এমন কিছু দল থাকে, যারা বছরের পর বছর নিজেদের হারিয়ে খোঁজে, অথচ তাদের প্রতিভার কোনো অভাব থাকে না। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বরফশীতল আবহাওয়া থেকে উঠে আসা নরওয়ের গল্পটাও দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে ছিল ঠিক তেমনই। ২০০০ সালের ইউরোর পর থেকে বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের টিকিট না পাওয়া দলটি অবশেষে ২৮ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়ে বিশ্ব ফুটবলে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে তারা।
একসময় নরওয়ের ফুটবল মানেই ছিল কেবল শারীরিক শক্তি, দীর্ঘাকৃতির রক্ষণভাগ আর চিরাচরিত লং-বলের বৈচিত্র্যহীন খেলা। নব্বইয়ের দশকে এই কৌশলে তারা কিছুটা সাফল্য পেলেও, আধুনিক ফুটবলের গতি ও কৌশলের কাছে তা বারবার মার খেয়েছে। তবে বর্তমান কোচ স্টেল সোলবাকেনের জাদুকরি ছোঁয়ায় নরওয়ে এখন নিজেদের রক্ষণাত্মক খোলস ছেড়ে বের হয়ে এসেছে। আর এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে দেশটির ফুটবলের ‘সোনালি প্রজন্ম’, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আরলিং হালান্ড এবং আর্সেনাল মিডফিল্ডার মার্টিন ওডেগার।
বাছাইপর্বে নরওয়ের পারফরম্যান্স ছিল এককথায় রাজকীয়। আট ম্যাচের সব কটিতে জিতে শতভাগ জয়ের রেকর্ড নিয়ে তারা মূল পর্ব নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালির মতো পরাশক্তিকে ওসলোতে ৩-০ এবং মিলানের সান সিরোতে ৪-১ ব্যবধানে নাকানিচুবানি খাওয়ানো ম্যাচগুলোই প্রমাণ করে এই দলের শক্তিমত্তা ও গভীরতা কতটা ভীতিজাগানিয়া।
মাত্র ২৪ বছর বয়সী হালান্ড ইতিমধ্যেই দেশের হয়ে প্রায় সব গোলস্কোরিং রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন। ডি-বক্সের ভেতরে তাঁর অবিশ্বাস্য পজিশনিং সেন্স, গতি আর গোল করার নিখুঁত ক্ষুধা তাঁকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ও বিধ্বংসী ফিনিশারে পরিণত করেছে। মাঝমাঠে ওডেগারের ক্ষুরধার পাসিং ও খেলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দলকে জোগায় বাড়তি ভারসাম্য।
তবে নরওয়ে এখন আর শুধুই ব্যক্তিকেন্দ্রিক তারকা-নির্ভর দল নয়। স্কোয়াডে আছেন লিও অস্টিগার্ড, ক্রিস্টোফার আয়ার, আন্তোনিও নুসা, অস্কার বব, জর্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেন ও আলেক্সান্দার সরলথের মতো একঝাঁক প্রতিভাবান খেলোয়াড়, যাঁরা যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তরুণ এই দলটি এখন মানসিক দিক থেকেও অনেক বেশি পরিপক্ব, শান্ত ও কৌশলী।
বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘আই’য়ে ফ্রান্স, সেনেগাল এবং ইরাকের মতো কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে নরওয়েকে। আড়াই দশক পর বিশ্বমঞ্চে ফেরা দলগুলোর ওপর প্রত্যাশার পাহাড়সম মানসিক চাপ থাকে। কিন্তু নরওয়ের ড্রেসিংরুমের পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। তারা উত্তর আমেরিকায় যাচ্ছে কোনো বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপ ছাড়া, স্রেফ ম্যাচ বাই ম্যাচ এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়াযজ্ঞে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এই লড়াইয়ে নরওয়ে ঠিক কতটা দূর যাবে তা সময়ই বলে দেবে; তবে এবারের বিশ্বকাপে তারা যে যেকোনো পরাশক্তির স্বপ্নযাত্রায় বড় কাঁটা হতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
দল:
.gif)
.gif)































