পর্তোপ্রাঁসে দখল নেওয়া সশস্ত্র গ্যাংস্টারদের তাণ্ডব কিংবা প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার হাহাকার—সবকিছুই যেন গত ১৮ নভেম্বর ঢাকা পড়ে গিয়েছিল এক অভূতপূর্ব উল্লাসে। রাজধানীর প্রতিটি অলিগলিতে তখন মানুষের ঢল। দীর্ঘ ৫২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে ক্যারিবীয় দেশ হাইতি। নিকারাগুয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে লে গ্রেনাডিয়ারদের এই জয় যেন কেবল ফুটবলীয় সাফল্য নয়, বরং বিপর্যস্ত এক জাতির বেঁচে থাকার নতুন সঞ্জীবনী।
বিস্ময়কর হলেও সত্য, হাইতি জাতীয় দলের এই রূপকথার প্রধান কারিগর ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়েন মিগনে আজ পর্যন্ত হাইতির মাটিতে পা রাখতে পারেননি। চরম নিরাপত্তা সংকটের কারণে মিগনেকে তাঁর পুরো রণকৌশল সাজাতে হয়েছে বিদেশের মাটিতে বসে। এমনকি পরিস্থিতির ভয়াবহতায় হাইতিকে তাদের সব ‘হোম ম্যাচ’ খেলতে হয়েছে নিরপেক্ষ ভেন্যু কুরাসাওয়ে। কিন্তু মাঠের বাইরে প্রতিকূলতা যত বেড়েছে, মাঠের ভেতরে হাইতিয়ানদের জেদও তত চওড়া হয়েছে।
গ্রুপ পর্বে কুরাসাওয়ের কাছে ৫-১ ব্যবধানে হারের বড় ধাক্কা সামলে নিয়ে তৃতীয় রাউন্ডে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। হন্ডুরাস ও কোস্টারিকার মতো অভিজ্ঞ শক্তিকে পেছনে ফেলে কনক্যাকাফ বাছাইপর্বের গ্রুপসেরা হয়েই বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে তারা।
হাইতির সাবেক সিনেটর ও প্রখ্যাত ক্রীড়া বিশ্লেষক প্যাট্রিস ডুমন্টের মতে, এটি গত দুই দশকের মধ্যে হাইতির সেরা ফুটবল দল। প্রথমবারের মতো ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে মাঠ মাতাচ্ছেন হাইতির তিন ফুটবলার। উলভারহ্যাম্পটনের জাঁ-রিকার বেলগার্ড, বার্নলির হানেস দেলক্রো এবং এজে অসেরের জসু কাসিমিরদের মতো প্রবাসে থাকা তারকাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছেন ডানলি জিন জেকস, রিকাদো আদে ও দন দিদসনদের মতো স্থানীয়রা। এমন মিশ্রণই হাইতিকে করে তুলেছে অপ্রতিরোধ্য।
ফুটবলাররা এখন দেশটির মানুষের কাছে কেবল নন, বরং হয়ে উঠেছেন শান্তির দূত। ২০০৬ সালে আইভরি কোস্টের গৃহযুদ্ধ থামাতে দিদিয়ের দ্রগবা যে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন, হাইতির ফুটবলাররাও আজ সেই পথেই হাঁটছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁরা ছড়িয়ে দিয়েছেন হ্যাশট্যাগ ‘দেশকে উন্মুক্ত করো’ (#ouvèpeyia)। তাঁদের এই স্লোগান কেবল ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের জন্য নয়, বরং এটি হাইতির মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা ফেরানো এক আকুল আবেদন। খেলোয়াড়েরা চান, বিশ্বকাপের খেলার আনন্দ তাঁরা যেন নিজ দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে নিরাপদে উদ্যাপন করতে পারেন।
যে দেশে অর্ধেকের বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে এবং প্রায় ৬০ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে, সেখানে ফুটবলই এখন একমাত্র ঐক্যের সুতো। ১৮০৩ সালের ১৮ নভেম্বর হাইতি যেমন ফরাসি উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেয়েছিল। জন্ম দেয় প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ শাসিত প্রজাতন্ত্রের সেই ১৮ নভেম্বরই বিশ্বকাপে খেলতে পারার গরিমা এনে দেয়। জুনে যখন ‘সি’ গ্রুপে ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড ও মরক্কোর বিপক্ষে লড়াইয়ে নামবে, তখন পেছনে কোনো রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা থাকবে না; থাকবে শুধু এক টুকরা সম্মান আর শান্তিতে বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। হাইতির এই উত্তরণ মনে করিয়ে দেয়—মাঠের লড়াই কখনো কখনো রাষ্ট্রের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।
দল
গোলকিপার:
জোশুয়ে দুভার্জে, আলেক্সান্দ্র পিয়েরে, জনি প্লাসিদ
ডিফেন্ডার:
রিকাদো আদি, কারলেন্স আরকুস, হানেস ডেলক্রোয়া, জঁ-কেভিন দুভের্ন, মার্টিন এক্সপেরিয়ঁস, ডিউক ল্যাক্রোয়া, উইলগুয়েন্স পোগাঁ, কেতো থেরমঁসি
মিডফিল্ডার:
কার্ল ফ্রেড সাঁতে, জঁ-রিকনার বেলেগার্দ, লেভার্তঁ পিয়েরে, দানলে জঁ-জাক, উডেনস্কি পিয়েরে, দমিনিক সিমোঁ
ফরোয়ার্ড:
জোশুয়ে কাসিমির, লুইসিয়ুস দেদসঁ, ডেরিক এত্যেন জুনিয়র, ইয়াসিন ফর্চুন, উইলসন ইসিদর, লেনি জোসেফ, দুকেন্স নাজঁ, ফ্রঁৎস্দি পিয়েরো, রুবাঁ প্রোভিদঁস
.gif)
.gif)































