Ajker Patrika

ছাড়পত্রের জটিলতায় আটকা হামের জিনোম সিকোয়েন্সিং

  • গত কয়েক বছর নমুনা বিদেশে যায়ইনি।
  • দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ।
  • জিনগত তথ্য চুরি রোধে কড়াকড়ি জারি হয়েছিল।
  • সরকারি নমুনার অনুমতির শর্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন।
মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
ছাড়পত্রের জটিলতায় আটকা হামের জিনোম সিকোয়েন্সিং
ছবি: সংগৃহীত

সরকারি প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ) চলমান হামের ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করার পর নমুনা ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক রেফারেন্স পরীক্ষাগারে পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু এ জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাদের। এ ধরনের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতায় গত কয়েক বছর কোনো নমুনা বিদেশে পাঠানোই যায়নি। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির বাধ্যবাধকতা যৌক্তিক নয়।

বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশ থেকে রোগজীবাণুর জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রতিবেদন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় (ডব্লিউএইচও) পাঠাতে হয়। দেশীয় প্রতিষ্ঠানের ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং (জিনের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ) করার আন্তর্জাতিক অনুমোদন নেই বলে কাজটি করতে হয় ডব্লিউএইচও অনুমোদিত কয়েকটি আঞ্চলিক রেফারেন্স পরীক্ষাগারে।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, চলতি বছর দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের পর তাদের আওতাধীন ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজেলস ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল) ৩০টি নমুনার জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সব কটি নমুনাতেই ভাইরাসের ‘বি-৩’ ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়। দেশের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের এই ফল ডব্লিউএইচওর আন্তর্জাতিক নথি ও গ্লোবাল ম্যাপিংয়ে যুক্ত করার জন্য নমুনাগুলো এবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জীবাণুবিদ ও পরীক্ষাগারসংশ্লিষ্টরা জানান, ডব্লিউএইচওর গ্লোবাল মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্কের (জিএমআরএলএন) অধীনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ১১টি দেশের জন্য ল্যাবের মান নিয়ন্ত্রণের কঠিন শর্ত রয়েছে। বাংলাদেশের আইপিএইচের ল্যাবটি হাম ভাইরাস শনাক্তকরণের জন্য ডব্লিউএইচওর অ্যাক্রেডিটেশন বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। তবে ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য এখনো স্বীকৃত নয়। সে কারণে প্রতিবছর দেশ থেকে দৈবচয়ন ভিত্তিতে কিছু নমুনা আঞ্চলিক ল্যাবে পাঠাতে হয়। আঞ্চলিক ল্যাব তা পুনরায় পরীক্ষা করে নিশ্চিত করে।

আইপিএইচের দুজন জীবাণুবিদ আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অতীতে কয়েক বছর অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অতীতে দেশের কিছু বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা বিদেশি ল্যাব ব্যবসায়িক স্বার্থে রোগীদের রক্ত ও ডিএনএ নমুনা অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বিদেশে পাঠাত। এ থেকে সম্ভাব্য ‘বায়োপাইরেসি’ বা জিনগত তথ্য চুরি রোধে আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন এবং রপ্তানি নীতি আদেশের আওতায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করে সরকার।

আইপিএইচ সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ মে প্রতিষ্ঠানটি ইপিআইয়ের কাছে এ বিষয়ে চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে দেশব্যাপী হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় নমুনাগুলোর মধ্যে সেরাম (রক্তের উপাদান) ও পিসিআর প্রোডাক্ট দ্রুততম সময়ের ভেতরে থাইল্যান্ডে পাঠানো প্রয়োজন।

আইপিএইচের পরিচালক ডা. মো. মোমিনুর রহমান বলেন, বৈজ্ঞানিক নমুনা কুরিয়ারে বিদেশে পাঠাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ছাড়পত্র লাগে।...এর আগেও বিদেশে নমুনা পাঠানোর ছাড়পত্রের জন্য চিঠি দেওয়ার পর অগ্রগতি হয়নি।

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে নিয়ম হওয়া উচিত, কোনো স্বীকৃত সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান থেকে জনস্বাস্থ্য রক্ষা, গবেষণা বা মানের নিশ্চয়তার উদ্দেশ্যে অবাণিজ্যিক নমুনা বিদেশে পাঠাতে হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। এ রকম জনস্বাস্থ্য-বিষয়ক জরুরি বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির বাধ্যবাধকতা যৌক্তিক নয়। তাঁরা উল্লেখ করেন, আইসিডিডিআরবি নিয়মিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে নমুনা বিদেশে পাঠাতে পারলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্তরভিত্তিক দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিকতার কারণে তা পারছে না। ব্যাপক হামের প্রাদুর্ভাবের এই সময়ে নমুনাগুলো দ্রুত বিদেশে পাঠানোর জন্য স্বাস্থ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।

নমুনা বিদেশের ল্যাবে পাঠাতে আইপিএইচের চিঠির বিষয়ে ইপিআইয়ের সহকারী পরিচালক ডা. হাসানুল মাহমুদ বলেন, ‘আইপিএইচের চিঠি আমরা পেয়েছি। ফাইলটি প্রসেসিংয়ে রয়েছে (প্রক্রিয়াধীন)। এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ হয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত ছাড়পত্রের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। অতীতে এই ধরনের অনুমোদনের প্রক্রিয়াগুলো কীভাবে সম্পন্ন হয়েছিল, তা আমরা পূর্ববর্তী বছরগুলোর নথি দেখে যাচাই করছি।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে ছাড়পত্র নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আমরা এ জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ওপর নির্ভর করি। তাদের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ থাকলে দ্রুততম সময়ে অনুমতি দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ে এই ফাইল আটকে রাখা হয় না। যথাযথ আবেদন পেলে দুই দিনের বেশি সময় লাগে না। আইসিডিডিআরবিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়মিত এই ছাড়পত্রেই নমুনা বাইরে পাঠাচ্ছে।’

আগের কয়েক বছর সরকারি প্রতিষ্ঠান আইপিএইচের অনুমতি না পাওয়ার বিষয়ে আবদুর রহিম বলেন, ‘তখন আমি এই দায়িত্বে না থাকায় সুনির্দিষ্ট কারণ এই মুহূর্তে বলতে পারব না। তবে এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সুপারিশ পাঠানো হলে সর্বোচ্চ এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই অনাপত্তিপত্র ইস্যু করে দেব।’

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমই‍উ) ভাইরোলজির অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফের সহযোগিতায় হাম নির্মূলকরণ কর্মসূচি চলছে। এ কর্মসূচির প্রধান শর্তই হলো প্রতিবছর দেশে ভাইরাসের কোন ধরনটি ছড়াচ্ছে, তা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে গ্লোবাল নেটওয়ার্কে রিপোর্ট করা।’

হাম-রুবেলা নির্মূলবিষয়ক ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির চেয়ারম্যান এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘নমুনা বিদেশে পাঠানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুমোদন লাগবে, এই জটিলতা গত কয়েক বছর ধরে চলছে। এর জেরে দীর্ঘ সময় জিনোম-সংক্রান্ত তথ্য পাঠানো না গেলে হাম মোকাবিলায় বৈশ্বিক কর্মসূচিতে সহায়তা বা নির্মূলের সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়ব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত