
ইসলামাবাদে এক নির্ঘুম ও চরম উত্তেজনাপূর্ণ রাত কাটানোর পর, ইরানি ও মার্কিন কর্মকর্তারা কয়েক দশকের মধ্যে তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা কোনো বড় ধরনের সমঝোতা ছাড়াই শেষ করেন। তবে আলোচনার সঙ্গে পরিচিত ১১টি সূত্র জানিয়েছে, সংলাপের পথ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি।
গত মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণার চার দিন পর, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে সপ্তাহান্তের এই বৈঠকটি ছিল গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দুই দেশের কর্মকর্তাদের প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই ছিল সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততা।
ইসলামাবাদের বিলাসবহুল সেরেনা হোটেলের ভেতরে আলোচনাটি দুটি পৃথক উইং এবং একটি সাধারণ এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়। রয়টার্সকে অপারেশনাল স্টাফরা জানিয়েছেন—একটি উইং মার্কিন পক্ষের জন্য, একটি ইরানিদের জন্য এবং একটি পাকিস্তান মনোনীত মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের জন্য বরাদ্দ ছিল।
আলোচনার টেবিলে থাকা প্রধান ইস্যুগুলোর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালী—বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি প্রধান পথ যা ইরান কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র যা পুনরায় খুলে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং তেহরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়েও আলোচনা হয়।
মূল কক্ষে ফোনের অনুমতি ছিল না। ফলে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ প্রতিনিধিদের বিরতির সময় বাইরে এসে নিজ দেশে বার্তা পাঠাতে হচ্ছিল বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে। পাকিস্তান সরকারের একটি সূত্র জানায়, ‘আলোচনার মাঝামাঝি সময়ে বড় ধরনের কোনো সাফল্যের এবং দুই পক্ষ একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে জোরালো আশা ছিল। তবে মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়।’
আলোচনার সঙ্গে জড়িত অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, পক্ষগুলো চুক্তির ‘খুব কাছাকাছি’ পৌঁছে গিয়েছিল এবং প্রায় ‘৮০ শতাংশ কাজ’ সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু এমন কিছু সিদ্ধান্তের মুখে তারা পড়ে যায় যা তাৎক্ষণিকভাবে মীমাংসা করা সম্ভব ছিল না। ইরানের উচ্চপদস্থ দুটি সূত্র আলোচনার পরিবেশকে ‘গম্ভীর এবং অবন্ধুত্বপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেছে। তারা আরও জানায়, পাকিস্তান পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও কোনো পক্ষই উত্তেজনা কমানোর ব্যাপারে সদিচ্ছা দেখায়নি।
দুই ইরানি সূত্র জানিয়েছে, তা সত্ত্বেও রোববার ভোরের দিকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয় এবং আলোচনা একদিন বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে মতভেদ থেকেই যায়। মার্কিন এক সূত্র জানায়, ইরানিরা সম্ভবত এটা বুঝতে পারেনি যে যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য এমন একটি চুক্তি যা নিশ্চিত করবে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। অন্যদিকে ইরানের উদ্বেগের কারণ ছিল মার্কিন উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের অবিশ্বাস।
বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা সূত্রগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রতিবেদনটি বৈঠকের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা, পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং আলোচনা শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছে। এই প্রতিবেদনের বিষয়ে ইরানি সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
গতকাল সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ‘আজ সকালে ফোন করেছিল’ এবং ‘তারা একটি চুক্তিতে আসতে চায়।’ রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে অগ্রগতি হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেছেন, ইসলামাবাদ বৈঠকে মার্কিন অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন, ‘ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আলোচনা দল এই রেড লাইন এবং অন্যান্য বিষয়ে অনড় ছিল। চুক্তির লক্ষ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।’
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এক কূটনীতিক জানান, ভ্যান্স ইসলামাবাদ ত্যাগের পরও মধ্যস্থতাকারী এবং আমেরিকানদের মধ্যে কথাবার্তা চলছে। অন্য একটি সূত্র জানায়, পাকিস্তান এখনো তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সোমবার বলেন, ‘আমি আপনাদের বলতে চাই যে, সমস্যা সমাধানের জন্য এখনো পূর্ণ প্রচেষ্টা চলছে।’
শান্তির পথে অসংখ্য বাধা থাকা সত্ত্বেও, উভয় পক্ষের কাছেই উত্তেজনা কমানোর জোরালো কারণ রয়েছে। মার্কিন হামলা নিজ দেশে অজনপ্রিয় মনে হচ্ছে এবং এটি ইরানের শাসক ব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারবে বলেও মনে হচ্ছে না। অন্যদিকে, ইরানের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া বিশ্ব অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক মাস আগে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এছাড়া, যুদ্ধের কারণে ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, তা দেশটির কর্তৃপক্ষকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল করে তোলার ঝুঁকিতে ফেলেছে। বিশেষ করে কয়েক সপ্তাহ আগেই সেখানে বড় ধরনের বিক্ষোভ দমানো হয়েছে।
দীর্ঘদিনের এই দুই শত্রু পক্ষ একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ খুঁজতে ইসলামাবাদে একত্রিত হয়েছিল। এর আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি ছয় সপ্তাহের যুদ্ধের অবসান ঘটায়, যে যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এই বিরোধের মূলে রয়েছে পশ্চিমা দেশ ও ইসরায়েলের বিশ্বাস যে ইরান পারমাণবিক বোমা চায়। ইরান অবশ্য এই দাবি অস্বীকার করে আসছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান যেন সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে, তাদের প্রধান সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলে, উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করে, একটি বৃহত্তর শান্তি ও নিরাপত্তা কাঠামো মেনে নেয়, আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করে এবং কোনো টোল ছাড়াই হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেয়।
ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল স্থায়ী যুদ্ধবিরতির গ্যারান্টি, ইরান ও তার মিত্রদের ওপর ভবিষ্যতে কোনো হামলা না করার নিশ্চয়তা, সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের স্বীকৃতি এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আলোচনার মূল অংশটি আবর্তিত হয়েছে ভ্যান্স, গালিবাফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে। নিরাপত্তা সূত্রটি বলেছে, ‘সেখানে অনেক উত্থান-পতন ছিল। মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। লোকজন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন এবং আবার ফিরে আসছিলেন।’
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারসহ পাকিস্তানি প্রতিনিধিরা রাতভর দুই পক্ষের মধ্যে যাতায়াত করে আলোচনা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এই আলোচনা ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে। হোটেলের কর্মীরা দ্রুত ব্যাকগ্রাউন্ড চেক শেষে সেখানেই খাওয়া, ঘুম ও কাজ চালিয়ে যান। ইরানি সূত্রগুলো জানায়, যখন গ্যারান্টি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রসঙ্গ আসে, তখন সাধারণত মৃদুভাষী আরাগচির সুর কঠোর হয়ে ওঠে। সূত্রমতে তিনি বলেন, ‘আমরা আপনাদের কীভাবে বিশ্বাস করব যখন গত জেনেভা বৈঠকে আপনারা বলেছিলেন যে কূটনীতি চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র হামলা করবে না?’ প্রসঙ্গত, জেনেভায় গত দফার আলোচনার মাত্র দুই দিন পরেই ইরান লক্ষ্য করে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হয়েছিল।
হরমুজ প্রণালী ও নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও চুক্তির পরিধি নিয়েও দুই পক্ষের মতভেদ ছিল। ওয়াশিংটন শুধু পারমাণবিক ইস্যু ও হরমুজের ওপর গুরুত্ব দিলেও তেহরান একটি বৃহত্তর সমঝোতা চেয়েছিল। এক উত্তপ্ত মুহূর্তে আলোচনার কক্ষের বাইরে চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। এরপর আসিম মুনির ও ইসহাক দার চা-বিরতি ডাকেন এবং দুই পক্ষকে আলাদা কক্ষে সরিয়ে নেন।
রোববার ভোরে আলোচনার শেষ পর্যায়ে মার্কিন প্রতিনিধিরা ইরানিদের তুলনায় অনেক বেশিবার আলোচনার কক্ষ ও তাদের ব্যক্তিগত ফ্লোরের মধ্যে যাতায়াত করছিলেন। মার্কিন একটি সূত্র জানায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়েই আলোচনায় এসেছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে দীর্ঘমেয়াদী আলোচনা নিয়ে সতর্ক ছিল, কারণ তাদের ধারণা ইরানিরা সময়ক্ষেপণ করতে এবং ছাড় না দিতে পারদর্শী।
অচলাবস্থা সত্ত্বেও, ভ্যান্স যখন সাংবাদিকদের সামনে আলোচনার সমাপ্তি ঘোষণা করেন, তখন তাঁর কথায় ভবিষ্যতে আরও যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখান থেকে একটি খুব সহজ প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছি, একটি সমঝোতার পদ্ধতি যা আমাদের চূড়ান্ত এবং সেরা অফার। দেখা যাক ইরানিরা এটি গ্রহণ করে কি না।’

হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার রীতিমতো কেঁপে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে তেল–গ্যাসের ঊর্ধ্বমুখী দামের চাপ সামাল দিতে ইতিমধ্যে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করে
৯ মিনিট আগে
ইসরায়েলি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে ইরানের অন্তত ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রুশ সংবাদ সংস্থা রিয়া নভোস্তিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমাহ মোহাজেরানি এই পরিমাণ জানান। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচ দেশকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সহায়তা করার অভিযোগ
২ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচক দল চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে বৃহস্পতিবার আবারও ইসলামাবাদে ফিরতে পারে। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কোনো সমাধান ছাড়া শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন পরই এমন খবর সামনে এল।
২ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা ও তা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং চারটি প্রস্তাব পেশ করেছেন। তাঁর প্রস্তাব এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আগ্রাসনের কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
৩ ঘণ্টা আগে