Ajker Patrika

জন্মহার বাড়াতে নতুন কৌশল—কনডমসহ জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর দাম বাড়াল চীন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
২০২৪ সালে চীনে মাত্র ৯৫ লাখ ৪০ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে, যা গত এক দশকের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। ছবি: এএফপি
২০২৪ সালে চীনে মাত্র ৯৫ লাখ ৪০ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে, যা গত এক দশকের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। ছবি: এএফপি

তলানিতে নামা জন্মহার টেনে তুলতে এবার এক বিচিত্র কৌশল নিয়েছে চীনা সরকার। আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) থেকে দেশটিতে কনডমসহ সব ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ওপর ১৩ শতাংশ বিক্রয় কর বা ভ্যাট কার্যকর করা হয়েছে। বিপরীতে, শিশুর যত্ন, বিবাহসংক্রান্ত ও বয়স্কদের সেবাকে ভ্যাটমুক্ত ঘোষণা করেছে বেইজিং।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন গত তিন বছর ধরে জনসংখ্যা হ্রাসের সংকটে ভুগছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে মাত্র ৯৫ লাখ ৪০ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে, যা গত এক দশকের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জনসংখ্যা বিপর্যয় ঠেকাতেই মূলত করব্যবস্থায় এমন আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে।

চীনের নতুন কর সংস্কার অনুযায়ী, কনডম, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ও অন্যান্য ডিভাইসের ওপর আগে করছাড় থাকলেও এখন থেকে ১৩ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। অন্যদিকে শিশুর যত্ন কেন্দ্র, কিন্ডারগার্টেন ও বয়স্কদের সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট পুরোপুরি মওকুফ করা হয়েছে।

সন্তান জন্মদানে উৎসাহিত করতে মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়ানো ও দম্পতিদের নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নিচ্ছে দেশটির সরকার।

তবে সরকারের এই নতুন পদক্ষেপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। অনেকে একে উপহাস হিসেবে দেখছেন। সিয়ানের বাসিন্দা রোজি ঝাও বলেন, কনডমের দাম বাড়িয়ে জন্মহার বাড়ানো সম্ভব নয়। উল্টো এর ফলে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

পূর্বাঞ্চলীয় হেনান প্রদেশের বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী ড্যানিয়েল লুও বলেন, ‘আমার একটি সন্তান আছে, আর চাই না।’ তিনি বলেন, এটা ঠিক মেট্রোর ভাড়া বাড়ার মতো। এক-দুই ইউয়ান বাড়লেও মানুষ মেট্রোতে চড়া বন্ধ করে না।

কনডমের দাম বাড়া নিয়ে ড্যানিয়েল চিন্তিত নন। তাঁর ভাষায়, এক বাক্স কনডমে হয়তো পাঁচ বা ১০ ইউয়ান বেশি লাগবে, বড়জোর ২০। বছরে কয়েক শ ইউয়ান—এটা পুরোপুরি সহনীয়।

তবে সবার জন্য বিষয়টি এমন নাও হতে পারে বলে মনে করেন মধ্য চীনের সিয়ানের বাসিন্দা রোজি ঝাও। তাঁর আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে শিক্ষার্থী বা আর্থিক সংকটে থাকা মানুষ ঝুঁকি নিতে পারে। তিনি বলেন, এটিই হতে পারে নীতিটির ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক সম্ভাব্য পরিণতি’।

নীতিটির উদ্দেশ্য নিয়েও বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাবিদ ই ফুশিয়ানের মতে, কনডমে কর বাড়ালে জন্মহার বাড়বে—এমন ভাবনা ‘অতিরঞ্জিত’।

ফুশিয়ান বলেন, আবাসন খাতের মন্দা ও বাড়তে থাকা জাতীয় ঋণের চাপ সামলাতে বেইজিং যেখানে পারছে, সেখান থেকেই কর আদায় করতে চাইছে।

এদিকে, জন্মহার বাড়াতে বেইজিংয়ের মরিয়া চেষ্টা অনেক সময় ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ইউনানসহ কয়েকটি প্রদেশে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নারীদের ফোন করে তাঁদের ঋতুচক্র ও সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার খবর পাওয়া গেছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ হেনরিয়েটা লেভিন বলেন, সরকার যখন মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত নাক গলাতে শুরু করে, তখন সেটি হিতে বিপরীত হতে পারে।

কেন সন্তান নিতে চায় না চীনারা

বেইজিংয়ের গবেষণা সংস্থা ইউওয়া পপুলেশন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, চীনে একটি সন্তান বড় করা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম ব্যয়বহুল কাজ। এর প্রধান কারণগুলো হলো—শিক্ষা খাতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ থাকায় সন্তানদের শিক্ষা খরচ মেটাতে অধিকাংশ অভিভাবকই হিমশিম খাচ্ছেন। তাই তাঁরা সন্তান নিতে অনিচ্ছুক। পাশাপাশি আবাসন খাতের মন্দার কারণে তরুণ প্রজন্মের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ আত্মবিশ্বাস কমে গেছে।

তবে বড় বিষয় একাকিত্ব ও চাপ। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম আগের চেয়ে অনেক বেশি মানসিক চাপে রয়েছে। অনেকেই দায়বদ্ধতার ভয়ে বিয়ে বা মানবিক সম্পর্কের চেয়ে অনলাইন জীবনকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।

বিশ্লেষক ও নারীরা বলছেন, পুরুষপ্রধান নেতৃত্ব সামাজিক পরিবর্তনগুলো বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু চীনের নয়—দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ অনেক দেশই জন্মহার সংকটে ভুগছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু যত্নের ভার অসমভাবে নারীদের ওপর পড়ে। পাশাপাশি বিয়ে ও সম্পর্কের প্রতি আগ্রহও কমছে।

হেনানের বাসিন্দা ড্যানিয়েল লুওর মতে, চীনের নীতিনির্ধারকেরা মূল সমস্যাটি ধরতে পারছেন না—আজকের তরুণদের পারস্পরিক সম্পর্কের ধরনই বদলে গেছে। তিনি বলেন, যৌন খেলনার বিক্রি বাড়ছে। এ থেকে বোঝা যায়, মানুষ ‘নিজেদের মধ্যেই সন্তুষ্ট’ থাকছে। কারণ, অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া এখন ‘বড় বোঝা’ হয়ে উঠেছে।

ড্যানিয়েল লুও আরও বলেন, আজকের তরুণেরা ২০ বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি চাপে থাকেন। বস্তুগতভাবে তাঁরা ভালো থাকলেও প্রত্যাশার চাপ অনেক বেশি। সবাই যেন ক্লান্ত। তাই অনলাইনে থাকাই সহজ, স্বস্তিদায়ক। নিজের ওপর সমাজের চাপ কম।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত