মাঠের সবুজ ঘাসে আঁকা ছন্দ, আর সেই ছন্দের নাম ‘জোগা বোনিতো’। কিন্তু গত এক দশক ধরে সেই কবিতা যেন গদ্যের কর্কশ বাস্তবতায় হারিয়ে গেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে ব্রাজিলকে নিয়ে শঙ্কার দীর্ঘশ্বাস ঘনীভূত হচ্ছেই।
ফুটবল ঐতিহ্যের চূড়ায় অবস্থান করেও ব্রাজিল বর্তমানে এক গভীর গোলকধাঁধায় আটকে আছে। ২০১৪ সালে নিজেদের মাটিতে জার্মানির কাছে সেই ৭-১ গোলের হারের পর থেকে তাদের ফুটবলীয় আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ফিরতে পারেনি। এরপর প্রতিটি বিশ্বকাপে কোয়ার্টার-ফাইনাল থেকেই তাদের বিদায় নিতে হয়েছে, যা ভক্তদের জন্য এখন এক নিয়মিত কষ্টের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তাদের চিরচেনা ‘জোগা বোনিতো’ বা নান্দনিক ফুটবলের আড়ালে এখন কৌশলগত দুর্বলতা ও রক্ষণভাগের ভঙ্গুরতা অনেক বেশি স্পষ্ট।
এই সংকটময় সময়ে দলের হাল ধরেছেন ইতালিয়ান কিংবদন্তি কোচ কার্লো আনচেলত্তি। রিয়াল মাদ্রিদে বড় তারকাদের সামলানোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতে দল পরিচালনা অভিজ্ঞ আনচেলত্তি বলা যায় এখন ব্রাজিলের শেষ ভরসা। তাঁর নিয়োগ নিয়েও নাটক কম হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে চলা জল্পনা-কল্পনার পর তিনি এমন এক দলে যোগ দিয়েছেন, যা গত তিন বছরে তিনজন ভিন্ন কোচের অধীনে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচে খেলেছে। ধারাবাহিকতার অভাব ব্রাজিলের এই প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আনচেলত্তি এখন কাসেমিরো, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এনদ্রিক ও নেইমারের মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে নতুন করে সমন্বয় করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বড় সমস্যা হলো, ভিনিসিয়ুস বা আলিসনরা মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়রা ক্লাবের হয়ে যতটা ধারাবাহিক, জাতীয় দলের হয়ে তারা অনেক পিছিয়ে। আর নেইমার তো খেলেনইনি গত আড়াই বছর।
বাছাইপর্বের পথটাও ব্রাজিলের জন্য খুব একটা মসৃণ ছিল না। নতুন ফরম্যাটে বিশ্বকাপের দল সংখ্যা বৃদ্ধি না পেলে হয়তো ব্রাজিলকে অনেক আগেই প্লে-অফের শঙ্কায় পড়তে হতো। বিশ্বকাপে ‘সি’ গ্রুপে সেলেসাওদের সঙ্গী মরক্কো, হাইতি ও স্কটল্যান্ড।
দলের রক্ষণভাগ আবার আগের তুলনায় অনেকটাই নড়বড়ে। মার্কিনিওস বা গাব্রিয়েল মাগালায়েস মতো ডিফেন্ডাররা আর্সেনাল বা পিএসজিতে যতটা আস্থাশীল, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁদের সেই রূপটি যেন অনেকটাই হারিয়ে যায়। আধুনিক ফুটবলে শুধু প্রতিভা দিয়ে ম্যাচ জেতা সম্ভব নয়। যেখানে প্রতিপক্ষ দলগুলো তথ্য-উপাত্ত ও পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে খেলে, সেখানে ব্রাজিলের জন্য পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা কঠিন।
ব্রাজিল এখন এমন এক কঠিন সমীকরণের মুখে দাঁড়িয়ে যেখানে ট্রফি ছাড়া অন্য যেকোনো ফলই ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হবে। ঐতিহ্যের অহংকার ঝেড়ে ফেলে আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলাটা উত্তরণের পথ হতে পারে। পেলে–রোনালদোর উত্তরসূরিরা কি পারবেন সেই হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধারে? ১৯৯৪ সালে যে যুক্তরাষ্ট্রে তারা বিশ্বকাপ জিতেছিল, ২০২৬ সালে এসেও কি এর পুনরাবৃত্তি করতে পারবে? উত্তরটা লুকিয়ে আছে জুনের সেই দিনগুলোতে।






























