Ajker Patrika

হামের প্রাদুর্ভাব: নিয়মিত টিকার বাইরে ১০ শতাংশ শিশু

  • টিকা কার্যক্রমে ঘাটতি, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনায় বেড়েছে হাম।
  • গত আট বছর হামের টিকাই দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর।
মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
হামের প্রাদুর্ভাব: নিয়মিত টিকার বাইরে ১০ শতাংশ শিশু
হামের প্রাদুর্ভাবে শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে। এই পরিস্থিতিতে রোগীর চাপ সামলাতে কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটে গড়া হয়েছে হাম আইসোলেশন কর্নার। গতকাল তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা

দেশে সম্প্রতি অতি সংক্রামক রোগ হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১২ জেলায় এ রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে অন্তত চার ডজন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। হাসপাতালগুলোতে কয়েক হাজার শিশু ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে।

হঠাৎ এ সংক্রমণ বাড়ার কারণ সম্পর্কে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশ শিশু টিকা পায়, অর্থাৎ অন্তত ১০ শতাংশ শিশু বাইরে থেকে যায়। এই ‘মিসিং’ শিশু ধীরে ধীরে ঝুঁকিতে পড়ে এবং কয়েক বছর পর সংক্রমণ দেখা দেয়। আর দীর্ঘদিনের টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং রোগ নজরদারির দুর্বলতার ফলে এখন এ সংক্রমণ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে হামে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। অধিদপ্তরের এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ভোলায় সংক্রমণ বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক হালিমুর রশিদ বলেন, আউটব্রেক যেন খুব বেশি না বাড়ে, তার জন্য রোগীদের আইসোলেশন করা হচ্ছে। রাজধানীতে শিশু হাসপাতাল, সংক্রামক রোগ হাসপাতাল ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মার্কেট হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালকে হাম রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

জানা যায়, হামের কারণে ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালে ২২, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ (সন্দেহভাজন), বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬ , চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ৫ জন মারা গেছে। তারা সবাই শিশু।

গতকাল রোববার একটি অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, গত আট বছরে দেশে অতি সংক্রামক এই রোগের টিকাই দেওয়া হয়নি। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এটি সত্য নয়; টিকা ইপিআইয়ের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ এবং সব সময় দেওয়া হয়। নিয়মিত টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, তাই কয়েক বছর পরপর ক্যাম্পেইন করা হয়।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘অনেক শিশু ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তাই টিকাদানের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সর্বশেষ ২০২০ সালে ক্যাম্পেইন চালিয়েছে; ২০২৪ সালে করার পরিকল্পনা থাকলেও তা হয়নি। এপ্রিলে নতুন ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা রয়েছে। গ্যাভির সহায়তায় সারা দেশে হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি চার বছর অন্তর ফলোআপ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়, যাতে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা যায়।

দীর্ঘদিন ধরে সংক্রামক রোগের চিকিৎসা করছেন সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. আরিফুল বাশার। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় ৮৬-৯০ শতাংশ শিশু টিকা পায়, অর্থাৎ অন্তত ১০ শতাংশ শিশু বাইরে থেকে যায়। এই ‘মিসিং’ শিশু ধীরে ধীরে ঝুঁকিতে পড়ে এবং কয়েক বছর পর আউটব্রেক দেখা দেয়। এজন্য প্রতি পাঁচ বছর পর বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা হয়।’ তিনি বলেন, ‘আগে যেখানে ৯ মাস বয়সের পর শিশু আক্রান্ত হতো, এখন ৬ মাস বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে।’

ইপিআইয়ে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের ১১টি প্রাণঘাতী রোগ থেকে বাঁচাতে বিনা মূল্যে টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি, টিটেনাস, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি প্রতিরোধে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা; যক্ষ্মার জন্য বিসিজি; নিউমোনিয়ার জন্য পিসিভি; পোলিওর জন্য ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন এবং হাম-রুবেলা টিকা।

তবে ২০২৪ সাল থেকে স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে অপারেশনাল প্ল্যান থেকে ‘আমব্রেলা অ্যাপ্রোচ’-এ যাওয়ায় টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

জাতীয় টিকাদান সূচি অনুযায়ী, শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয়। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ লাখ শিশুর জন্য টিকার প্রয়োজন হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অপারেশনাল প্ল্যান আগে টিকাদান, হাসপাতাল সেবা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সমন্বয় করত। তবে এসব স্থগিত হওয়ায় নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হয়েছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরামর্শক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এটি নতুন কোনো আউটব্রেক নয়। ২০২৪ সাল থেকে চলমান টিকাদান ঘাটতির ফলে পরিস্থিতি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তীব্র হয়েছে। হামের মতো রোগে সাধারণত মৃত্যুর কথা নয়—জ্বর নিয়ন্ত্রণ, অক্সিজেন ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসাসহ সাপোর্টিভ কেয়ার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই সম্ভব। কিন্তু সুবিধা না থাকায় রোগীদের ঢাকায় পাঠানো হয় এবং আইসিইউ সংকটের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে।’

এদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ পর্যন্ত ১০৬ শিশু ভর্তি হয়েছে। যার মধ্যে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাবনায় ২৭ শিশু বর্তমানে চিকিৎসাধীন। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত তিন দিনে ৩০ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে ১৬ শিশু চিকিৎসাধীন।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন ময়মনসিংহ, সিলেট ও পাবনা প্রতিনিধি)।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত