Ajker Patrika

ভেনেজুয়েলার ৬ চীনা ও রুশ তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে মার্কিন কোম্পানির কাছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ভেনেজুয়েলার ৬ চীনা ও রুশ তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে মার্কিন কোম্পানির কাছে
ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রগুলোর কার্যত নিয়ন্ত্রণ এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। ছবি: এএফপি

মার্কিন তেল কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স (এনএবিইপি) ভেনেজুয়েলার এমন কয়েকটি তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে, যেগুলো আগে কয়েকটি চীনা কোম্পানি ও একটি রুশ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করত। স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই দুই কর্মকর্তা বলেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে বড় পরিসরের তেল উৎপাদন চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন, তার অংশ হিসেবেই এই তেলক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ এনএবিইপি-এর হাতে যাবে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলা সরকার নতুন করে যে ১৪টি তেল প্রকল্পের চুক্তি দিয়েছে, সেগুলোর সবকটিই যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত এনএবিইপি-এর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। কোম্পানিটি আগে মার্কিন তেল ব্যবসায়ী হ্যারি সার্জেন্টের মালিকানাধীন ছিল। বর্তমানে এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন ভেনেজুয়েলার ব্যবসায়ী আলেহান্দ্রো বেতানকোর্ট।

চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে এক বিবৃতিতে বেতানকোর্ট বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিশ্রমী মানুষ এবং কাজে লাগানো হয়নি এমন বিপুল সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ। এই লেনদেন সেই সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করবে এবং এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।’

এনএবিইপি জানিয়েছে, কোম্পানিটি ব্যবসাটির পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণে থাকবে। একই সঙ্গে মার্কিন সরকার কোম্পানিটির ৩৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানার অধিকার পাবে। পাশাপাশি কোম্পানির উৎপাদনের ২০ শতাংশ উৎপাদনমূল্যে কেনার অগ্রাধিকারমূলক সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের থাকবে।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এনএবিইপি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কোম্পানিটির বাকি ৮০ শতাংশ উৎপাদন কেনার ক্ষেত্রে প্রথমে কেনার অধিকার বা ‘রাইট অব ফার্স্ট রিফিউজাল’ও দিয়েছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, বেসরকারি ব্যবসার সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত প্রায় ৬৪ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছে।

এই ব্যবস্থার ফলে ভেনেজুয়েলার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তেলসম্পদে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সরাসরি অবস্থান তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশটির জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসা চীনা ও রুশ স্বার্থ সরে যাবে। এর ফলে ভেনেজুয়েলার তেল কে উৎপাদন করবে এবং কে তা বিক্রি করবে, সে বিষয়ে ওয়াশিংটনের সরাসরি ভূমিকা তৈরি হবে। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে নতুনভাবে সাজাতে এবং দেশটির বিপুল তেলসম্পদকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের আরও কাছাকাছি আনতে চাইছে।

হোয়াইট হাউস আরও জানিয়েছে, এনএবিইপি-এর পরিচালনা পর্ষদ ও পরিচালকদের বিষয়ে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের থাকবে। এছাড়া পরিচালনা পর্ষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকে অবশ্যই মার্কিন নাগরিক হতে হবে।

এনএবিইপি ভেনেজুয়েলায় মোট ১৭টি প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কোম্পানিটি এসব প্রকল্প উন্নয়ন করবে এবং শেষ পর্যন্ত উৎপাদিত তেল যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহের জন্য ব্যবহার করবে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, এর মধ্যে ১৪টি প্রকল্প ভেনেজুয়েলা সরকার নতুন করে এনএবিইপি-কে দিয়েছে।

এই ১৪টি তেলক্ষেত্রের মধ্যে পাঁচটি আগে চীনা কোম্পানিগুলো পরিচালনা করত। এসব প্রকল্প পরিচালনায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো প্রচারিত একটি মডেল অনুসরণ করা হয়েছিল। এ ছাড়া একটি তেলক্ষেত্র আগে একটি রুশ কোম্পানি পরিচালনা করত বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। ১৪টি প্রকল্পের মধ্যে দুটি চায়না কনকর্ড রিসোর্সেস পরিচালনা করত। ইরান-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ২০১৯ সালে এই কোম্পানির ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। আরেকটি প্রকল্প পরিচালনা করত চীনা জ্বালানি কোম্পানি সিনোপেক এবং অন্য একটি পরিচালনা করত চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন।

এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা শুধু মার্কিন সরকার ও মার্কিন পরিচালকদের লাভবান হওয়ার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছি না, আমরা যুক্তরাষ্ট্রকেও এই তেলের বাজার হিসেবে খুলে দিচ্ছি। এর আগে এই তেল চীনে পাঠানো হতো।’ কর্মকর্তারা আরও জানান, আরও দুটি প্রকল্প আলেক্স সাবের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করত। সাব ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সাবেক সহযোগী। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে রয়েছেন। আরেকটি তেলক্ষেত্রের সঙ্গে মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের এক ভাতিজার সম্পৃক্ততা ছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান।

সোমবার এর আগে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ভেনেজুয়েলা থেকে ‘মিলিয়ন মিলিয়ন ব্যারেল তেল’ নিয়ে আসছে। এই তেল টেক্সাস ও লুইজিয়ানা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য স্থানের শোধনাগারে পাঠানো হচ্ছে। মঙ্গলবার তেল ও গ্যাস খুচরা বিক্রেতা এবং শোধনাগার মালিকদের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক করার কথা রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা আরও জানান, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ এবং ২০১৫ সালের জাতীয় পরিষদের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা চলছে। এসব আলোচনার লক্ষ্য হলো দেশটিতে সাংবিধানিক শৃঙ্খলার কিছুটা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি আইনি প্রশ্নগুলোর সমাধান করা।

ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৫ সালের জাতীয় পরিষদকে ভেনেজুয়েলার সংবিধানের অধীনে সর্বশেষ নির্বাচিত ও কার্যকর আইনসভা হিসেবে বিবেচনা করে। তবে বর্তমানে ওই পরিষদের কোনো আনুষ্ঠানিক শাসনক্ষমতা নেই। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ২০১৫ সালের জাতীয় পরিষদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো গেলে তা ভেনেজুয়েলায় বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য একটি সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোও থাকবে, যার অংশ হিসেবে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত