মেক্সিকোর মন্তেরে শহরের এস্তাদিও বিবিভিএ স্টেডিয়ামে যখন রেফারির শেষ বাঁশি বাজল, তখন অবসান ঘটল সাড়ে ৪ কোটির বেশি ইরাকির প্রতীক্ষার। ৪০ বছর—সময়টা কম নয়। এই দীর্ঘ সময়ে মেসোপটেমিয়া অঞ্চল যুদ্ধ দেখেছে, সাজানো ঘরকে ধুলোয় মিশতে দেখেছে, শতশত পরিবারকে দেশান্তরী হতে দেখেছে। সব প্রতিকূলতা মাড়িয়ে ‘মেসোপটেমিয়ান সিংহ’রা আবারও ফিরেছে বিশ্বকাপে। মার্চে আন্তর্মহাদেশীয় প্লে-অফে বলিভিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে তারা শেষ করে ২১ ম্যাচের অভিযান।
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর ২০২৬-এর এই আসর হবে ইরাকের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ৪০ বছর আগে সেই বিশ্বকাপ দলের একজনকে ঢাকার ফুটবল বেশ ভালো করেই চেনে। নাম তাঁর সামির শাকির মাহমুদ। আশির দশকে ইরাকের অন্যতম সেরা এই ডিফেন্ডার ১৯৮৭ সালে আবাহনী লিমিটেডে যোগ দিয়ে গড়েন ইতিহাস। পরবর্তীকালে কোচ হিসেবে বাংলাদেশ দলকে এনে দিয়েছিলেন ১৯৯৯ এসএ গেমসের সোনা। ঢাকার মাঠের সেই চেনা সামির শাকিরদের প্রজন্মের দীর্ঘ ৪০ বছর পর আবারও সেই উত্তর আমেরিকার মাটিতে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে ইরাক।
এই রূপকথার অন্যতম নায়ক আয়মেন হুসেন। বলিভিয়ার বিপক্ষে তাঁর গোলটি শুধু জয়সূচক ছিল না, ছিল কয়েক প্রজন্মের সংগ্রামের এক জ্বলন্ত প্রতীক। ২০০৮ সালে আল-কায়েদার হামলায় বাবাকে হারানো এবং ২০১৪ সালে ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার ট্র্যাজেডি নিয়ে বড় হওয়া আয়মেনকে এখন ইরাকের জাতীয় বীর বলা যায়। ৯ বছর আগে যখন তিনি প্রথমবার ইরাককে বিশ্বকাপে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তখন হয়তো অনেকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্নই বসরার অলিগলি থেকে বাগদাদের রাজপথকে উৎসবে মাতিয়ে তুলেছে। আয়মেনের মতোই আবেগপ্রবণ ছিলেন আরেক গোলদাতা আলি আল-হামাদি। সাদ্দাম হোসেনের শাসনের সময় মাত্র এক বছর বয়সে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই তরুণ নিজ দেশের কোটি মানুষকে আনন্দে ভাসিয়েছেন।
ইরাক ফুটবলের এই নবজাগরণের নেপথ্য কারিগর অভিজ্ঞ কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড। তিনি জানতেন, এই লড়াই শুধু মাঠের ১১ জনের নয়, এটি একটি রক্তাক্ত ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা জাতির অস্তিত্ব জানান দেওয়ার লড়াই।
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইরাক তাদের তিন ম্যাচেই হেরেছিল। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে তাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ। গ্রুপ ‘আই’-তে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে আছে শক্তিশালী ফ্রান্স, সেনেগাল ও নরওয়ে। সামির শাকিরদের প্রজন্মের পর দীর্ঘ ৪০ বছরে ইরাক ফুটবল অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছে। ঘরোয়া যুদ্ধ আর রাজনৈতিক অস্থিরতা বারবার তাদের পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এবারের এই অর্জন প্রমাণ করল, ফুটবলই পারে একটি বিধ্বস্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে।
জিদান ইকবাল কিংবা আলী জাসিমদের মতো ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে পরীক্ষিত তরুণ তুর্কিরা স্রেফ অংশগ্রহণ করতে বিশ্বকাপে যাচ্ছেন না; যাচ্ছেন নতুন ইতিহাস লিখতে। ১৯৮৬ থেকে ২০২৬, এই দীর্ঘ যাত্রাপথে ইরাক হারিয়েছে অনেক কিছু, কিন্তু হারায়নি তাদের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা। স্মৃতিকে পুঁজি করে বর্তমান প্রজন্মের এই উত্থানের মাঝে লুকিয়ে আছে একটি জাতির পুনরুজ্জীবনের গল্প; যা মূর্ত হয়ে উঠবে ২০২৬ বিশ্বকাপে। এই বিশ্বকাপের পর আবারও কি কোনো এক সামির শাকিরের দেখা মিলবে ঢাকার ফুটবলে। সেই উত্তরটা সময়ের কাছে তোলা থাকল।
দল
গোলকিপার:
আহমেদ বাসিল, জালাল হাসান, কুমেল সাদি, ফাহাদ তালিব
ডিফেন্ডার:
হুসেইন আলী, মারচাস দোসকি, আকাম হাশেম, মায়থাম জাব্বার, আহমেদ মাকনজি, দারিও নামো, ফ্রান্স পুত্রোস, মুস্তাফা সাদুন, রেবিন সুলাকা, জাইদ তাহসিন, আহমেদ ইয়াহিয়া, মানাফ ইউনুস
মিডফিল্ডার:
হাসান আবদুলকারিম, আমির আল-আম্মারি, ইউসুফ আমিন, ইব্রাহিম বায়েশ, মার্কো ফারজি, পিটার গুয়ারগিস, জিদান ইকবাল, জাইদ ইসমাইল, আলী জাসিম, কারার নাবিল, ইউসেফ নাসরাওয়ে, আহমেদ কাসেম, আইমার শের, কেভিন ইয়াকোব
ফরোয়ার্ড:
মোহানাদ আলী, আয়মান হুসেইন, আলী আল-হামাদি, আলী ইউসেফ
.gif)
.gif)
































