Ajker Patrika

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে নিহত ৩৩৪২, এখনো নিখোঁজ ৫০ হাজার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে নিহত ৩৩৪২, এখনো নিখোঁজ ৫০ হাজার
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন। ছবি: এএফপি

ভেনেজুয়েলায় গত ২৪ জুনের ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩ হাজার ৩৪২ জনে পৌঁছেছে। এ ছাড়া, ধারণা করা হচ্ছে—আনুমানিক এখনো অন্তত ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্যোগের ১১ দিন পরও যেসব মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, সেগুলোর মধ্যে ১৫০ টিরও বেশি মরদেহ দাফনের কাজ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা ছেড়ে দিয়ে তাদের অভিযান গুটিয়ে নিচ্ছে। এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নিহতদের দাফন ও স্বজন হারানো পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর কাজে।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী কারাকাসের উত্তরে উপকূলীয় লা গুয়ারিয়া অঞ্চল ছিল ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই দুর্যোগে শত শত ভবন ধসে পড়ে এবং হাজারো মানুষ নিখোঁজ হন।

লা গুয়ারিয়ার লা এসপেরানজা কবরস্থানের একটি নির্জন অংশে পরিচয়হীন ১৫০ টিরও বেশি মরদেহ দাফন করতে দেখা গেছে। প্রতিটি কবরের মাথায় একটি করে সাদা ক্রস ও ছোট ফুলের তোড়া রাখা হয়েছে। সব কবরেই মৃত্যুর তারিখ লেখা রয়েছে ২৪ জুন ২০২৬। একই সময়ে আরও কবর খোঁড়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে দুটি খননযন্ত্র।

দাফনের কাজে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা এলি জাভালা বলেন, তাঁরা গভীর শোকের মধ্যেও মরদেহগুলোর সম্মানজনক দাফন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা ২৫ জুন, অর্থাৎ পরের দিন থেকেই এখানে কাজ শুরু করেছি, যাতে সবাই মর্যাদার সঙ্গে দাফন হতে পারেন।’

গতকাল রোববার প্রকাশিত সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পে অন্তত ৩ হাজার ৩৪২ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৭০০ জন আহত হয়েছেন। প্রায় ২০০টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে, যার বেশির ভাগই লা গুয়ারিয়ায়। এতে ১৭ হাজারেরও বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে আশ্রয়কেন্দ্র ও অস্থায়ী শিবিরে বসবাস করছেন। সরকার এখনো নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রকাশ না করলেও জাতিসংঘের ধারণা, প্রায় ৫০ হাজার মানুষের এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি। অনেক পরিবার এখনো ধ্বংসস্তূপে স্বজনদের খুঁজে চলেছে।

কাতিয়া লা মার এলাকার বাসিন্দা জুলি তাঁর ছেলেকে খুঁজছেন। তিনি বলেন, তিনি দিন-তারিখের হিসাব হারিয়ে ফেলেছেন। ছেলের কর্মস্থলের কাছেই একটি চত্বরে রাত কাটাচ্ছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, ছেলে এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আছে। তিনি বলেন, ‘আমি ওর মোটরসাইকেল পেয়েছি, ওর হেলমেট পেয়েছি। ঈশ্বর চাইলে হয়তো সে বেঁচে আছে। আর যদি না-ও থাকে, অন্তত ওকে খুঁজে পাব। আমার ছেলেকে ছাড়া আমি এখান থেকে যাব না।’

ভূমিকম্পের আগেই অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভুগছিল ভেনেজুয়েলা। এতে দেশটির অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আগেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। জাতিসংঘের হিসাবে, ভূমিকম্পে প্রায় ৬৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬ শতাংশের সমান। ক্ষতিগ্রস্ত কারাকাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখনো বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচলের জন্য বন্ধ রয়েছে।

ভূমিকম্পের পরপরই অনেক ভেনেজুয়েলাবাসী অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগে তাঁদের নিজেদেরই ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে স্বজনদের খুঁজতে হয়েছে। সরকারের ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতাও সমালোচনার মুখে পড়ে।

তবে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ সরকারের ভূমিকার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তা ও উদ্ধারকারী সদস্যকে দ্রুত দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছিল। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সামরিক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো সামাজিক অস্থিরতা হবে না। এখানে রয়েছে গভীর সামাজিক সংহতি।’

এদিকে রোববার কারাকাস ও লা গুয়ারিয়ার বিভিন্ন গির্জায় নিহত ও নিখোঁজদের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কারাকাসের ভেনেজুয়েলা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে জাতীয় পতাকাকে ঘিরে মোমবাতি জ্বালিয়ে শোকপ্রহরে অংশ নেন কয়েক ডজন মানুষ। লা গুয়ারিয়ায় এএফপিকে স্থানীয় ধর্মযাজক ফাদার রাফায়েল ত্রোকোনিস বলেন, তিনি এমন অনেক পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাঁরা তাঁদের দুই সন্তান বা তিন সন্তানের মধ্যে দুজনকে হারিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘মানুষের এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমরা শুধু তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। চারদিকে শুধু শোক আর হতাশা।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত