কিনশাসার মতো উৎসব খুব কম শহরই করতে জানে। ৩১ মার্চ রাতে সেখানে যা ঘটেছে, তেমন বড় উৎসব শহরটি খুব কমই দেখেছে। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর প্রতিটি প্রান্ত যেন এক হয়ে গিয়েছিল লিনগালা ভাষার সেই অতিপরিচিত প্রবাদটির সুরে—‘রাত যতই দীর্ঘ হোক, ভোর আসবেই।’
মেক্সিকোর গুয়াদালাহারায় আন্তর্মহাদেশীয় প্লে-অফের ফাইনালে জ্যামাইকাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ৫ দশকের হতাশার বোঝা নামিয়ে ফেলে ডিআর কঙ্গো। ১৯৭৪ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপে ফিরে এল নীল চিতারা।
৫২ বছর বেশ দীর্ঘ সময়। কঙ্গোর ফুটবল ভক্তদের কাছে ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপের স্মৃতিগুলো ভূতের মতো তাড়া করে ফেরে। সেই স্মৃতিগুলো কোনো আত্মার নয়, বরং সবুজ জার্সি পরা এক দলের, যাদের বুকে ছিল বিশালাকার চিতা আর নাম ছিল ‘জাইর’।
আফ্রিকার প্রথম সাব-সাহারান দেশ হিসেবে সেবার বিশ্বকাপে যাওয়ার গৌরব অর্জন করলেও, মাঠের পারফরম্যান্স দলটিকে বিশ্বজুড়ে এক হাসির খোরাক বানিয়েছিল। যুগোস্লাভিয়ার কাছে ৯ গোল হজম কিংবা ব্রাজিলের বিপক্ষে ই লুঙ্গা মোয়েপুর সেই অপ্রাসঙ্গিক ফ্রি-কিকের কাণ্ড—সব মিলিয়ে ডিআর কঙ্গোর ফুটবল পরিচয় দশকের পর দশক ধরে বিদ্রূপাত্মক মোড়কে বন্দী ছিল। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোবুতু সেসে সেকোর স্বাজাত্যবোধের কারণে ফুটবলের মানচিত্র থেকে অনেকটা হারিয়ে যেতে থাকে তারা।
কঙ্গোর এই রূপান্তরের মূল কারিগর ফরাসি মাস্টারমাইন্ড সেবাস্তিয়ান দেসাব্রে। ২০২২ সালে যখন তিনি কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন কঙ্গোর ফুটবল ছিল চরম বিশৃঙ্খলায়। আর সেখানেই মেলে ধরেন ২০২৬ বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন। যদিও অনেকের কাছে তা ছিল আকাশকুসুম কল্পনা। ঘরোয়া লিগের ওপর নির্ভর না করে কোচ ইউরোপে ছড়িয়ে থাকা কঙ্গোলিজ বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে ভেড়াতে শুরু করেন।
তাই এখন তারা কোনো চাপের মুখে ভেঙে পড়ে না। প্লে-অফ থেকে দলকে বিশ্বকাপে তোলার নায়ক এক্সেল তুয়ানজেবে। এক্সেল তুয়ানজেবে ঠিক তেমনই একজন, ইংল্যান্ডের যুব দলে খেলে বড় হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নিয়েছেন শিকড়কেই।
সেড্রিক বাকাম্বু, অ্যারন ওয়ান বিসাকা, চ্যান্সেল এমবেম্বা এবং আর্থার মাসুয়াকুদের নিয়ে গড়া বর্তমান দলটি ১৯৭৪ সালের সেই ভীতসন্ত্রস্ত দলটির চেয়ে অনেক বেশি পরিণত। ২০২৪ আফকনের সেমিফাইনালে খেলা বা জ্যামাইকার বিপক্ষে জয়—সবই এসেছে এক পরিকল্পিত ও পরিমিত প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে।
বিশ্বকাপের মূল আসরে কঙ্গোর জন্য পথ খুব একটা মসৃণ হবে না। কে গ্রুপে তাদের মোকাবিলা করতে হবে পর্তুগাল, কলম্বিয়া ও উজবেকিস্তানের। তবে ১৭ জুন হিউস্টনে পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রায় ডিআর কঙ্গোর প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হবে বিশ্বকাপে গোলের খাতা খোলা।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা আর সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাওয়া ডিআর কঙ্গোর সাধারণ মানুষের কাছে ফুটবল এখন এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টির মতো। কিনশাসার রাস্তায় যে রুম্বা আর এনডোমবোলোর সুর বেজেছে, তা শুধু জয়ের গান নয়, বরং জাতীয় সংহতি ও ফুটবলের পুনরুজ্জীবনের ধ্বনি। ইতিহাস হয়তো নিষ্ঠুর হয়, কিন্তু এবার ডিআর কঙ্গোর সামনে সুযোগ এসেছে কলঙ্ক মুছে ইতিহাসকে নতুন করে লেখার।
দল
গোলকিপার: লিওনেল এমপাসি, তিমোথি ফায়ুলু, মাতিয়্যু এপোলো
ডিফেন্ডার: শঁসেল এমবেম্বা, অ্যারন ওয়ান-বিসাকা, অেক্স তুয়ানজেবে, আর্থার মাসুয়াকু, জোরিস কায়েমবে, স্টিভ কাপুয়াদি, অ্যারন তশিবালা, ডিলান বাতুবিনসিকা, জেদিয়োঁ কালুলু।
মিডফিল্ডার: নোয়া সাদিকি, সামুয়েল মুতুসামি, এদো কায়েমবে, নাঙ্গালায়েল মুকাউ, শার্ল পিকেল, নাথানায়েল এমবুকু, ব্রিয়ান সিপেঙ্গা, মেশাক এলিয়া, গায়েল কাকুতা।
ফরোয়ার্ড: থিও বোঙ্গোন্ডা, ফিস্টন মায়েলে, সেদ্রিক বাকাম্বু, সিমন বানজা, ইয়োআনে উইসা।
.gif)
.gif)































