Ajker Patrika

গাজায় ২৮৪২ ফিলিস্তিনিকে ‘বাষ্পীভূত’ করেছে ইসরায়েল, ব্যবহৃত হয়েছে যেসব বোমা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২: ৫৬
গাজায় ২৮৪২ ফিলিস্তিনিকে ‘বাষ্পীভূত’ করেছে ইসরায়েল, ব্যবহৃত হয়েছে যেসব বোমা
ফাইল ছবি

২০২৪ সালের ১০ আগস্ট ভোরে গাজা সিটির আল-তাবিন স্কুলের ধোঁয়ায় ঢাকা ধ্বংসস্তূপের ভেতরে হাঁটছিলেন ইয়াসমিন মাহানি। তিনি তাঁর ছেলে সাদের দেহ খোঁজ করছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর স্বামীকে চিৎকার করতে দেখেন। কিন্তু সাদের কোনো খোঁজই মিলল না।

মাহানি বলেন, ‘মসজিদের ভেতরে ঢুকে দেখি, আমি মাংস আর রক্তের ওপর পা দিচ্ছি।’ তিনি কয়েক দিন ধরে হাসপাতাল ও মর্গে খুঁজেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সাদের কিছুই পাইনি। দাফন করার মতো একটি লাশও না। সেটাই ছিল সবচেয়ে কষ্টের।’

মাহানি তাঁদের মধ্যে একজন, যাঁদের স্বজনেরা গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধে হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছেন। এই যুদ্ধে ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আল জাজিরা আরবির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরি’ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধ শুরুর পর গাজার সিভিল ডিফেন্স দল ২ হাজার ৮৪২ জন ফিলিস্তিনির তথ্য নথিভুক্ত করেছে, যারা স্রেফ ‘বাষ্পীভূত’ হয়ে গেছেন। তাঁদের দেহাবশেষ হিসেবে রয়ে গেছে কেবল দেয়ালে ছিটকে থাকা রক্ত বা ছোট ছোট মাংসের টুকরো।

বিশেষজ্ঞ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করেছেন ইসরায়েলের নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ তাপীয় ও থার্মোব্যারিক অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে। এসব অস্ত্রকে ভ্যাকুয়াম বা অ্যারোসল বোমাও বলা হয়। এগুলো ৩ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা তৈরি করতে সক্ষম।

এই বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়া ২ হাজার ৮৪২ মানুষের সংখ্যাটি কোনো অনুমান নয়। এটি গাজার সিভিল ডিফেন্সের করা কঠোর ফরেনসিক হিসাবের ফল। সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল আল জাজিরাকে বলেন, হামলার স্থানে তারা ‘বিয়োজন পদ্ধতি’ ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট বাড়িগুলোতে ঢুকে ভেতরে কতজন ছিলেন, সেই তথ্যের সঙ্গে উদ্ধার করা মরদেহের সংখ্যা মিলিয়ে দেখেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো পরিবার যদি বলে ভেতরে পাঁচজন ছিল, আর আমরা তিনটি অক্ষত মরদেহ পাই, তাহলে বাকি দুজনকে আমরা “বাষ্পীভূত” হিসেবে ধরে নিয়েছি। তবে তার আগে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালানো হয়। যদি কিছুই না পাওয়া যায়, শুধু দেয়ালে রক্তের ছিটা বা মাথার চামড়ার মতো ছোট টুকরো ছাড়া, তখনই আমরা এভাবে নথিভুক্ত করি।’

প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ইসরায়েলি গোলাবারুদের নির্দিষ্ট রাসায়নিক উপাদান কীভাবে কয়েক সেকেন্ডে মানবদেহকে ছাইয়ে পরিণত করে। রাশিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞ ভাসিলি ফাতিগারভ বলেন, থার্মোব্যারিক অস্ত্র শুধু হত্যা করে না, একটি বস্তুকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। প্রচলিত বিস্ফোরকের মতো নয়, এসব অস্ত্র প্রথমে জ্বালানির মেঘ ছড়িয়ে দেয়। তারপর সেটি জ্বলে বিশাল আগুনের গোলা ও শূন্যতার প্রভাব তৈরি করে।

ফাতিগারভ বলেন, ‘আগুন দীর্ঘ সময় জ্বালিয়ে রাখতে অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও টাইটানিয়ামের গুঁড়া রাসায়নিক মিশ্রণে যোগ করা হয়। এতে বিস্ফোরণের তাপমাত্রা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়।’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তীব্র তাপ প্রায়ই তৈরি হয় ট্রাইটোনাল দিয়ে। এটি টিএনটি ও অ্যালুমিনিয়াম গুঁড়ার মিশ্রণ। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এমকে-৮৪ বোমায় এটি ব্যবহার করা হয়।

গাজার ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ডা. মুনির আল-বুরশ ব্যাখ্যা করেন, মানবদেহ প্রায় ৮০ শতাংশ পানি দিয়ে গঠিত। এমন চরম তাপের প্রভাব দেহে কীভাবে পড়ে, তা তিনি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘পানির স্ফুটনাঙ্ক ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যখন একটি দেহ ৩ হাজার ডিগ্রির বেশি শক্তি, প্রচণ্ড চাপ ও জারণ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়, তখন দেহের তরল সঙ্গে সঙ্গে ফুটে ওঠে। টিস্যু বাষ্পীভূত হয়ে ছাই হয়ে যায়। এটি রাসায়নিকভাবে অনিবার্য।’

বোমার গঠন

প্রতিবেদনে গাজায় ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি কিছু নির্দিষ্ট গোলাবারুদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে এসব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা যুক্ত বলে বলা হয়েছে।

এমকে-৮৪ ‘হ্যামার’: ৯০০ কেজি ওজনের এই অবিনিয়ন্ত্রিত বোমায় ট্রাইটোনাল ভরা থাকে। এটি ৩ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ তৈরি করতে পারে।

বিএলইউ-১০৯ বাঙ্কার বাস্টার: ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আল-মাওয়াসি এলাকায় হামলায় এই বোমা ব্যবহার করা হয়। ইসরায়েল ওই এলাকাকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণা করেছিল। এই বোমায় ২২ জন ‘বাষ্পীভূত’ হন। এর স্টিলের খোলস ও ফিউজ রয়েছে। এটি মাটির নিচে ঢুকে পিবিএক্সএন-১০৯ বিস্ফোরক মিশ্রণসহ বিস্ফোরিত হয়। এতে বদ্ধ স্থানে বড় আগুনের গোলা তৈরি হয় এবং আশপাশের সবকিছু পুড়িয়ে দেয়।

জিবিইউ-৩৯: আল-তাবিন স্কুলে হামলায় এই নির্ভুল গ্লাইড বোমা ব্যবহার করা হয়। এতে এএফএক্স-৭৫৭ বিস্ফোরক ব্যবহৃত হয়। ফাতিগারভ বলেন, ‘জিবিইউ-৩৯ এমনভাবে তৈরি, যাতে ভবনের কাঠামো তুলনামূলক অক্ষত থাকে, কিন্তু ভেতরের সবকিছু ধ্বংস হয়। এটি চাপের তরঙ্গ দিয়ে ফুসফুস ফাটিয়ে দেয় এবং তাপীয় তরঙ্গ দিয়ে নরম টিস্যু পুড়িয়ে ফেলে।’

সিভিল ডিফেন্সের মাহমুদ বাসাল নিশ্চিত করেছেন, যেসব স্থানে মরদেহ উধাও হয়েছে, সেখানে জিবিইউ-৩৯–এর ডানার টুকরো পাওয়া গেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত