Ajker Patrika

উত্তরাখন্ডের মন্দিরে পলাতক ভারতীয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে জ্যাকব জুমার বৈঠক, খেপেছে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৭: ৫৫
উত্তরাখন্ডের মন্দিরে পলাতক ভারতীয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে জ্যাকব জুমার বৈঠক, খেপেছে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার
ভারতের হরিদ্বারের সিদিপীঠ শ্রী দক্ষিণ কালী মন্দিরে মালা পরিহিত জ্যাকব জুমা। জুমার বাম পাশে মন্দিরের স্বামী কৈলাশানন্দ গিরি এবং তাঁর বাম পাশে ভারতে নিযুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকমিশনার অনিল সুকলাল। ছবিতে বাম দিক থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তি অজয় ​​গুপ্ত। ছবি: এক্স

দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা নিজের দেশের জনগণকে ‘মধ্যমা প্রদর্শন’ (চরম অবজ্ঞা) করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির এক শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী। বড় ধরনের দুর্নীতি কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এক ভারতীয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে জুমার বৈঠকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এই প্রতিক্রিয়া এসেছে।

চলতি সপ্তাহে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা এবং অজয় গুপ্তার একটি ছবি প্রকাশিত হয়, যেখানে তাঁদের ভারতের উত্তরাখন্ডে হরিদ্বারের একটি মন্দিরে একসঙ্গে অবস্থান করতে দেখা যায়।

প্রায় এক দশক আগে দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রভাব খাটানো এবং বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত গুপ্তা ভাইদের বিরুদ্ধে। যদিও উভয় পক্ষই সব সময় এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

গতকাল শুক্রবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার মন্ত্রী খুম্বুদজো এনশাবেনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান প্রকাশ্যে এবং নির্লজ্জভাবে সেই দক্ষিণ আফ্রিকানদের “মধ্যমা” দেখাচ্ছেন, যাঁরা এই গুপ্তা ভাইদের অপকর্মের কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ হারিয়েছেন।’

৮৪ বছর বয়সী জ্যাকব জুমা বর্তমানে উমখন্তো উই সিযওয়ে (এমকে) দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ভারতের ওই মন্দিরে অজয় গুপ্তার সঙ্গে বৈঠকের পর জুমা ঘোষণা করেছেন, তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার আগামী নির্বাচনে আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

এর জবাবে মন্ত্রী এনশাবেনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি (জুমা) ক্রমাগত দেশবাসীকে অবজ্ঞা করে চলেছেন এবং এখনো দাবি করছেন যে আবারও এই দেশ শাসন করতে চান।

জ্যাকব জুমা দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষমতাসীন দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) শীর্ষ নেতা ছিলেন। কিন্তু গুপ্তা পরিবারের সঙ্গে দুর্নীতির একের পর এক অভিযোগ ওঠার পর ২০১৮ সালে তাঁকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়।

২০২২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘স্টেট ক্যাপচার’ (রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও নীতি কুক্ষিগত করা) তদন্তকারী একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানায়, জুমা মূলত গুপ্তা পরিবারের ইশারাতেই দেশের অর্থনীতি পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের নিয়োগ ও বরখাস্ত করতেন।

বিশেষ করে ২০১৫ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী নানলানলা নেনেকে বরখাস্ত করার পেছনে গুপ্তা পরিবারের স্বার্থ ছিল। কারণ, তিনি তাঁদের অন্যায় সুবিধা দিতে রাজি হননি। পরে জুমার নিয়োগ করা ডে ভ্যান রয়েন এবং মালুসি গিগাবা নামের দুই মন্ত্রী সরাসরি গুপ্তা পরিবারের স্বার্থ রক্ষা করেছিলেন বলে কমিশন উল্লেখ করে।

এ ছাড়া দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘এসকম’-এর শীর্ষ পদেও গুপ্তা পরিবারের পছন্দের ব্যক্তিদের বসিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি চালানো হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।

পলাতক গুপ্তা ব্রাদার্স ও আইনি জটিলতা

২০১৮ সালে বিচার বিভাগীয় কমিশন তদন্ত শুরু করার পরপরই গুপ্তা পরিবার দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। ২০১৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা কর্তৃপক্ষ অজয় গুপ্তার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাতিল করে।

তবে অজয় গুপ্তার অন্য দুই ছোট ভাই, অতুল এবং রাজেশ গুপ্তা সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) পাড়ি জমান। ২০২৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি আদালত তাঁদের দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রত্যর্পণ করার আবেদন খারিজ করে দেয়।

ভারতের ওই মন্দিরে জুমার সঙ্গে অজয় গুপ্তার সাক্ষাতের সময় ভারতে নিযুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকমিশনার অনিল সুকলাল উপস্থিত ছিলেন। হাইকমিশনারের এই উপস্থিতিকে একটি ‘লজ্জাজনক ঘটনা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন মন্ত্রী খুম্বুদজো এনশাবেনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক মন্ত্রী রোনাল্ড লামোলা জানিয়েছেন, এই বৈঠকের বিষয়ে সরকার একটি তদন্ত শুরু করবে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে জ্যাকব জুমা একটি ‘সমান্তরাল পররাষ্ট্রনীতি’ চালানোর চেষ্টা করছেন।

প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বিতর্কিতভাবে বিদায় নিলেও দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে জ্যাকব জুমার প্রভাব এখনো ফুরিয়ে যায়নি। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন নতুন দল ‘এমকে’ প্রায় ১৫ শতাংশ ভোট পায়।

এর ফলে ১৯৯৪ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে বর্ণবাদমুক্ত গণতান্ত্রিক যুগে প্রবেশের পর এই প্রথমবারের মতো এএনসি পার্লামেন্টে তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুমার এই নতুন তৎপরতা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্তমান জোট সরকারের জন্য নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত