ইউরোপের নেতারা ‘রাজনৈতিক মর্ষকামী’: লাভরভ

ইউরোপীয় নেতাদের ‘পলিটিক্যাল ম্যাসোকিস্ট’ বা ‘রাজনৈতিক আত্মনিপীড়ক/মর্ষকামী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। তাঁর অভিযোগ, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে পরাজিত করার লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে ইউরোপীয় নেতারা নিজেদের নাগরিকদের কল্যাণ বিসর্জন দিচ্ছেন। রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম আরটির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার মস্কোয় আফ্রিকার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রধান সম্পাদকদের সঙ্গে এক বৈঠকে লাভরভ অভিযোগ করেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে সংঘাতে ইউক্রেনের বিজয় নিশ্চিত করতে পশ্চিমা সরকারগুলো নিজেদের জনগণকে জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে চাপ দিচ্ছে।
লাভরভ বলেন, ‘তারা জনমতকে এমন একটি অবস্থানে ধরে রাখার চেষ্টা করছে, যেখানে মানুষকে সবকিছু বিসর্জন দিতে হবে—বেতন, চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামগ্রিকভাবে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা—যাতে ইউক্রেন রাশিয়াকে পরাজিত করতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপের দেশগুলোতে মানুষের জীবনযাত্রার পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে, আর তারা নিজেরাই তা অনুভব করতে পারছে।’
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ ম্যার্ৎজকে এ ধরনের নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া রাজনীতিকদের একজন হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন লাভরভ। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এরা আত্মনিপীড়ক, চাইলে এদের রাজনৈতিক আত্মনিপীড়কও বলতে পারেন।’ ম্যার্ৎজ জার্মানির সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং কিয়েভকে অব্যাহতভাবে সহায়তা দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, জার্মানির পক্ষে আর বর্তমান কল্যাণব্যবস্থা বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।
জার্মান সরকার এরই মধ্যে সামাজিক কল্যাণসংক্রান্ত বিধিনিষেধ কঠোর করেছে। বারবার নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ভাতা ৩০ শতাংশ কমানোর বিধান চালু করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভাতা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বার্লিনের প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের বাজেটে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সামাজিক কর্মসূচি থেকে কয়েক শ কোটি ইউরো সাশ্রয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৭ সালে ইউক্রেনের জন্য ১১৬০ কোটি ইউরো বরাদ্দ রেখেছে জার্মানি। পাশাপাশি দেশটি প্রতিরক্ষা ব্যয় রেকর্ড পর্যায়ে উন্নীত করার পরিকল্পনাও নিয়েছে। কিয়েভের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক যুক্তরাজ্যও সামাজিক কল্যাণ খাতে ভাতা কমিয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবার এবং কাজ করতে অক্ষম ব্যক্তিদের সহায়তায় পরিচালিত ইউনিভার্সাল ক্রেডিট কর্মসূচির আওতায় অধিকাংশ নতুন আবেদনকারীর স্বাস্থ্যগত কারণে দেওয়া ভাতা প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক আরও সামরিক ব্যয় মেটাতে সামাজিক কল্যাণ খাতে বরাদ্দ কমানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা খাতে অর্থ জোগাতে হবে, আমাদের সব অর্থ সামাজিক কল্যাণে ব্যয় করা যাবে না।’ তবে ব্রিটিশ সরকার তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফ্রান্সও সরকারি ব্যয় সংকোচনের পথে এগিয়েছে। এর অংশ হিসেবে সরকারি খাতের কর্মীদের বেতন স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে দেশটি সামরিক ব্যয় বাড়াচ্ছে। এসব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শ্রমিক সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এসব নীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং জনসেবার মানের অবনতি ঘটছে। ইউরোপজুড়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জনঅসন্তোষ ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষায় অর্থায়ন এবং বৈষম্যের প্রতিবাদে ফ্রান্সে লাখো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। আবাসন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে ওঠার প্রতিবাদে স্পেন ও পর্তুগালেও রাস্তায় নেমেছেন কয়েক হাজার মানুষ। অন্যদিকে, জীবনযাত্রার মানের অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে ইতালিতেও।
রাশিয়ার কাছ থেকে সম্ভাব্য হুমকির কথা উল্লেখ করে ইউরোপের ন্যাটো সদস্যদেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
গত সপ্তাহে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বারবার উত্থাপিত সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন, যেখানে বলা হচ্ছে, মস্কো ইউরোপের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি এসব বক্তব্যকে ইউরোপে চলমান ‘রাশিয়াবিরোধী প্রচারণার’ অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন। পুতিন বলেন, ‘তারা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রতিনিয়ত ‘রুশ হুমকি’ নিয়ে কথা বলছে, এমনকি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা করছে। আমার দৃষ্টিতে, এটি একধরনের রাজনৈতিক সিজোফ্রেনিয়ার শামিল। তবে আমি আশা করি, এই পরিস্থিতির অবসান ঘটবে।’
মস্কো বারবার ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে হামলা চালানোর অভিপ্রায়ের অভিযোগকে ‘অর্থহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। রাশিয়ার অভিযোগ, পশ্চিমা নেতারা কথিত রুশ হুমকিকে সামরিকীকরণ জোরদার করা এবং কিয়েভকে অব্যাহত সমর্থন দেওয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করছেন।









