প্রতিদিনের ক্লান্তি দূর করতে বা শরীর চাঙা রাখতে এক গ্লাস পরিচ্ছন্ন পানির বিকল্প নেই। কিন্তু এই স্বচ্ছ পানির ভেতরেই যদি লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য এক স্বাস্থ্যঝুঁকি? আমাদের অজান্তেই প্রতিদিনের খাবার পানি ও নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করছে একধরনের কৃত্রিম রাসায়নিক। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে পিএফএএস এবং সাধারণভাবে এটি ফরএভার কেমিক্যালস বা চিরস্থায়ী রাসায়নিক নামে পরিচিত।
কী এই ‘ফরএভার কেমিক্যালস’
মানুষের তৈরি এই ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপাদানগুলো সাধারণত খাদ্য মোড়কীকরণ, নন-স্টিক বাসন এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা সামগ্রীতে ব্যবহৃত হয়। এগুলোর হাজারো ধরন থাকলেও পরিবেশে সবচেয়ে বেশি মেলে পিএফওএ এবং পিএফওএস। এদের ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ বলা হয়, কারণ এগুলো পরিবেশ বা মানুষের শরীরে অত্যন্ত ধীরে ধীরে ভাঙে। সহজে ধ্বংস না হওয়ার কারণে বছরজুড়ে এগুলো আমাদের পরিবেশ ও শরীরে জমা হতে থাকে।
খাবার পানিতে মেশে যেভাবে
বিভিন্ন শিল্পকারখানার অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ও ক্ষতিকর তরল সরাসরি জলাশয়ে ফেলার কারণে এই বিষাক্ত উপাদান পানি, মাটি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। বর্জ্য শোধনাগার, ল্যান্ডফিল বা ময়লা ফেলার স্থান, পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি, কার ওয়াশ, বিমানবন্দর, সাময়িক ঘাঁটি, টেক্সটাইল, চামড়া, প্লাস্টিক ও রং তৈরির কারখানা থেকে এটি বেশি নিঃসৃত হয়। এ ছাড়া দূষিত মাটি বা ল্যান্ডফিল থেকে বৃষ্টির পানির সঙ্গে চুইয়ে তা সুপেয় পানির উৎসে মেশে।
বাংলাদেশেও কি এই ঝুঁকি রয়েছে
হ্যাঁ, মারাত্মক এই সমস্যা বাংলাদেশেও ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। বাংলাদেশ একটি প্রধান পোশাক ও টেক্সটাইল রপ্তানিকারক দেশ। কাপড়ে পানি বা দাগ প্রতিরোধক প্রলেপ দেওয়া, ডাইং, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্লাস্টিক কারখানায় প্রচুর পরিমাণে এই কেমিক্যাল ব্যবহৃত হয়। ঢাকা ও আশপাশের টেক্সটাইলশিল্প এলাকার ৮৭ শতাংশ ভূ-উপরিস্থ (নদী ও জলাশয়) এবং ৭৫ শতাংশ ট্যাপের পানির নমুনায় পিএফএএস পাওয়া গেছে। তুরাগ ও কর্ণফুলীর মতো নদীতে এর মাত্রা অনেক বেশি। ঢাকার বাসাবাড়িতে সরবরাহকৃত ট্যাপের পানি, বাজারে বিক্রি হওয়া ব্র্যান্ডের পোশাক এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকার মাছেও এর অস্তিত্ব মিলেছে। উন্নত দেশে কড়া নীতিমালা থাকলেও বাংলাদেশে এটি নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার কোনো পূর্ণাঙ্গ আইন এখনো হয়নি। তা ছাড়া আমাদের দেশে প্রচলিত সাধারণ ফিল্টার বা পানি ফোটানোর মাধ্যমে এই উপাদান দূর করা যায় না। আমাদের দেশে বহুল ব্যবহৃত সাধারণ ফিল্টার (যেমন ফুটানো বা সাধারণ ক্যান্ডেল/মেমব্রেন ফিল্টার) পানি থেকে পিএফএএস দূর করতে পারে না। এর জন্য হাই-গ্রেড রিভার্স অসমোসিস বা অ্যাক্টিভেটেড কার্বন ফিল্টার প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব
বেশির ভাগ মানুষই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে। অন্যান্য রোগের পাশাপাশি এটি টেস্টিকুলার (অণ্ডকোষ) এবং কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এটি নারী প্রজনন অঙ্গ, স্তন ও থাইরয়েড টিস্যুকে প্রভাবিত করে এবং ডিম্বাশয়ের সমস্যা যেমন পিএমওএসের ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রতিরোধ ও সুরক্ষার উপায়
অদৃশ্য এই ঝুঁকি থেকে বাঁচতে এখনই প্রয়োজন সঠিক সচেতনতা ও কার্যকর পানি শোধন পদ্ধতির ব্যবহার। নিজের ও পরিবারের সুরক্ষায় সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি:
- বাসাবাড়িতে বিশেষ করে রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে ‘রিভার্স অসমোসিস’ বা ‘আরও’ ফিল্টার বসানো একটি সাশ্রয়ী ও কার্যকর সমাধান।
- অ্যাক্টিভেটেড কার্বন ও আয়ন এক্সচেঞ্জ ফিল্টারেশন প্রযুক্তিগুলো পানি থেকে এই কেমিক্যালের কণাগুলোকে শুষে নিতে বা আটকে দিতে সক্ষম।
- দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিক বা নন-স্টিক সামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত খবরাখবরের ওপর নজর রাখা প্রয়োজন।
সূত্র: হেলথ লাইন, দ্য গার্ডিয়ান










