লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই মহাকাব্যিক রাতের পর কেটে গেছে সাড়ে তিন বছর। কাতার বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্মৃতি এখনো আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের চোখে ভাসছে টাটকা রঙের ছবির মতো। কিন্তু ফুটবল সময়কে থামিয়ে রাখতে দেয় না। দেখতে দেখতে দরজায় কড়া নাড়ছে ২০২৬ বিশ্বকাপ।
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবার যখন আর্জেন্টিনা মাঠে নামছে, তখন তাদের কাঁধে একই সঙ্গে মুকুট ধরে রাখার চাপ এবং সোনালি প্রজন্মের শেষ অধ্যায়কে অমর করে রাখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। হোর্হে সাম্পাওলির বিদায়ের পর ২০১৮ সালে যখন লিওনেল স্কালোনি ভাঙাচোরা এক দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন হয়তো খোদ বুয়েনস এইরেসের কট্টর সমর্থকও ভাবেননি, এই শান্তশিষ্ট মানুষটি আর্জেন্টিনাকে এক অপরাজেয় পরিবারে রূপান্তর করবেন।
স্কালোনির আর্জেন্টিনা দলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর ধারাবাহিকতায়। কাতার বিশ্বকাপের সেই বিশ্বজয়ী দলটির ১৭ জন এবারও বিশ্বকাপের বিমানে চেপেছেন। গত কয়েক বছরে কোপা আমেরিকার শিরোপা টানা জেতার পর লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে আধিপত্য ধরে রেখে তারা প্রমাণ করেছে, সাফল্য ক্ষুধার্ত মানসিকতাকে বিন্দুমাত্র সস্তা করে দেয়নি।
আর্জেন্টিনা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত। মাঝমাঠে আলেক্সিস মাক আলিস্তার ও এনসো ফার্নান্দেসরা এখন ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে। দলটির খেলার ধরনে দুটি রূপ স্পষ্ট—যখন মাঠে লিওনেল মেসি থাকেন, তখন পুরো খেলা আবর্তিত হয় তাঁকে কেন্দ্র করে। আর যখন তিনি থাকেন না, তখন দলটি হয়ে ওঠে আরও গতিশীল, সরাসরি ও ক্ষিপ্র। হুলিয়ান আলভারেসের মতো অক্লান্ত ফরোয়ার্ডরা মেসির হয়ে দৌড়ানোর কাজটি করার চেষ্টা করেন।
অবশ্য শুধু অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে বসে নেই আলবিসেলেস্তেরা। নাপোলির গিলিয়ানো সিমিওনে, স্ট্রাসবুর্গের বারকোদের মতো ফুটবলাররা সুযোগ পেয়েছেন দলে নতুন মাত্রা যোগ করতে। এর সঙ্গে ইতালিয়ান ক্লাব কোমোতে আলো ছড়ানো ২১ বছর বয়সী মিডফিল্ডার নিকো পাসকে নিয়ে বাড়তি কৌতূহল রয়েছে।
রক্ষণ নিয়ে স্কালোনির কিছুটা উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে; কারণ, কাতার বিশ্বকাপের পর তেমন কোনো নতুন ডিফেন্ডার নিজেকে সেভাবে প্রমাণ করতে পারেননি। ফলে ওতামেন্দি, রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেসদের মতো পুরোনোদের ওপরই ভরসা রাখতে হচ্ছে আলবিসেলেস্তেদের।
সব আলো, সব প্রার্থনা আর সব আবেগ ঘুরেফিরে স্থির হয়ে আছে সেই একটি নামেই—লিওনেল মেসি। নিজের ষষ্ঠ এবং ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে যখন তিনি মাঠে নামবেন, তখন টুর্নামেন্ট চলাকালীনই তাঁর বয়স ছুঁয়ে ফেলবে ৩৯-এর ঘর। সেই অতিমানবীয় গতি হয়তো এখন আর নেই, কিন্তু পেনাল্টি বক্সের চারপাশে তাঁর নিখুঁত দূরদর্শিতা আর জাদুকরি ফিনিশিং এখনো ফুটবল-বিশ্বের যেকোনো ডিফেন্সের জন্য সবচেয়ে বড় ত্রাস।
অভিজ্ঞতার ঘাটতি নেই, জয়ের ক্ষুধায় মরচে পড়েনি—তাই এবার শুধু আরেকটি সোনালি অধ্যায় লেখার অপেক্ষা আর্জেন্টিনার জন্য। শিরোপা জেতার চেয়ে ধরে রাখার সেই কঠিন কাজই করতে হবে তাদের।































