ছয়বার ব্যর্থ হওয়ার পর সপ্তমবারের চেষ্টায় যুদ্ধে সফল হয়েছিলেন স্কটিশ রাজা রবার্ট ব্রুস। জর্ডানের চেষ্টা আরও দীর্ঘ ছিল। তবে ১১তম বারে এসে ঠিকই সফলতার মুখ দেখেছে তারা। গত বছর ৬ জুন আম্মানে ওমানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে করে প্রথমবারের মতো নিশ্চিত করে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট। যারা ফুটবল বিশ্বে ‘নাশামা’ নামেও পরিচিত।
জর্ডানের এই সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফসল। এর আগে ২০১৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে তারা সাফল্যের খুব কাছে পৌঁছেছিল। সেবার এশিয়ান প্লে-অফে উজবেকিস্তানকে হারিয়ে তারা আন্তমহাদেশীয় প্লে-অফে উরুগুয়ের মুখোমুখি হয়। তবে তারকাসমৃদ্ধ উরুগুয়ের বিপক্ষে সেই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত আর পেরে ওঠেনি তারা। সেই অভিজ্ঞতাই পরে জর্ডানের ফুটবলের ভিত্তি মজবুত করতে সহায়তা করেছে। প্রতিটি ব্যর্থতাকে জর্ডান তাদের ফুটবলীয় কাঠামোর উন্নতির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে।
সেখানে নতুন মাত্রা দিয়েছেন মরক্কান কোচ জামাল সেলামি। ২০২৩ এশিয়ান কাপে রানার্সআপ হওয়ার ঐতিহাসিক অর্জনের পর কোচ হুসেইন আম্মুতার বিদায়ে দলে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ জমেছিল। কিন্তু সেলামি সেই শূন্যতা পূরণ করেছেন অবিশ্বাস্য দক্ষতায়। ৫৫ বছর বয়সী এই কোচ নিজে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে মরক্কোর হয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন; রাজা কাসাব্লাংকা ও বেশিকতাশের হয়ে জিতেছেন একাধিক শিরোপা। কোচ হিসেবেও তাঁর ঝুলিতে আছে ২০১৮ সালের আফ্রিকান নেশনস চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা। জর্ডানের দায়িত্ব নিয়ে তিনি দলে আনলেন কঠোর শৃঙ্খলা এবং কৌশলগত নমনীয়তা। তাঁর অধীনে ১২ ম্যাচে মাত্র ২টি হার এবং ১৯টি গোল—এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় কতটা বদলে গেছে জর্ডান।
মাঠে তাঁর হাতিয়ার ছিলেন তিন তারকা—মুসা আল-তামারি, ইয়াজান আল-নাইমাত ও আলি আলওয়ান। ওমানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটিতে কোচের ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন ছিল দেখার মতো। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে সেলামি দলকে আরও আক্রমণাত্মক ফরমেশনে সাজান, যার ফলে দ্রুত গোল আদায় করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় জর্ডান।
সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে জর্ডানের সময় লেগেছে আরও এক যুগ। তবে নাশামারা হার মানেনি; প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে বারবার। এটাই জর্ডানের জাতীয় চরিত্র—বারবার ভেঙে পড়েও ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়ানোর অদম্য শক্তি আছে তাদের।
২০২৬ বিশ্বকাপে জর্ডানকে লড়তে হবে কঠিন প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে জে গ্রুপে। সান ফ্রান্সিসকোতে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর ডালাসে তারা মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। লিওনেল মেসির দলের বিপক্ষে মাঠে নামা জর্ডানের জন্য এক স্বপ্নের মুহূর্ত। তবে জর্ডানের ফুটবলারদের বর্তমান ফর্ম এবং লড়াই করার মানসিকতা জানান দিচ্ছে যে তারা কেবল অংশ নিতে নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেই বিশ্বমঞ্চে যাচ্ছে। নাশামারা জানে, অসম্ভব বলে কিছু নেই। কারণ যারা ১০ বার ব্যর্থ হয়েও ১১তম বারে ইতিহাস লিখতে পারে, তাদের আটকানো কঠিন। রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ তাই যথার্থ বলেছেন, বিশ্বকাপে এই অর্জন জর্ডানি জাতির মনোবল ও দৃঢ়সংকল্পের প্রতিচ্ছবি। নাশামাদের স্বপ্নের ওড়ান ভবিষ্যতে অনেক উদীয়মান ফুটবল শক্তির জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
.gif)
.gif)































