Ajker Patrika

ফোরাতের তীরে কুর্দি বিদ্রোহের চূড়ান্ত পতন, এসডিএফের তেলক্ষেত্র এখন সিরিয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯: ২৩
ফোরাতের তীরে কুর্দি বিদ্রোহের চূড়ান্ত পতন, এসডিএফের তেলক্ষেত্র এখন সিরিয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে
দেইর হাফেরে কুর্দি বাহিনীর পতনের পর সাধারণ নাগরিকদের উচ্ছ্বাস। ছবি: আনাদোলু

সিরীয় সরকার এবং কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির অধীনে এসডিএফ তাদের বাহিনীকে ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদীর পশ্চিম তীরবর্তী এলাকাগুলো থেকে প্রত্যাহার করে নেবে। গতকাল রোববার এই চুক্তি হয়। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, এসডিএফ বাহিনীকে সিরীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করা হবে। উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় সিরীয় সরকার এবং এসডিএফের মধ্যে কয়েক দিনের প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর এই সমঝোতা হলো। ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদীসংলগ্ন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং তেলক্ষেত্রগুলোর দখল নিয়ে সেনাবাহিনী ও এসডিএফের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল।

দামেস্কে এক ভাষণে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে তিনটি পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ—আল-হাসাকা, দেইর আজ-জোর এবং রাক্কা—যেগুলো আগে এসডিএফের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেখানে সিরীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম শুরু করবে। আল-শারা বলেন, ‘আমরা আমাদের আরব গোত্রগুলোকে শান্ত থাকার এবং চুক্তির শর্তাবলি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার পরামর্শ দিচ্ছি।’

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, আইএসআইএল (আইএস) বন্দী ও ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা এসডিএফ প্রশাসন এবং স্থাপনাগুলো পাহারায় নিয়োজিত বাহিনীকে দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর ফলে সরকার এখন থেকে এসবের পূর্ণ আইনি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করবে।

পাশাপাশি, জাতীয় অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এসডিএফ কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে সামরিক, নিরাপত্তা এবং বেসামরিক উচ্চপদস্থ পদগুলোর জন্য তাদের নেতাদের একটি তালিকা প্রস্তাব করবে।

দামেস্কে সিরিয়া-বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত টম বারাকের সঙ্গে বৈঠকের পর আল-শারা এ ঘোষণা দেন। এসডিএফের প্রধান মাজলুম আবদির এই বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও আল-শারা জানান, আবহাওয়া প্রতিকূল থাকায় তাঁর সফর সোমবার পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।

কুর্দি সংবাদমাধ্যম রুদাও জানিয়েছে, এসডিএফের প্রধান সোমবার দামেস্ক সফর করবেন এবং আল-শারার সঙ্গে দেখা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমটি আরও জানিয়েছে, মাজলুম আবদি দেইর আজ-জোর এবং রাক্কা প্রদেশ থেকে বাহিনী প্রত্যাহারে তাদের সম্মতির কথা নিশ্চিত করেছেন।

টম বারাক এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শেয়ার করা এক পোস্টে লিখেছেন, ‘এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ, যেখানে সাবেক শত্রুরা বিভাজনের বদলে অংশীদারত্বকে গ্রহণ করছে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রেসিডেন্ট আল-শারা নিশ্চিত করেছেন যে কুর্দিরা সিরিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের ঐতিহাসিক অংশীদারকে গ্লোবাল কোয়ালিশনের নতুন সদস্যের (সিরীয় সরকার) সঙ্গে নির্বিঘ্নে একীভূত হতে দেখার অপেক্ষায় রয়েছে। কারণ, আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে এগিয়ে যাচ্ছি।’

এদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট তাইয়্যেপ এরদোয়ানও আল-শারার সঙ্গে এক ফোনালাপে সিরিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং বলেছেন যে আঙ্কারা দামেস্ককে সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রাখবে। তুর্কি প্রেসিডেন্সির তথ্যমতে, এরদোয়ান শারাকে বলেছেন, ‘সিরিয়া এবং পুরো অঞ্চলের জন্য সিরীয় ভূখণ্ড থেকে সন্ত্রাসবাদের সম্পূর্ণ নির্মূল প্রয়োজন।’

তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে এসডিএফের বিরোধিতা করে আসছে। কারণ, দেশটি এটিকে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) একটি শাখা মনে করে, যাকে তারা ‘সন্ত্রাসবাদী’ গোষ্ঠী হিসেবে গণ্য করে।

সিরিয়ার রাজধানী থেকে আল জাজিরার আয়মান ওঘান্না জানান, এই যুদ্ধবিরতিকে ‘দামেস্ক এবং তার মিত্র তুরস্কের বিজয়’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘তুরস্ক এসডিএফ-কে পিকেকের সিরীয় শাখা হিসেবে দেখে, যে সংগঠনের সাথে তুরস্ক ১৯৮৪ সাল থেকে যুদ্ধে লিপ্ত। এখন যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে বলা হয়েছে যে, এসডিএফ সিরিয়ার সীমান্তের বাইরে থেকে আসা পিকেকে উপাদানগুলোকে বিতাড়িত করবে।’

ওঘান্না আরও যোগ করেন, ‘এখন রাক্কা, হাসাকা এবং দেইর আজ-জোরের মতো শহরগুলো দামেস্কের শাসনের অধীনে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানসহ পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকবে, যা মূলত দামেস্কের প্রত্যাশা ছিল এবং এটি তাদের জন্য সত্যিই খুব ভালো ফল বয়ে এনেছে।’

সিরীয় রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, চুক্তির ফলে এসডিএফ-নিয়ন্ত্রিত প্রদেশগুলো সামরিকভাবে সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হবে এবং বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা হবে। সিরীয় সরকার ‘সব সীমান্ত ক্রসিং এবং তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর’ নিয়ন্ত্রণও গ্রহণ করবে।

এর আগে মার্চ মাসে এসডিএফ বাহিনীকে সিরীয় সেনাবাহিনীতে একীভূত করার একটি চুক্তি হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে, যা এই মাসে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছিল। তবে গত শনিবার থেকে সিরীয় সেনাবাহিনী এসডিএফের দখলে থাকা এলাকাগুলোতে তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সেনাবাহিনী উত্তরের তাবকা শহর ও তার সংলগ্ন বাঁধ এবং রাক্কার পশ্চিমে অবস্থিত প্রধান ফ্রিডম বাঁধ (যা আগে বাথ বাঁধ নামে পরিচিত ছিল) দখল করে নিয়েছে।

তা ছাড়া, সেনাবাহিনী দেইর আজ-জোরে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম তেলক্ষেত্র ‘ওমর’ এবং ‘কোনোকো’ গ্যাস ক্ষেত্র দখল করেছে, যা এসডিএফের জন্য একটি বড় ধাক্কা। গত সপ্তাহে আল-শারা বলেছিলেন যে, এসডিএফ দেশের এক-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করবে এবং প্রধান তেল ও অন্যান্য সম্পদের দখল রাখবে—এটি অগ্রহণযোগ্য।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক গামাল মনসুরের মতে, এসডিএফ রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, যা তাদের দ্রুত পিছু হটার কারণ।

তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, ’কখনো কখনো আপনার অস্ত্র থাকে, কিন্তু আপনার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সমর্থনের অভাব এবং যে কৌশলগত ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে আপনি কাজ করছেন... সেখানেই এসডিএফের সমস্যা ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইরাকি কুর্দিস্তান আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং এসডিএফের কৌশলগত অবস্থান বুঝতে পেরে তাদের বলেছিল যে—আপনাদের আমেরিকানদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে যাতে সিরীয় সরকারের সাথে একটি শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা যায়।’ তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রও এসডিএফকে একই কথা বলেছিল।

মনসুর ব্যাখ্যা করেন, সিরীয় সরকারের দ্রুত অগ্রযাত্রার সাফল্যের পেছনে এসডিএফ-নিয়ন্ত্রিত এলাকার আরব গোত্রগুলোর বড় ভূমিকা ছিল। এসডিএফের শাসন, কুর্দি জাতীয়তাবাদী আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক বিনিয়োগের অভাব নিয়ে অসন্তোষের কারণে ওই উপজাতিদের আনুগত্য আগে থেকেই নড়বড়ে ছিল।

যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এসডিএফ তাদের এলাকা থেকে অসিরীয় কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) নেতাদের এবং সদস্যদের সরিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত