Ajker Patrika

মেলিওডোসিস: মাটির জীবাণু থেকে প্রাণঘাতী সংক্রমণে বাড়ছে উদ্বেগ

ডা. কাকলী হালদার
মেলিওডোসিস: মাটির জীবাণু থেকে প্রাণঘাতী সংক্রমণে বাড়ছে উদ্বেগ
ছবি: সংগৃহীত

প্রকৃতির মাটি ও পানিতে এমন কিছু জীবাণু রয়েছে, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এদের মধ্যে অন্যতম বার্কহোল্ডারিয়া সিউডোম্যালি, যা মেলিওডোসিস নামের একটি গুরুতর সংক্রামক রোগের জন্য দায়ী। বিশেষ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এ রোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশেও এ রোগের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কী রোগ সৃষ্টি করে এই জীবাণু

বার্কহোল্ডারিয়া সিউডোম্যালি একটি গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া, যা প্রধানত মাটি ও পানিতে বাস করে। এই জীবাণুর সংক্রমণে মেলিওডোসিস হয়। রোগটি ফুসফুস, ত্বক, যকৃৎ, প্লীহা, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গ আক্রমণ করতে পারে। কখনো এটি রক্তে ছড়িয়ে সেপসিস বা সারা শরীরে গুরুতর সংক্রমণ সৃষ্টি করে। ফুসফুসে নিউমোনিয়া, ত্বকে ঘা বা ফোঁড়া এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গে পুঁজ জমা এ রোগের পরিচিত প্রকাশ। এ রোগের বিশেষ উদ্বেগের কারণ হলো, এর লক্ষণ অনেক সাধারণ সংক্রমণের মতো হতে পারে। ফলে রোগটি সহজে শনাক্ত না হলে চিকিৎসা শুরুতে দেরি হয়।

বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ কেন

মেলিওডোসিস দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে দেখা যায়। থাইল্যান্ডে বর্তমানে মেলিওডোসিস বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত সয়েল ফিভারের প্রকোপ বেশ উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। দেশটির জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগ এ নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত থাইল্যান্ডের শুধু উত্তর-পূর্বাঞ্চলের (ইসান অঞ্চল) চারটি প্রদেশে ৫৭০ জন আক্রান্ত এবং ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বর্ষাকাল, বন্যা এবং মাটির সংস্পর্শে আসার সুযোগ বাড়লে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিশ্বজুড়ে এ রোগের প্রকৃত বোঝা দীর্ঘদিন ধরে কম নিরূপিত হয়েছে। কারণ, অনেক এলাকায় পরীক্ষাগারের সুবিধা সীমিত এবং রোগটি সম্পর্কে চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের ধারণা কম। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই জীবাণু পরিবেশে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে এবং দূষিত মাটি বা পানি থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এ ছাড়া জীবাণুটি শনাক্ত ও সঠিকভাবে চিকিৎসা করা কঠিন হতে পারে। গুরুতর সংক্রমণে মৃত্যুঝুঁকি বেশি এবং চিকিৎসার পরও রোগীর দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি

বাংলাদেশে মেলিওডোসিসের রোগী শনাক্ত হওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন রয়েছে। দেশের মাটি ও পানির পরিবেশ, কৃষিকাজ এবং বর্ষাকালে পানির সংস্পর্শের বিষয়গুলো এ রোগের ঝুঁকি বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে মোট কতজন আক্রান্ত হচ্ছেন, প্রকৃত সংক্রমণের হার কত এবং মৃত্যুর সাম্প্রতিক জাতীয় হার; সেটার নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা সম্ভব নয়।

এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোগটি সম্পর্কে সীমিত সচেতনতা এবং অন্যান্য সংক্রমণের সঙ্গে লক্ষণের মিল। দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, নিউমোনিয়া বা সেপসিসের রোগীর ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসায় প্রত্যাশিত উন্নতি না হলে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে সংস্পর্শের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের মেলিওডোসিসের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা উচিত।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

যেভাবে ছড়ায়

এই জীবাণু সাধারণত সংক্রমিত মানুষ থেকে সুস্থ মানুষের মধ্যে সহজে ছড়ায় না। প্রধানত পরিবেশ থেকে মানুষ আক্রান্ত হয়। এ রোগ সংক্রমিত হয়—

ত্বকের মাধ্যমে: দূষিত মাটি বা পানির সংস্পর্শে ক্ষতস্থান দিয়ে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

দূষিত পানি বা মাটি থেকে: সংক্রমিত পানি পান বা দূষিত পানি ও মাটির সংস্পর্শে আসা থেকে সংক্রমণ হতে পারে।

শ্বাসের মাধ্যমে: দূষিত ধুলাবালি বা পানির ক্ষুদ্র কণা শ্বাসের সঙ্গে, বিশেষত ঝড়, বন্যা বা ভারী বৃষ্টির সময় ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে।

কার ঝুঁকি বেশি

ডায়াবেটিস মেলিওডোসিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণগুলোর একটি। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া এবং মাটির সঙ্গে নিয়মিত কাজ করার কারণে ঝুঁকি বাড়তে পারে। কৃষক, খেতমজুর, নির্মাণশ্রমিক এবং বন্যাপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকা জরুরি। তবে সুস্থ মানুষও আক্রান্ত হতে পারেন এ রোগে।

রোগের লক্ষণ

জীবাণুর সংস্পর্শে আসার সাধারণত এক থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যদিও সময়ের তারতম্য হয়। প্রধান লক্ষণগুলো হলো, দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র জ্বর ও কাঁপুনি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা ও নিউমোনিয়া, ত্বকে ফোড়া, ঘা বা পুঁজ জমা, হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা বা সংক্রমণ, যকৃৎ, প্লীহা বা অন্যান্য অঙ্গে পুঁজ জমা। গুরুতর ক্ষেত্রে রক্তে সংক্রমণ, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং একাধিক অঙ্গ বিকল হতে পারে। কখনো এর লক্ষণ যক্ষ্মা বা অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের মতো হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে রোগ নিশ্চিত করা যায় না।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

মৃত্যুঝুঁকি কতটা

মেলিওডোসিসের ভয়াবহ দিক হলো, গুরুতর সংক্রমণে মৃত্যুঝুঁকি। বিভিন্ন দেশের গবেষণায়, বিশেষ করে সেপসিসের ক্ষেত্রে, মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখা গেছে। যথাযথ চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গুরুতর রোগীদের মৃত্যুহার ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে; কিছু পরিস্থিতিতে এর চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে ১৯৬১ থেকে ২০১৭ সালের ৫১টি শনাক্ত রোগীর মধ্যে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল; এটি প্রায় ২৭ শতাংশ।

চিকিৎসা কী

মেলিওডোসিসের চিকিৎসায় দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়। সাধারণত চিকিৎসার দুটি পর্যায় থাকে। প্রথম পর্যায়ে গুরুতর সংক্রমণের জন্য শিরায় অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেওয়া হয়। রোগের তীব্রতা ও অঙ্গ আক্রান্ত হওয়ার ওপর নির্ভর করে এই পর্যায় কয়েক সপ্তাহ বা তারও বেশি চলতে পারে। দ্বিতীয় পর্যায়ে পুনরায় সংক্রমণ বা রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে সাধারণত কয়েক মাস মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। রোগের ধরন, অ্যান্টিবায়োটিকের সংবেদনশীলতা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করতে হয়।

রোগ শনাক্ত করতে রক্ত, পুঁজ, কফ বা আক্রান্ত অঙ্গের উপযুক্ত নমুনার কালচার গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহ হলে চিকিৎসক ও মাইক্রোবায়োলজি পরীক্ষাগারকে বিষয়টি জানানো জরুরি, যাতে যথাযথ পরীক্ষা, নিরাপদ নমুনা ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।

প্রতিরোধে যা করবেন

মেলিওডোসিস প্রতিরোধে এখনো অনুমোদিত কোনো বহুল ব্যবহৃত টিকা নেই। তাই পরিবেশগত সংস্পর্শ কমানোই প্রধান উপায়।

  • কৃষিকাজ বা কাদামাটির সংস্পর্শে আসার সময় জলরোধী জুতা ও গ্লাভস ব্যবহার করুন।
  • শরীরে ক্ষত থাকলে কাদা, দূষিত পানি ও মাটির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
  • নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানীয় জল ব্যবহার করুন এবং দূষিত পানি পান থেকে দূরে থাকুন।
  • বন্যা বা ভারী বৃষ্টির সময় কাদাপানিতে অপ্রয়োজনীয় চলাচল এড়িয়ে চলুন।
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের যথাযথ চিকিৎসা নিন।
  • দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, নিউমোনিয়া বা ফোড়ার সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে সংস্পর্শের ইতিহাস থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সচেতনতা কেন জরুরি

বাংলাদেশে মেলিওডোসিসের প্রকৃত সংক্রমণ ও মৃত্যুর বোঝা এখনো পুরোপুরি নিরূপিত নয়। ২০২৩ সালের একটি গবেষণা-প্রতিবেদনে দেখা যায়, সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগের পর ৯ মাসে বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে নতুন ৯ রোগী শনাক্ত হয়েছিল। এটি রোগের প্রকৃত বিস্তার সম্পর্কে আরও গবেষণা, উন্নত পরীক্ষাগার ব্যবস্থা এবং চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত