রাশিয়া নিয়ে বক্তব্য সংযত করতে ও উসকানি না দিতে ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা

রাশিয়ার হুমকি নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্য মহাদেশের নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অবস্থায় লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়াকে বক্তব্য সংযত করার পরামর্শ দিয়েছে পেন্টাগন। পাশাপাশি রাশিয়াকে ‘উসকানি’ না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের নীতিবিষয়ক প্রধান এলব্রিজ কলবি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, রাশিয়ার হুমকি নিয়ে প্রকাশ্য বক্তব্য সংযত করার জন্য ন্যাটোর কয়েকটি দেশকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অনুরোধ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। ইউরোপীয় নেতাদের ও কর্মকর্তাদের কিছু বক্তব্য মহাদেশটির নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর মধ্যে তিনজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা ও একজন মার্কিন কর্মকর্তা। তাঁদের ভাষ্য, যেসব দেশকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংযত থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে এসব বার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে ইউরোপের অন্য দেশগুলোর সরকারকেও একই বার্তা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অনুরোধ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে। ওয়াশিংটনের সর্বশেষ উদ্যোগে রাশিয়াকে বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে, যার মধ্যে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করতে কিয়েভের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মিত্রদের মধ্যে ব্যক্তিগত আলোচনা ব্যক্তিগতই থাকে। তাই এসব অভিযোগ নিয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করব না।’
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের নজরে আসা বক্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় নেতাদের এমন কিছু মন্তব্য, যেখানে বলা হয়েছে, রাশিয়া এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং ইউক্রেনে তাদের সামরিক অভিযান কার্যত স্থবির হয়ে আসায় মস্কো ক্রমেই মরিয়া পদক্ষেপ নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের যেসব কর্মকর্তা এই বার্তা দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে পেন্টাগনের নীতিবিষয়ক প্রধান এলব্রিজ কলবি অন্যতম। ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতির মাত্রা পুনর্মূল্যায়নের চলমান প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন তিনি। তবে এ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের আর কোন কোন কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন, তা জানতে পারেনি রয়টার্স। সূত্রগুলোর কেউই বলেননি যে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে দেওয়া পরামর্শ কোনো বিরোধপূর্ণ বা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
রাশিয়াকে ‘উসকানি’ না দেওয়ার পরামর্শ
রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক অবস্থানের বিষয়ে প্রকাশ্যে কীভাবে বক্তব্য দেওয়া উচিত, তা নিয়ে ন্যাটোর অভ্যন্তরে মতপার্থক্য রয়েছে। পেন্টাগনের সাম্প্রতিক বার্তা সেই বিতর্ককেই সামনে এনেছে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের একাংশের যুক্তি, রাশিয়ার হুমকিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরলে তা ক্রেমলিনের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। তাঁদের মতে, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া এবং ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন দুর্বল করাই রাশিয়ার অন্যতম লক্ষ্য।
অন্যদিকে, আরেকটি পক্ষ মনে করে, রাশিয়ার হুমকির বিষয়টি ইউরোপীয় সরকারগুলোর জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা উচিত। কারণ, মস্কোকে প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় ত্যাগ স্বীকার ও সম্পদ ব্যয়ের বিষয়ে নিজ নিজ দেশের জনগণকে অবহিত রাখা জরুরি। বিশেষ করে ইউরোপজুড়ে রাশিয়ার গোপন নাশকতামূলক তৎপরতা বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে রাশিয়া এ ধরনের নাশকতামূলক অভিযান পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, সম্প্রতি বাল্টিক অঞ্চলের এক কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে এলব্রিজ কলবি বলেছিলেন, রাশিয়াকে কোনোভাবেই ‘খোঁচানো’ বা উসকানি দেওয়া উচিত নয়। সূত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় নেতাদের প্রকাশ্যে রাশিয়াকে ‘কোণঠাসা ইঁদুরের’ সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন কলবি। তাঁর মতে, এ ধরনের বক্তব্য সহায়ক নয়।
তবে কলবি ঠিক কোন বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টেন মিখাল রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ‘কোণঠাসা ইঁদুর’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়ায় পুতিন ইউরোপে নাশকতামূলক তৎপরতার আশ্রয় নিচ্ছেন।
পেন্টাগনের সাম্প্রতিক ব্যক্তিগত বার্তাগুলো সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে আরেক ইউরোপীয় কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আপনাদের সহায়তা করছি। আমেরিকানরা সেখানে আছে। শুধু বেশি উচ্চবাচ্য করবেন না। কোনো শোরগোল তৈরি করবেন না।’ সম্প্রতি আরেকটি পৃথক বৈঠকে পেন্টাগন এস্তোনিয়ার একটি প্রতিনিধিদলকে তাদের বক্তব্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘পরিমিত’ থাকার পরামর্শ দিয়েছে। বৈঠক সম্পর্কে অবহিত এক ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন। তবে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্যের বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন কি না, তা তিনি জানাননি।









