Ajker Patrika

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন /ইরান যুদ্ধে দুর্বল যুক্তরাষ্ট্র, সুযোগ নিতে পারে রাশিয়া

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরান যুদ্ধে দুর্বল যুক্তরাষ্ট্র, সুযোগ নিতে পারে রাশিয়া
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে রাশিয়া। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপে মার্কিন স্বার্থ ও মিত্রদের বিরুদ্ধে রাশিয়া আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে বলে নতুন মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে। এই গোয়েন্দা তথ্য সামনে আসার পরই চলতি সপ্তাহে সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফের রহস্যময় মস্কো সফর হয় বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন।

র‍্যাটক্লিফ ও তাঁর রুশ সমকক্ষের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে, তার বিস্তারিত এখনো গোপন রাখা হয়েছে। তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, সিআইএ প্রধান মস্কোকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও বড় আকারে না বাড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, এমন পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার জন্যই ক্ষতিকর হবে। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে ওই ব্যক্তি এবং অন্যরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।

গত মঙ্গলবার গোপনে র‍্যাটক্লিফ মস্কোয় যান। ২০২১ সালের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের গোয়েন্দাপ্রধান উইলিয়াম জে বার্নস ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য ক্রেমলিনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে মস্কো সফর করার পর এটাই কোনো সিআইএ পরিচালকের সেখানে যাওয়ার প্রথম জানা ঘটনা।

রাশিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআরের প্রধান সের্গেই নারিশকিন র‍্যাটক্লিফের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, বৈঠকে ‘অস্বাভাবিক কিছু’ ছিল না। তবে ক্রেমলিন জানিয়েছে, র‍্যাটক্লিফ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা করেননি। র‍্যাটক্লিফের সফর নিয়ে সিআইএ ও হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর পুতিন হামলার নির্দেশ দিতে পারেন—এমন আশঙ্কার গুরুত্ব কমিয়ে দেখান। র‍্যাটক্লিফের সফরের উদ্দেশ্য কী ছিল, সে বিষয়ে করা এক প্রশ্নও তিনি এড়িয়ে যান। ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি ন্যাটোর কোনো ভূখণ্ডে হামলা করতে যাচ্ছেন না।’

পুতিন ইরানে চলমান ছয় মাসের যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল মনে করছেন, এমন ক্লাসিফায়েড বা শ্রেণিবদ্ধ গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়টি সামনে এসেছে। এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের কারণে মার্কিন সেনাদের প্রস্তুতির মাত্রা কমে যাওয়া এবং গোলাবারুদের ঘাটতির খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্যাট্রিয়টসহ অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পাশাপাশি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্বল্প-পাল্লার আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেমের মতো অত্যাধুনিক আক্রমণাত্মক অস্ত্রের মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ইউক্রেনেও বর্তমানে এসব অস্ত্রের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট এর আগে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় এক-চতুর্থাংশ র‍্যাপার ড্রোন হারিয়েছে। প্রতিটি র‍্যাপার ড্রোনের দাম ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি ডলারের মধ্যে। এসব ড্রোন নজরদারি এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ব্যবহার করা হয়। অস্ত্রের এই ঘাটতি এশিয়ার মিত্র দেশগুলোকেও উদ্বিগ্ন করেছে। এর ফলে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলেছেন, মার্কিন অস্ত্রের মজুতে গুরুতর ঘাটতি নেই। তবে একই সময়ে তারা অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত আরও অস্ত্র তৈরি করার জন্য চাপ দিয়ে আসছেন।

পুতিন ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন, সে বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা তথ্যটি কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে বা এর নির্ভুলতা নিয়ে সিআইএ বিশ্লেষকেরা কতটা আত্মবিশ্বাসী, সে বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত জানাননি।

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকালে র‍্যাটক্লিফ একটি সামরিক পরিবহন বিমানে মস্কো পৌঁছান। এর আগে বিমানটি লাটভিয়ার রাজধানী রিগায় থেমেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কূটনৈতিক নম্বরপ্লেটযুক্ত কয়েকটি গাড়িসহ গাড়িবহর মস্কোর কেন্দ্রীয় এলাকার সড়ক দিয়ে চলাচল করছে। ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, পরিবহন বিমানটি মস্কোয় অবতরণের প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে ৫টায় সেখান থেকে উড্ডয়ন করে।

ইউক্রেনের স্থলযুদ্ধ অনেকটা অচলাবস্থায় থাকলেও মস্কো ও কিয়েভ একে অপরের ভূখণ্ডে ক্রমেই আরও ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপ্রচারিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার ক্ষেত্রে দেশটি প্রায়ই রাশিয়ার জ্বালানি শিল্প এবং অনলাইন বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করছে।

অন্যদিকে মস্কো ইউক্রেনজুড়ে আবাসিক ভবন, যেমন অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক, এবং শিল্প অবকাঠামো ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নিয়মিত বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী অস্ত্রের মজুত ইউক্রেনে কমে আসার সুযোগও রাশিয়া কাজে লাগিয়েছে।

ইউরোপের দেশগুলো কিয়েভকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী অস্ত্র সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এর অনেকগুলোই আগামী বছর পর্যন্ত ইউক্রেনে পৌঁছাবে না। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি বলেন, র‍্যাটক্লিফের মস্কো সফর ‘পুতিন কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন’ এমন পরিস্থিতি নিয়ে কম এবং রাশিয়ার এই মূল্যায়ন নিয়ে বেশি যে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত এবং আর হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

ওই ব্যক্তি আরও জানান, র‍্যাটক্লিফ রুশ কর্মকর্তাদের বলেছেন, পুতিন যদি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ উল্লেখযোগ্যভাবে আরও বাড়িয়ে দেন, তাহলে তা ট্রাম্পকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলবে। ইউক্রেন যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে। এই দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যে ইউরোপও রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা বিভিন্ন ধরনের ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বা ছায়াযুদ্ধের হামলার মুখে পড়েছে।

এর মধ্যে জার্মানির লিপজিগ/হালে বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার একটি প্রচেষ্টাও রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক এবং কয়েকটি সরকার মনে করে, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রাশিয়ার হাত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের ন্যাটো সদস্য দেশগুলো, যার মধ্যে বাল্টিক দেশগুলোও রয়েছে, পুতিন ইউরোপে চাপ আরও বাড়াতে পারেন এবং ক্রমেই বেশি উসকানিমূলক অনুপ্রবেশের অনুমোদন দিতে পারেন বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং দৃশ্যত পথভ্রষ্ট বা ভুলবশত ঢুকে পড়া ড্রোনের ঘটনার ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত