Ajker Patrika

থাইল্যান্ড নির্বাচন: ভোট গ্রহণ শুরু, সংবিধান সংশোধনে হ্যাঁ-না গণভোটও চলছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১: ১৬
থাইল্যান্ড নির্বাচন: ভোট গ্রহণ শুরু, সংবিধান সংশোধনে হ্যাঁ-না গণভোটও চলছে
বহুল আলোচিত এই নির্বাচনের পাশাপাশি দেশটিতে চলছে গণভোটও। ছবি: নিক্কেই এশিয়া

থাইল্যান্ডে সাধারণ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। প্রগতিশীল সংস্কারপন্থী দল, সামরিক-সমর্থিত রক্ষণশীল শক্তি এবং জনতাবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতা দখলের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর পাশাপাশি চলছে গণভোট, যার মাধ্যমে পাল্টে যেতে পারে দেশটির সংবিধানও।

আজ রোববার স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় (গ্রিনিচ মান সময় ০১: ০০) ভোটকেন্দ্রগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং বিকেল ৫টা (গ্রিনিচ মান সময় ১০: ০০) পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যমতে, গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আগাম ভোটদানের সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন ২২ লাখের বেশি ভোটার।

মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী আবেগের পটভূমিতে থাইল্যান্ডে ভোট দিচ্ছেন ৫ কোটি ৩০ লাখ নিবন্ধিত ভোটার। সংসদের ৫০০টি আসনের জন্য ৫০টির বেশি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কেবল তিনটি দল পিপলস পার্টি, ভূমজাইথাই ও ফেউ থাই দেশজুড়ে সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তা নিয়ে জয়ী ম্যান্ডেট পাওয়ার অবস্থানে রয়েছে।

বিভিন্ন জরিপে ধারাবাহিকভাবে দেখা যাচ্ছে, কোনো দলই এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে নির্বাচনের পর জোট সরকার গঠনের আলোচনা অনিবার্য বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন।

নাত্থাফং রুয়েংপানিয়াওয়ুতের নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল পিপলস পার্টি আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগের প্রভাব কমানোর প্রতিশ্রুতি এবং অর্থনৈতিক একচেটিয়াবাদ ভাঙার মতো সংস্কারমূলক ইশতেহার তারা দিয়েছে, তা প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে এই দলটিকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে অন্য দলগুলো জোটবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পিপলস পার্টি মূলত মুভ ফরোয়ার্ড পার্টির উত্তরসূরি। ২০২৩ সালের নির্বাচনে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে সর্বাধিক আসনে জয়ী হলেও সামরিক নিযুক্ত সিনেট মুভ ফরোয়ার্ড পার্টিকে ক্ষমতায় যেতে বাধা দেয়। পরে রাজকীয় অবমাননা আইন সংস্কারের প্রস্তাবের দায়ে সাংবিধানিক আদালত দলটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে।

অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের নেতৃত্বাধীন ভূমজাইথাই পার্টি রাজতন্ত্র ও সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে অনুতিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী পায়েতংতার্ন শিনাওয়াত্রার মন্ত্রিসভায় ছিলেন।

কম্বোডিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় নৈতিক স্খলনের অভিযোগে পায়েতংতার্ন সিনাওয়াত্রা ক্ষমতাচ্যুত হন। পরে অনাস্থা ভোটের হুমকির মুখে পড়ে অনুতিন ডিসেম্বরে সংসদ ভেঙে নতুন নির্বাচনের ডাক দেন। অনুতিন তাঁর নির্বাচনী প্রচারে অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন। প্রতিবেশী কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্তে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর সৃষ্ট জাতীয়তাবাদী আবেগকে তিনি রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।

তৃতীয় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফেউ থাই পার্টি কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা-সমর্থিত রাজনৈতিক ধারার সর্বশেষ রূপ। দলটি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা থাই রাক থাই পার্টির জনতুষ্টিবাদী নীতিগুলোকেই সামনে আনছে। ২০০৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল থাই রাক থাই পার্টি। এবারের নির্বাচনে তারা অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন এবং নগদ সহায়তার মতো পপুলিস্ট প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। দলটি প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হিসেবে থাকসিনের ভাতিজা ইয়োদচানান ওংসাওয়াতকে মনোনীত করেছে।

এশিয়ার এই দেশটির ভোটের পাশাপাশি গণভোটটি বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। এই গণভোটের মাধ্যমে দেশটির ভোটারদের সামনে আরও একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। গণভোটটিতে ভোটারদের সামনে প্রশ্ন রাখা হয়েছে, থাইল্যান্ড ২০১৭ সালে সামরিক শাসন প্রণীত সংবিধানের পরিবর্তে একটি নতুন সংবিধান গ্রহণ করা হবে কি না।

গণভোটের ব্যালটে প্রশ্ন রাখা হয়েছে: ‘আপনি কি একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের পক্ষে?’ ভোটারদের জন্য তিনটি উত্তরের বিকল্প রাখা হয়েছে, যেখান থেকে যেকোনো একটি বেছে নেওয়া যাবে, ‘হ্যাঁ’, ‘না’ অথবা ‘মন্তব্য নেই’ (নো কমেন্ট)।

যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় প্রদান করেন, তবে পার্লামেন্ট বা সংসদ একটি নতুন সংবিধানের প্রক্রিয়া শুরু করার আইনি ক্ষমতা লাভ করবে। পক্ষান্তরে যদি ‘না’ ভোট জয়ী হয়, তবে নতুন কোনো গণভোট আয়োজন এবং তাতে জনসমর্থন না পাওয়া পর্যন্ত সংসদ সংবিধান পরিবর্তনের এই উদ্যোগ নিয়ে আর এগোতে পারবে না।

অবশ্য সংবিধানের আমূল পরিবর্তন সম্ভব না হলেও সংসদের কাছে ধারা ধরে ধরে (article-by-article) সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা বজায় থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট সংরক্ষিত বিধানের কোনো পরিবর্তন করা যাবে না; বিশেষ করে ১ এবং ২ নম্বর অনুচ্ছেদ, যা মূলত রাষ্ট্রকাঠামো এবং রাজতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত।

১৯৩২ সালে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে থাইল্যান্ড এ পর্যন্ত ২০টি সংবিধান পরিবর্তন করেছে, যার বেশির ভাগই হয়েছে সামরিক অভ্যুত্থানের পর।

সমালোচকেরা বলছেন, বর্তমান সংবিধানটি অগণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে রেখেছে। এই ব্যবস্থায় সংবিধানে অর্থবহ কোনো সংশোধনী আনা অত্যন্ত দুরূহ।

ব্যাংকক-ভিত্তিক থাইল্যান্ড ফিউচার থিংকট্যাংকের বিশেষজ্ঞ নাপোন জাতুশ্রীপিতাক বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, আগামী নির্বাচনে যে দলটি জয়ী হবে, সাংবিধানিক সংস্কারের গতিপথ নির্ধারণে তাদের বিশাল প্রভাব থাকবে। অর্থাৎ আমরা সামরিক সরকারের তৈরি করা সংবিধান থেকে বেরিয়ে আসব কি না, তা মূলত এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে।’

গণতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো নতুন সংবিধানকে সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগের মতো অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কমানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে রক্ষণশীলদের সতর্কবার্তা, এ ধরনের পরিবর্তন দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত