Ajker Patrika

মুসলিমকে বাঁচানোয় হিন্দু যুবকের জিম বয়কট করছে উগ্রবাদীরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মুসলিমকে বাঁচানোয় হিন্দু যুবকের জিম বয়কট করছে উগ্রবাদীরা
দীপক কুমার পেশায় একজন জিম ট্রেইনার। ছবি: এনডিটিভি

উত্তরাখণ্ডের কোটদ্বারের এক বহু পুরোনো দোকান ‘বাবা স্কুল ড্রেস’। এর মালিক ৭০ বছর বয়সী এক মুসলিম দোকানদার। গত ২৬ জানুয়ারি যখন ভারতবাসী ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস পালন করছিল, তখন ত্রিশ বছর ধরে চলে আসা এই দোকানের মালিক মুসলিম হলেও দোকানের নামে ‘বাবা’ কেন, এ নিয়ে পড়তে হলো তোপের মুখে।

‘উগ্রবাদী’ বজরং দলের সদস্যরা এসে দোকানটিতে হট্টগোল শুরু করে দেয়। বজরং দল যুক্তি দেখায়, ‘বাবা’ শব্দটি হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। একজন মুসলিম দোকানদারের এটি ব্যবহার করা উচিত নয়, বিশেষ করে শহরের সিদ্ধবলি বাবা হনুমান মন্দিরের সঙ্গে এর যোগসূত্র থাকার কারণে।

দোকানদার ওয়াকিল আহমেদ জানান, তিনি ৩০ বছর ধরে এই দোকান চালাচ্ছেন। এর আগে কেউ এই নাম নিয়ে আপত্তি তোলেনি। তিনি দাবি করেন যে, ‘বাবা’ শব্দটি সব ধর্মেই ব্যবহৃত হয় এবং এটি কেবল হিন্দুদের একচেটিয়া নয়।

বজরং দলের হাত থেকে ৭০ বছর বয়সী ওই দোকানদারকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান এগিয়ে যান দীপক কুমার নামে এক হিন্দু যুবক। তিনি নিজের পরিচয় দেন ‘মোহাম্মদ দীপক’ নামে।

নাম পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এনডিটিভিকে দীপক কুমার ব্যাখ্যা করেন কেন তিনি এই নামটি বেছে নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমি হিন্দুও নই, মুসলিমও নই, শিখও নই, খ্রিস্টানও নই।’

দীপক আরও জানান, যখন বজরং দলের বেশ কয়েকজন সদস্য দোকানদারকে জেরা করছিল এবং নাম জিজ্ঞাসা করছিল, তখন সহজাতভাবেই ‘মোহাম্মদ দীপক’ নামটি তাঁর মাথায় আসে। তিনি বলেন, তিনি এই বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে তিনি কেবলই একজন ভারতীয় নাগরিক এবং লক্ষ্যবস্তু না হয়ে এই দেশে বসবাস করার অধিকার সবার আছে।

তিনি আরও যোগ করেন, মানবতাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম, কারণ মৃত্যুর পর কেবল মানুষের কাজই টিকে থাকে।

এ ঘটনায় স্থানীয়রা বলছেন, এলাকায় আরও বহু দোকানে ‘বাবা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় এবং সেগুলো নিয়েও কখনো আপত্তি ওঠেনি। কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই আহমেদকে টার্গেট করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে দীপক জানালেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে এই নাম পরিবর্তনে যেন বিপদ নেমে এসেছে তাঁর জীবনে।

দীপক কুমার পেশায় একজন জিম ট্রেইনার। তিনি জানান, ২৬ জানুয়ারির পর থেকে তাঁর জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। অনবরত ফোন কল ও মেসেজ আসছে, এর মধ্যে অনেকেই তাঁকে সমর্থন জানাচ্ছেন। আবার অনেকেই এর বিপরীতে। এমনকি তাঁর আয়ের পথও বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

সাধারণ পরিবারের ছেলে দীপক প্রায় ১৫ বছর আগে বাবাকে হারান। তিনি বিবাহিত এবং এক কন্যা সন্তানের বাবা। প্রায় ৩০ বছর ধরে ফিটনেস সেক্টরে কাজ করছেন দীপক। কোটদ্বারের বদ্রিনাথ রোডের কাছে একটি জিম পরিচালনা করেন তিনি। তাঁর মায়ের একটি চায়ের দোকান আছে, যা দিয়ে এখন তাদের সংসার চলছে।

দীপক জানান, এ বিতর্কের আগে বদ্রিনাথ রোডে তাঁর ‘হাল্ক জিম’-এর সদস্যসংখ্যা ছিল ১৫০। এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ১৫ জনে। জিমের ফ্লোরের জন্য মাসে ৪০ হাজার রুপি ভাড়া দিতে হয় তাঁকে। পাশাপাশি বাড়ির ঋণের কিস্তি বাবদ গুনতে হয় আরও ১৬ হাজার রুপি। এখন তাঁর ৭০ বছর বয়সী মায়ের চায়ের দোকানই একমাত্র ভরসা।

এই প্রতিকূল অবস্থায় পড়া সত্ত্বেও দীপক জানান, মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছেন তাতে তিনি অভিভূত। সবাইকে বিদ্বেষের বদলে সমঝোতা ও বোঝাপড়াকে বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

দীপক বলেন, ঘৃণা ছড়িয়ে কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব নয় এবং ভারতে প্রত্যেকেরই নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী উপাসনা করার, বসবাস করার এবং ধর্ম পালন করার অধিকার রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি চাই মানুষ ভুল পথ নয়, বরং সঠিক পথ বেছে নিক।’

এ ঘটনার পর ‘মোহাম্মদ দীপক’ নামটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ট্রেন্ডিং হচ্ছে; ব্যবহারকারীরা এটি নিয়ে রিল, পোস্ট এবং বিতর্ক শেয়ার করছেন। দীপক কুমারকে অনেকেই ‘নায়ক’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবুও তাঁকে অনলাইন হয়রানি ও নেতিবাচক সংবাদমাধ্যম কাভারেজের মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় পরিবারগুলো এখন সন্তানদের তাঁর জিমে পাঠাতে ভয় পাচ্ছে।

গত সপ্তাহে সিপিআই (এম)-এর রাজ্যসভার সাংসদ জন ব্রিটাস দীপকের সঙ্গে দেখা করেন এবং প্রতীকীভাবে তাঁর জিমের সদস্যপদ গ্রহণ করেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও তাঁকে ‘ভারতের নায়ক’ বলে প্রশংসা করেছেন।

অন্যদিকে উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি বিরোধীদের সমালোচনা করে তাঁদের বিরুদ্ধে ‘তুষ্টিকরণ রাজনীতি’র অভিযোগ তোলেন। ‘পবিত্র হিন্দু নামের’ আগে ‘মোহাম্মদ’ যুক্ত করা এবং এতে সমর্থন করায় বিরোধীদের কটাক্ষ করেন তিনি। ধামি বলেন, “দলটি এমন লোকদেরও পছন্দ করে, যারা তাদের পবিত্র হিন্দু নামের আগে ‘মোহাম্মদ’ বসায়।”

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত