Ajker Patrika

রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করার চাপ দিয়ে অন্যায় করছেন ট্রাম্প: জেলেনস্কি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করার চাপ দিয়ে অন্যায় করছেন ট্রাম্প: জেলেনস্কি
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ছবি: এএফপি

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, শান্তি আলোচনা চলাকালে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করতে ইউক্রেনকে বাধ্য করার চেষ্টা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রতি ‘অন্যায়’ করছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি এই অবস্থান ব্যক্ত করেন।

গতকাল মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় রাশিয়া–ইউক্রেনের পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা হয়। তবে এতে কোনো অগ্রগতি হয়নি। আজ বুধবার দ্বিতীয় দফা আলোচনা শুরু হয়। বৈঠকের পর ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ বুধবার সকালে বলেন, শান্তি প্রচেষ্টায় ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হয়েছে এবং আলোচনা চলবে।

কিন্তু ইউক্রেন ও রাশিয়ার উভয় সূত্র জানিয়েছে, ছয় ঘণ্টার বৈঠক ছিল ‘খুবই উত্তেজনাপূর্ণ।’ এই প্রসঙ্গে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি প্রশ্ন তোলেন, মস্কো আদৌ শান্তি চায় কি না। রাশিয়ার কঠোর অবস্থানের আলোচকেরা আবারও পূর্বাঞ্চলের ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। এটি জেলেনস্কি এবং ইউরোপে তাঁর অনেক মিত্রের জন্য চূড়ান্ত সীমারেখা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি যুদ্ধ শেষ করার জন্য জুন মাসকে সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন। তিনি ইউক্রেনকে দ্রুত আলোচনার টেবিলে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু কয়েক দফা আলোচনা হলেও ভূখণ্ড ইস্যুতে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। জেলেনস্কি বলেন, শান্তির জন্য ছাড় দেওয়ার আহ্বান ট্রাম্প বারবার ইউক্রেনকে জানিয়েছেন, রাশিয়াকে নয়। এটি ‘ন্যায্য নয়।’

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, দনবাস অঞ্চলের পূর্বাংশ থেকে একতরফাভাবে সরে গিয়ে রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার মতো শান্তিচুক্তি ইউক্রেনের জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে। জেনেভার একটি হোটেলে টানা দুই দিনের কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ এই আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সমাধানের চেষ্টা করছে। তবে আগামী সপ্তাহে যুদ্ধ চতুর্থ বর্ষপূর্তিতে পৌঁছাতে চলেছে। অর্থবহ কোনো অগ্রগতির লক্ষণ খুব কম।

দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই সংঘাত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। রাশিয়ার রকেট হামলায় ইউক্রেনে বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। ন্যাটো জোটে আস্থার সংকট নতুন করে দেখা দেওয়ায় ইউরোপ অনেকটা পাশ কাটিয়ে রাখা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেন প্রায় তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে এলাকা পুনর্দখল করছে। রাশিয়ার স্টারলিংক যোগাযোগব্যবস্থায় অচলাবস্থার কারণে তাদের সমন্বয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বার্তা সংস্থা এএফপির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বুধবার থেকে রোববারের মধ্যে পাঁচ দিনে ইউক্রেন ৭৮ বর্গমাইল এলাকা পুনর্দখল করেছে। যা ডিসেম্বর মাসজুড়ে রাশিয়ার অগ্রগতির সমান। জেলেনস্কি অ্যাক্সিওসকে বলেন, তিনি ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনীয়রা যাকে ‘ব্যর্থ গল্প’ মনে করবে, এমন কোনো শান্তি পরিকল্পনা তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করতে। তিনি বলেন, ভূখণ্ড ইস্যুতে অগ্রগতি নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক।

সম্প্রতি ক্রেমলিন জানিয়েছে, জেলেনস্কি মস্কো সফর করতে পারেন এবং তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তবে কিয়েভ এই প্রস্তাব নাকচ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকেরা প্রস্তাব দিয়েছেন, ইউক্রেনীয় বাহিনী ডনবাসের যে অংশ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেখান থেকে সরে যাবে। এরপর ওই এলাকাকে একটি নিরস্ত্রীকৃত ‘মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল’ করা হবে। জেলেনস্কি বলেছেন, যদি মস্কোকেও সমান দূরত্বে তাদের সেনা সরাতে বাধ্য করা হয়, তবে তিনি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত।

মস্কোর প্রধান আলোচক হিসেবে ভ্লাদিমির মেদিনস্কিকে পুনর্বহালের সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, আগে মেদিনস্কিকে ইউক্রেনীয়রা ‘ছদ্ম ইতিহাসবিদ’ বলেছেন। কারণ, তিনি সতর্ক করেছিলেন, রাশিয়া আরও ২০ বছর লড়াই চালিয়ে যাবে। জেলেনস্কি বলেন, পুতিনের মতো মেদিনস্কিও যুদ্ধের ‘ঐতিহাসিক শিকড়’ নিয়ে দার্শনিক আলোচনা করতে পছন্দ করেন। তিনি বলেন, ‘এসবের জন্য আমাদের সময় নেই। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং যুদ্ধ শেষ করতে হবে।’

শান্তি আলোচনার সময় মেদিনস্কি অভিযোগ করেন, জেলেনস্কির সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বক্তব্য থেকে বোঝা যায় তিনি আলোচনায় আন্তরিক নন। তিনি দাবি করেন, সম্ভাব্য নির্বাচনের আগে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন জেলেনস্কি। কিয়েভের পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা সচিব রুস্তেম উমেরভ। তিনি বলেছেন, বুধবারও আলোচনা চলবে। তিনি মধ্যস্থতার জন্য ওয়াশিংটনকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, প্রথম দফার আলোচনার ফলাফল ইউরোপীয় মিত্রদের জানিয়েছেন। ওই আলোচনা ‘বাস্তব বিষয় এবং সম্ভাব্য সমাধানের প্রক্রিয়া’ নিয়ে ছিল।

টেলিগ্রামে তিনি লেখেন, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অংশীদার—ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, জার্মানি, ইতালি ও সুইজারল্যান্ডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক শেষ করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আজকের আলোচনার ফলাফল নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি এবং পরবর্তী পদক্ষেপে আমাদের অবস্থান সমন্বয় করেছি।’

ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা নিয়ে কথা বলেছেন। ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র বলেন, ‘গত রাতে প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী ইউক্রেনে নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর পুতিনের বর্বর হামলার নিন্দা পুনর্ব্যক্ত করেন। দুই নেতা ন্যায়সংগত ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান আলোচনা নিয়ে কথা বলেছেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত