Ajker Patrika

আফ্রিকা কেন তুরস্কের কৌশলগত অগ্রাধিকার? বাড়ছে গোয়েন্দা পদচারণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৪৫
আফ্রিকা কেন তুরস্কের কৌশলগত অগ্রাধিকার? বাড়ছে গোয়েন্দা পদচারণা

আফ্রিকা মহাদেশকে ‘কৌলশগত অগ্রাধিকার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এমআইটি) পরিচালক ইব্রাহিম কালিন। গতকাল মঙ্গলবার এই ঘোষণা দেন কালিন। তুরস্ক আফ্রিকাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন মহাদেশটিতে কৌশলগত প্রতিযোগিতা দ্রুত তীব্রতর হচ্ছে। কালিন জানান, আফ্রিকার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঙ্কারা এক বিশেষ ‘আফ্রিকান অ্যাপ্রোচ’ বা আফ্রিকাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে।

রাষ্ট্র পরিচালিত সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি প্রকাশিত এক নিবন্ধে কালিন লেখেন, ‘লিবিয়ায় আমাদের স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা থেকে শুরু করে সোমালিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে অবদান এবং সুদানে আমাদের অভিযানসহ বিভিন্ন এলাকায় ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন হিসেবে আফ্রিকা মহাদেশে আমাদের কর্মকাণ্ড অনেক দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চাদ থেকে নাইজার, টোগো থেকে বুরকিনা ফাসো, তানজানিয়া থেকে কেনিয়া—সমগ্র আফ্রিকাজুড়েই গোয়েন্দা কূটনীতির ইতিবাচক ফলাফল অর্জিত হচ্ছে।’ তুরস্কের আফ্রিকায় নতুন সম্পৃক্ততার সূচনা দশকেরও বেশি আগে। শুরুতে এটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে কূটনৈতিক উপস্থিতিও ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

২০০৩ সালের পর থেকে তুরস্ক ও আফ্রিকার মধ্যকার বাণিজ্য প্রায় আট গুণ বেড়ে ২০২২ সালে ৪০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে আফ্রিকায় তুরস্কের দূতাবাসের সংখ্যা ২০০২ সালের ১২টি থেকে বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ টিতে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আফ্রিকা বিষয়ক কর্মসূচি পরিচালক মুরিথি মুতিগার মতে, ‘বর্তমানে আফ্রিকা মহাদেশে তুরস্ক অন্যতম প্রভাবশালী বহিরাগত শক্তিতে পরিণত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘তুরস্কের দৃষ্টিভঙ্গি আকর্ষণীয়। কারণ, এতে একসঙ্গে রয়েছে হার্ড পাওয়ার—নিরাপত্তা সহায়তার মাধ্যমে এবং সফট পাওয়ার—হাজারো আফ্রিকান শিক্ষার্থীকে তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ এবং বাণিজ্য—যার প্রতীক হিসেবে আফ্রিকাজুড়ে দৃশ্যমান উপস্থিতি রয়েছে তুর্কিশ এয়ারলাইন্সের।’

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্কের আফ্রিকা সম্পৃক্ততা আরও বেশি সামরিক ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। আঙ্কারা সাব-সাহারান আফ্রিকার একাধিক দেশে সশস্ত্র ড্রোন সরবরাহ করেছে এবং নাইজারের মতো দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, আফ্রিকায় তুরস্কের গোয়েন্দা তৎপরতার ইতিহাস অটোমান সাম্রাজ্যের সময় থেকেই বিদ্যমান। উত্তর আফ্রিকায় অটোমান আধিপত্যের সময়ে বহু তুর্কি কর্মকর্তা ও সামরিক সদস্য সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মোস্তাফা কামাল আতাতুর্ক, যিনি ১৯১১ সালে ত্রিপোলিতে যুদ্ধ করেছিলেন এবং পরে আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা হন।

পরবর্তী কয়েক দশকে অবশ্য ইউরোপমুখী নীতি ও ন্যাটোকেন্দ্রিক নিরাপত্তা অগ্রাধিকার অনুসরণের কারণে আফ্রিকার প্রতি আঙ্কারার আগ্রহ কমে যায়। এই ধারা চলে মূলত ২০০০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত। আফ্রিকা বিষয়ে সুদৃঢ় নেটওয়ার্কসম্পন্ন স্বাধীন বিশ্লেষক এবুজের দেমিরচির মতে, প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক একটি সক্রিয় ও বহুমাত্রিক আফ্রিকা নীতি অনুসরণ করছে, যার জন্য প্রয়োজন ‘মাঠভিত্তিক’ গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও কার্যক্রম।

তিনি বলেন, ‘এই রূপান্তরের বাস্তব ও কার্যকরী প্রকাশ স্পষ্টভাবে দেখা যায় লিবিয়া, সোমালিয়া ও সুদানে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের বহুস্তরীয় কর্মকাণ্ডে।’ দেমিরচির ভাষায়, ‘কার্যগত জটিলতা ও কৌশলগত প্রভাবের দিক থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলোর একটি হলো ইতালীয় মানবাধিকারকর্মী সিলভিয়া রোমানোর উদ্ধার অভিযান। ২০২০ সালে সোমালিয়ায় সন্ত্রাসী সংগঠন আল-শাবাবের হাতে প্রায় দুই বছর বন্দিত্বের পর তাঁকে মুক্ত করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, অত্যন্ত অস্থির ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পরিচালিত এই অভিযান বিশ্বে অল্প কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার অর্জনযোগ্য উন্নত মাঠপর্যায়ের সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।

নাইজার, বুরকিনা ফাসো ও মালির প্রতি তুরস্কের আগ্রহ—যেগুলো একসময় ফরাসি উপনিবেশ ছিল এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক শাসনে গেছে—আঙ্কারার বাস্তববাদী নীতির প্রতিফলন। একটি মধ্যম শক্তি হিসেবে তুরস্ক সাধারণত সেখানে সক্রিয় হয়, যেখানে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়।

মোগাদিসুভিত্তিক দ্য রোড পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো ক্লিফোর্ড সি ওমন্ডি ওকওয়ানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকায় উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়ার পর ২০১৪ সালের পর থেকে রাশিয়া, চীন ও তুরস্কের মতো দেশগুলো তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, সোমালিয়ায় তুরস্ক একটি স্বতন্ত্র নিরাপত্তা মডেল গড়ে তুলেছে, যেখানে বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপের ওপর নির্ভর না করে রাষ্ট্রগঠন ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়।

পশ্চিমা শক্তিগুলোর তুলনায় আঙ্কারা এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ করে, যা সোমালি কর্তৃপক্ষকে নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করতে সক্ষম করে। এ ছাড়া তুরস্ক সাধারণত আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাতে—সুদান, ইথিওপিয়া কিংবা কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে—কোনো পক্ষ নেয় না। বরং মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের চেষ্টা করে।

ওকওয়ানি বলেন, ‘তুরস্ক বলে—একটি মধ্যম শক্তি হিসেবে আমি যথেষ্ট শক্তিশালী, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মধ্যে শান্তি আনার চেষ্টা করতে পারি, ব্যর্থ হলেও দেখব কী হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের পদ্ধতি থেকে আলাদা। তুরস্কও একটি শক্তিতে পরিণত হতে চায়; এটি একটি ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক খেলোয়াড়।’

মালি এর গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আঙ্কারা দেশটিকে একাধিক সশস্ত্র ড্রোন বিক্রি করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে তুরস্ক মালি সরকারকে ছয়টি উন্নত উচ্চ-উড্ডয়ন সক্ষম ড্রোন সরবরাহ করে, যার মূল্য প্রায় ২১০ মিলিয়ন ডলার। নাইজারেও নিরাপত্তা সহযোগিতা অর্থনৈতিক ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তুরস্কের জ্বালানিমন্ত্রী আলপারসলান বাইরাকতার গত মাসে ঘোষণা দেন, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে নাইজারে স্বর্ণ উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা করছে আঙ্কারা।

এবুজের দেমিরচির মতে, ‘ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের প্রধান যখন প্রকাশ্যে এত বিস্তৃত ভৌগোলিক উপস্থিতির কথা বলেন, তখন তা ইঙ্গিত দেয় যে তুরস্কের গোয়েন্দা সক্ষমতা এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতা ও প্রতিরোধক্ষমতায় পৌঁছেছে, যেখানে এই উপস্থিতি আর গোপন রাখার প্রয়োজন নেই; বরং প্রকাশ্য স্বীকৃতি দেওয়াই যথাযথ।’

তিনি বলেন, ‘এই বার্তাটি বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী গোয়েন্দা সংস্থা ও অঞ্চলবহির্ভূত শক্তিগুলোর উদ্দেশে দেওয়া—যাতে স্পষ্ট হয়, তুরস্ক আর আফ্রিকায় কেবল একজন নীরব পর্যবেক্ষক নয়; বরং এমন এক শক্তি, যে মাঠপর্যায়ের গতিবিধি প্রভাবিত করতে পারে এবং প্রয়োজনে প্রতিযোগী কৌশল ব্যাহত করতেও সক্ষম।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ভেনেজুয়েলার বিনিময়ে ২০১৯ সালেই ট্রাম্পের কাছে ইউক্রেন চেয়েছিল রাশিয়া

জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানে ভর করে আইএমএফের ঋণ থেকে মুক্তি চায় পাকিস্তান

৬৬ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিচ্ছেন ট্রাম্প

বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে ‘গায়েব’ করে দিল আইসল্যান্ড

একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে ৬২ বছর বয়সে গর্ভধারণ, ভাইরাল নারী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত