Ajker Patrika

নেপাল-তিব্বতে কাদাধসে নিহত বেড়ে প্রায় ৮০০, নিখোঁজ ৩ হাজারের বেশি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
নেপাল-তিব্বতে কাদাধসে নিহত বেড়ে প্রায় ৮০০, নিখোঁজ ৩ হাজারের বেশি
নেপালের চিতওয়ান জেলার ভরতপুরে নারায়ণী নদীতে বন্যাকবলিত মানুষদের খোঁজে চলা উদ্ধার অভিযান শেষে ফিরছেন সেনাসদস্যরা। ছবি: এএফপি

হিমালয়ে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ মাডস্লাইড বা কাদাধসের পর কয়েক হাজার নিখোঁজ মানুষকে খুঁজে বের করতে গতকাল রোববারও নেপাল ও চীনের উদ্ধারকারীরা জোর চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে বৈরী আবহাওয়া ও বাড়তে থাকা পানির উচ্চতা উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলেছে।

দুই দেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গতকাল রোববার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৮০০ হয়েছে। নেপাল-চীন সীমান্তের দুই পাশে এখনো ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। গত সপ্তাহের বুধবার বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত পাহাড়ি উপত্যকা ও নদীগুলো দিয়ে নেমে এসে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর এই বিপর্যয় ঘটে।

আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা রেড ক্রসের হিসাবে, এই দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। চীন এই বিপর্যয়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের যোগসূত্র রয়েছে বলে জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই গত শনিবার নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াং ই এই কাদাধসকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দুই দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ সীমান্তপারের দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উদ্ধার অভিযান নজিরবিহীন মাত্রার কঠিন ও জটিল হয়ে উঠেছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে ৭৮১ জন মারা গেছেন এবং ২ হাজার ৫০২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গিরং কাউন্টিতে ১৬ জন নিহত এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বেইজিং জানিয়েছে, নেপালের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমান্ত পারাপার এলাকার কাছে তিব্বতে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

হিমালয়ের দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে এই বিপর্যয়ের ব্যাপকতা উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তুলেছে। নেপালের স্থানীয় পুলিশ রয়টার্সকে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে বৃষ্টিপাতের পর ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীরা উঁচু এলাকায় সরে গেছেন। এতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার থেকে বৈরী আবহাওয়া এবং দুর্যোগের কারণে নেপাল-চীন সীমান্তে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ উপচে পড়ে নতুন করে বন্যা সৃষ্টি করতে পারে, এমন আশঙ্কায় কয়েক দফা উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। ওই হ্রদের পানি নেপালের লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীতে প্রবাহিত হতে শুরু করেছিল।

চীনা রাষ্ট্র পরিচালিত সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, নিচের দিকে থাকা এলাকাগুলোর জন্য হুমকি হয়ে ওঠা হ্রদটির পানি শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে অনেকটাই নেমে গিয়েছিল। তবে শনিবার গভীর রাতে ড্রোনে দেখা যায়, হ্রদটির ২ দশমিক ৮ কিলোমিটারভাটিতে একটি ভূমিধস হয়েছে। এতে নতুন একটি বাঁধ তৈরি হয়েছে এবং সেখানে নতুন করে পানি জমতে শুরু করেছে।

নেপালে উদ্ধার তৎপরতা এখন বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া পাঁচটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের দিকে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আপার ত্রিশূলী কমপ্লেক্স। কর্তৃপক্ষ শুক্রবার জানিয়েছিল, সেখানে প্রায় ৩৫০ জন একটি টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন। নেপাল প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। তাদের সঙ্গে চীন ও ভারতের বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দলও কাজ করছে।

রোববার নেপালের সামরিক বাহিনী দুর্গম ওই এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি আকাশপথে পৌঁছে দেয়। উদ্ধারকারীরা একটি টানেলের প্রবেশমুখে পৌঁছে সেখানে প্রবেশের পথ আটকে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু করেছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রবেশপথ নিরাপদ ও উন্মুক্ত করা গেলে অক্সিজেন সরবরাহ ও ক্যামেরা নিয়ে উদ্ধারকারী দল টানেলের ভেতরে প্রবেশ করবে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতি বলেন, ‘এটা খুবই কঠিন, কারণ এখানে প্রচুর ধ্বংসাবশেষ রয়েছে এবং পথ তৈরি করতে আমরা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সেগুলো সরাতেও পারছি না।’

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, বিশেষায়িত কয়েকটি ক্ষেত্রে নেপালের আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে টানেলের ভেতর উদ্ধার অভিযান, ডিএনএ পরীক্ষা, মরদেহ সংরক্ষণের জন্য হিমায়িত ব্যবস্থা এবং পচে যাওয়া মরদেহ শনাক্তে ফরেনসিক পরীক্ষা।

পচতে থাকা মরদেহের গণকবর

প্রিয়জনদের খোঁজে স্বজনেরা কয়েক দিন ধরে হাসপাতাল, মর্গ ও ত্রাণকেন্দ্রের মধ্যে ঘুরে বেড়ানোর পর নেপালের কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাতপরিচয় শত শত মরদেহের গণকবর দেওয়া শুরু করেছে। মরদেহগুলো পচতে শুরু করেছিল।

দুর্যোগকবলিত এলাকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ান জেলায় দেবঘাটের একটি জঙ্গলে শত শত কবর খোঁড়া হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া অঞ্চল থেকে পানির স্রোতে ভেসে আসা মরদেহগুলো সেখানে দাফন করা হচ্ছে। চিতওয়ানের প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল বলেন, ‘আমাদের সামনে আর কোনো উপায় ছিল না। মরদেহগুলো দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল, সেটিই আমাদের প্রধান উদ্বেগ ছিল।’

শনিবার ৯৬টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ দাফন করা হয়েছে। রোববার আরও ১০০ টির বেশি মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা ছিল। একই সময়ে উদ্ধারকারী দল নদী ও ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে আরও মরদেহ উদ্ধার করে চলেছে। ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কবরের স্থানগুলোও সতর্কতার সঙ্গে নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, ভবিষ্যতে কোনো পরিবার চাইলে তাদের স্বজনের মরদেহ শনাক্ত করতে পারে।

নেপালের পুলিশ কর্মকর্তা অনিল থাপা রয়টার্সকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা যেসব মরদেহ উদ্ধার করেছি, তার অর্ধেকের বেশি শনাক্ত করার উপযোগী অবস্থায় নেই।’ তিনি বলেন, ‘অনেকের মুখ দেখা যাচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু হাত বা পা পাওয়া গেছে। আবার কোথাও শুধু শরীরের কিছু অংশ পাওয়া যাচ্ছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত