Ajker Patrika

২৮৬ দিন সমুদ্রে কাটানো মার্কিন নাবিকেরা থাইল্যান্ডে নেমে কী কী করলেন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ০৯
২৮৬ দিন সমুদ্রে কাটানো মার্কিন নাবিকেরা থাইল্যান্ডে নেমে কী কী করলেন
থাইল্যান্ডের পাতায়া হাতি অভয়ারণ্যে ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন বিমানবাহী রণতরীর নাবিকেরা। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে দীর্ঘ ও কঠিন সামরিক মোতায়েন শেষে কয়েক মাস পর স্থলভাগে পা রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিক ও মেরিনেরা। থাইল্যান্ডের পর্যটন নগরী পাতায়ায় চার দিনের যাত্রাবিরতিতে গিয়ে তাঁরা উপভোগ করেছেন হাতির সঙ্গে সময় কাটানো, স্থানীয় খাবার, ফুটবল খেলা এবং বহুদিন পর খালি পায়ে মাটিতে হাঁটার মতো ‘সাধারণ’ কিছু মুহূর্ত।

মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, গত শুক্রবার প্রায় দুই ডজন মার্কিন সেনাসদস্য পাতায়া এলিফ্যান্ট স্যাংচুয়ারিতে যান। নৌবাহিনীর আয়োজিত এই বিনোদনমূলক সফরে তাঁরা উদ্ধার করা হাতিদের খাবার খাওয়ান, গোসল করান এবং ছবি তোলেন। একটি হাতি মজা করে এক নাবিকের মাথা থেকে টুপিও তুলে নেয়।

নাবিক আলজে মনজালেস বলেন, দীর্ঘদিনের সমুদ্রে অবস্থানের পর এই সফর লিংকনের নাবিকদের মনোবল বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রায় ৫ হাজার মার্কিন সেনাসদস্য গত সপ্তাহে পাতায়ায় পৌঁছান। তারা টানা ২৮৬ দিন সমুদ্রে কাটিয়েছেন—যা মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ মোতায়েন।

দীর্ঘ এই অভিযানের বড় একটি অংশ কেটেছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতে গিয়ে। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থানের কারণে জাহাজে সরবরাহ সংকট এবং নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। শীতল যুদ্ধের সময়ের এই বিশাল রণতরীটি গত ২ সেপ্টেম্বর লায়েম চাবাং বন্দরে পৌঁছালে এর গায়ে জমে থাকা শেওলা, মরিচা ও উঠে যাওয়া রং দেখে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সমুদ্রের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে ২৫ বছর বয়সী পেটি অফিসার চার্লস ফিঞ্চ বলেন, থাইল্যান্ডে আসার আগে এ বছর তিনি একটি গাছও দেখেননি। তাঁর ভাষায়, থাইল্যান্ড সফরের অন্যতম বড় আনন্দ ছিল নিজের দৈনন্দিন সময়সূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া। তিনি বলেন, এখন তিনি চাইলে ঘুমাতে পারেন, যেখানে যেতে চান যেতে পারেন—দীর্ঘদিন ধরে এমন স্বাধীনতা তাঁর ছিল না।

নাবিকদের জন্য শুধু বিনোদন নয়, স্থানীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তেও নানা আয়োজন করা হয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর মার্কিন সেনাসদস্যরা পাতায়ার একটি স্থানীয় ক্লাবের সঙ্গে ‘গুডউইল’ ফুটবল ম্যাচ খেলেন। কয়েকজন থাই খেলোয়াড়কে নিজেদের দলে নিয়ে মার্কিন দল ৫-৪ গোলে জয় পায়।

লিংকনের বিনোদন কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা জেনি ডিউগুইড বলেন, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে নাবিকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাঁদের কিছুটা আনন্দ দেওয়াই এসব আয়োজনের উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, দীর্ঘ কঠিন অভিযানের পর নাবিকেরা অত্যন্ত সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।

২৪ বছর বয়সী পেটি অফিসার ক্রিস বেল, যিনি রণতরীর পারমাণবিক চুল্লি কক্ষে কাজ করেন, বলেন—থাইল্যান্ডে তাঁর সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে ‘সাধারণ কিছু বিষয়’। এর মধ্যে অন্যতম ছিল মাটিতে হাঁটা।

বেল বলেন, জাহাজে দীর্ঘদিন থাকার পর খালি পায়ে হাঁটা কিংবা পানিতে পা ডোবানোর মতো সাধারণ বিষয়ও তার কাছে অচেনা ও বিশেষ হয়ে উঠেছে। এমনকি জাহাজের খাবার থেকে মুক্তি পাওয়াটিও তাঁর মনোবল বাড়িয়েছে।

পাতায়ার রেস্তোরাঁ ও বাজারগুলোতে পাওয়া তাজা ফল ও নানা ধরনের খাবারও নাবিকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে। প্যাড থাই ও প্যাড ক্রা পাওয়ের মতো স্থানীয় খাবারের পাশাপাশি আম, ড্রাগন ফল, প্যাশন ফল ও তরমুজের মতো তাজা ফল উপভোগ করেন তাঁরা।

এই সফর পাতায়ার স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রতিটি মার্কিন সেনাসদস্য প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ ডলার পর্যন্ত খরচ করেছেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রায় ৩০ লাখ ডলার প্রবাহিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

নাবিক ইভন গুডসেল জানান, জাহাজে কয়েক মাস আগেই তার আঁকা ও ছবি তৈরির সামগ্রী শেষ হয়ে গিয়েছিল। থাইল্যান্ডে এসে তিনি প্রায় ৭০০ ডলার খরচ করে নতুন শিল্পসামগ্রী কিনেছেন। তাঁর কাছে দীর্ঘদিন পর সূর্যের আলো দেখাটাও ছিল অসাধারণ এক অনুভূতি।

তবে আনন্দের মধ্যেও দায়িত্ব থেকে পুরোপুরি মুক্তি মেলেনি নাবিকদের। চার দিনের সফরের মধ্যে প্রত্যেককে এক দিন করে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। কারণ, জাহাজের কোনো যন্ত্রপাতিতে সমস্যা দেখা দিলে সেটি সমুদ্রে যাত্রা শুরু করতে পারবে না।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইউএসএস লিংকন ও এর সঙ্গে থাকা জাহাজগুলো পাতায়া ছেড়ে সান দিয়েগোর নিজস্ব ঘাঁটির উদ্দেশে রওনা হয়। গত বছরের নভেম্বরে সান দিয়েগো ছাড়ার পর দীর্ঘ ২৮৬ দিনের সমুদ্রযাত্রা শেষে এখন ঘরে ফেরার অপেক্ষায় নাবিকেরা।

অনেকেই বাড়ি ফিরে কয়েক সপ্তাহের ছুটি কাটাবেন এবং দীর্ঘদিন পর পরিবারের সঙ্গে মিলিত হবেন। কেউ কেউ প্রথমবারের মতো নিজের নবজাতক সন্তানকে দেখবেন। ফিঞ্চের কথায়, এই দীর্ঘ অভিযানে তিনি জীবনের অনেক কিছুই মিস করেছেন। এখন তাঁর সবচেয়ে বড় ইচ্ছা—বাড়ি ফিরে বন্ধু ও স্বজনদের জীবনে আবার নিজেকে যুক্ত করা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত