসের দামসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ে উদ্বেগ রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গরুর মাংসের দাম নিয়ন্ত্রণে নানা নীতি নিয়েছেন।

শিল্প খাত ও শ্রমিক সংগঠনের কর্মকর্তাদের মতে, অভিবাসনবিরোধী অভিযান এসব নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এতে ইতিমধ্যে রেকর্ড উচ্চতায় থাকা গরুর মাংসের দাম আরও বাড়তে পারে। চলতি সপ্তাহে গরুর মাংসের ফিউচারসের বাজারেও বড় ওঠানামা দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গরুর সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি, অন্যদিকে অভিবাসন অভিযানের কারণে মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণে সৃষ্ট বাধা—দুই দিক বিবেচনা করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, অভিযানে কয়েক ডজন মানুষকে আটক করা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েইন মুলিন এক্সে পাঁচজনের ছবি প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবি করেন, কানসাসে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিইর কর্মকর্তারা ওই ব্যক্তিদের আটক করেছেন এবং তাঁদের ‘সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের’ কয়েকজন বলে উল্লেখ করেন।

মুলিন প্রত্যেককে ‘অপরাধী অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে বর্ণনা করলেও রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের অভিবাসন পরিস্থিতি বা অপরাধের রেকর্ড যাচাই করতে পারেনি।

মুলিন বলেন, ‘আইসিইর আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা খুনি, ধর্ষক, মাদক পাচারকারী এবং চূড়ান্তভাবে বহিষ্কারের আদেশ পাওয়া অবৈধ অভিবাসীসহ ভয়ংকর অপরাধীদের লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে।’ তবে আইসিই কানসাসের কর্মস্থলগুলোতে অভিযান চালাচ্ছে না বলেও তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে স্থানীয় সংগঠক ও সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সপ্তাহে কানসাসের ডজ সিটি, লিবারাল ও গার্ডেন সিটির আশপাশে আইসিই কর্মকর্তারা গাড়ি থামিয়ে যাত্রীদের নাগরিকত্বের বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন। এসব ছোট শহরের জনসংখ্যার বড় অংশ লাতিনো। তাঁদের ভাষ্য, অভিবাসন কর্মকর্তারা মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও একটি বড় দুগ্ধ খামারের আশপাশেও টহল দিয়েছেন এবং সেখানে গাড়ি পার্ক করেছেন।

এর প্রভাব পড়েছে মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, গরু মোটাতাজাকরণ খামার, দুগ্ধ খামার ও শস্য ব্যবসায়। হাজার হাজার গরুর সরবরাহ ও পরিবহনও বিলম্বিত হয়েছে বলে জানিয়েছে কানসাস লাইভস্টক অ্যাসোসিয়েশন, ওকলাহোমা ক্যাটলমেনস অ্যাসোসিয়েশন এবং টেক্সাস ক্যাটল ফিডার্স অ্যাসোসিয়েশন।

এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনগুলো বলেছে, ‘আইসিইর এসব অভিযান গরুর মাংস উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বৈধ কাগজপত্র থাকা দক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে। এসব শ্রমিকই গরুর সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখেন। এ ধরনের বাধার ফলে ভোক্তাদের জন্য গরুর মাংসের দাম আরও বাড়বে।’

এ দিকে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে গরুর মাংসের দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। কয়েক বছর ধরে চলা খরার কারণে খামারিরা গরুর সংখ্যা কমাতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে দেশটিতে গরুর সংখ্যা ৭৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এর পাশাপাশি ওয়াশিংটন মেক্সিকো থেকে গরু আমদানি স্থগিত করেছে।

গরুর মাংসের দাম কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে কম শুল্কে গরুর মাংস আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ এবং মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্তও রয়েছে।

তবে এই সময়েই মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণে শ্রমিক সংকট তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আনুমানিক ৯০ হাজার গরু জবাই করেছে। এক সপ্তাহ আগের তুলনায় এই সংখ্যা ১৬ শতাংশ কম। শুক্রবার জবাই হয়েছে ৮৭ হাজার গরু, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ১৪ শতাংশ কম।

কৃষি বিভাগের হিসাবে, বাণিজ্যিকভাবে গরু প্রক্রিয়াজাতকরণের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নেব্রাস্কার পরই কানসাসের অবস্থান।

যুক্তরাষ্ট্রের চারটি বড় গরুর মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি হলো ন্যাশনাল বিফ প্যাকিং কোম্পানি ও কারগিল। তারা ডজ সিটিতে কারখানা পরিচালনা করে। ন্যাশনাল বিফের লিবারালেও একটি কারখানা রয়েছে।

কানসাসের ভোটাধিকারবিষয়ক সংগঠন লাউড লাইটের জ্যেষ্ঠ লাতিনো ও গ্রামীণ কর্মসূচি ব্যবস্থাপক আলেহান্দ্রো র‍্যাঙ্গেল-লোপেজ বলেন, বুধবার এসব কারখানার আশপাশে অভিবাসন কর্মকর্তাদের তৎপরতা বেশি ছিল।

ডজ সিটির বাসিন্দা র‍্যাঙ্গেল-লোপেজ বলেন, ‘তারা লিবারাল ও ডজ সিটি দুই জায়গাতেই ন্যাশনাল বিফে ঢোকার জন্য খুব চেষ্টা করেছে। তারা পার্কিং এলাকায় ছিল এবং লোকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।’

ন্যাশনাল বিফের মুখপাত্র টবি কুক বলেন, কর্মীদের সহযোগিতা করা এবং আইন মেনে চলার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তিনি বলেন, ‘আমরা আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছি এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সঙ্গে বিষয়টি সুশৃঙ্খলভাবে সমাধানের চেষ্টা করছি।’ তবে আইসিইের তৎপরতা নিয়ে নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি রাজি হননি।

লিবারালের ডেপুটি মেয়র জ্যানেথ ভাসকেজ বলেন, বৃহস্পতিবার ন্যাশনাল বিফের কারখানায় খুব কম কর্মী কাজে এসেছিলেন। তাঁর দাবি, আইসিই কর্মকর্তারা বিভিন্ন বর্ণের মানুষকে লক্ষ্য করে তৎপরতা চালাচ্ছিলেন।

ভাসকেজ আরও বলেন, আইসিই কর্মকর্তারা এমন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশেও ঘোরাফেরা করছিলেন, যেখানে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচিত অভিভাবকদের সন্তান পড়াশোনা করে। ফলে অনেক শিশু সেদিন স্কুলে যায়নি।

তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের শহরটা এখন ভুতুড়ে হয়ে গেছে। মানুষ বাড়ি থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে বলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও খোলা নেই।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত