আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলরাশির বুক চিরে জেগে ওঠা ১০টি আগ্নেয় দ্বীপের সমষ্টি কেপভার্দে। মাত্র সোয়া পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটি এবার বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে লিখেছে অকল্পনীয় রূপকথা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের টিকিট কেটে তারা যেন দেখিয়ে দিল, ফুটবল কখনো কখনো সীমানাকেও ছাড়িয়ে যায়। কোনো জনসংখ্যাই ক্ষুদ্র নয়, যদি থাকে অদম্য স্বপ্ন। তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে নাম লিখিয়েছে তারা, এমন সাফল্যকে দেশটির রাষ্ট্রপতি তুলনা করেছেন ‘এক নতুন স্বাধীনতা’ হিসেবে।
একসময় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৮২তম অবস্থানে থাকা দলটি ৭০-এর ঘরে জায়গা করে নিয়েছে, যা তাদের ধারাবাহিক উন্নতির অকাট্য প্রমাণ। কেপভার্দের এই উত্থান কোনো আকস্মিক জাদুর কাঠি নয়, বরং এটি দীর্ঘ কয়েক দশকের এক পরিকল্পিত স্বপ্নের ফসল। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পর্তুগালের উপনিবেশ থাকা এই দেশটির নিজস্ব কোনো ফুটবল শক্তি ছিল না। কিন্তু কয়েক বছরে তারা প্রবাসীদের (যাদের ভালোবেসে ডাকা হয় ‘১১তম দ্বীপ’) এক সুতোয় গেঁথেছে। বর্তমান জাতীয় দলের প্রায় ৬০ শতাংশ খেলোয়াড় পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও আয়ারল্যান্ডের মতো উন্নত ফুটবল পরিকাঠামোয় বেড়ে উঠেছেন।
শামরক রোভার্সের ডিফেন্ডার রবার্তো লোপেসের কথাই ধরা যাক, যাঁকে লিংকডইনে একটি মেসেজের মাধ্যমে জাতীয় দলে খেলার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই অজানা মেসেজ থেকে আজ তিনি হয়ে উঠেছেন দেশের স্বপ্নযাত্রার নায়ক।
মাঠের এই লড়াইয়ের নেপথ্য কারিগর কোচ বুবিস্তা। সাবেক অধিনায়ক ও ডিফেন্ডার হিসেবে তিনি এই দলটিকে কাউন্টার অ্যাটাকিংয়ে বানিয়েছেন হিংস্র। পুরো বাছাইপর্বে নিজেদের মাঠে একটি গোলও হজম না করার রেকর্ডটি তাঁদের ‘ডিফেনসিভ সলিডারিটি’র পরিচয় দেয়। দলের সংহতি বাড়াতে তিনি ড্রেসিংরুমে স্থানীয় ভাষা ‘ক্রিওলো’ বলা বাধ্যতামূলক করেছেন, যা ইউরোপের নানা শহর থেকে আসা খেলোয়াড়দের মধ্যে এক অদ্ভুত জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলেছে। বাছাইপর্বে ক্যামেরুন এবং অ্যাঙ্গোলার মতো আফ্রিকান পরাশক্তিদের পেছনে ফেলে অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করা মোটেও সহজ ছিল না। বিশেষ করে নিজেদের মাঠে একটি গোলও হজম না করার রেকর্ডটিই বলে দেয় তাঁদের জমাট রক্ষণের কথা।
নভেম্বরে বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে এসওয়াতিনিকে ৩-০ গোলে হারানোর পর রাজধানী প্রাইয়ার রাজপথে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল দেখার মতো। মাঝরাতের আতশবাজি আর ক্রিওলো গানের সুরে যখন প্রবীণ থেকে তরুণ—সবাই মেতে উঠেছিল, তখন বোঝা যাচ্ছিল এই জয় কেবল ১১ জন ফুটবলারের নয়, বরং বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি কেপভার্দিয়ানের। ডেইলন লিভরামেন্তোর মতো তরুণেরা যখন মাঠের ঘাসে লুটিয়ে পড়ে কাঁদছিলেন, তখন তাঁরা আসলে তাঁদের পূর্বপুরুষদের সেই কঠোর পরিশ্রমেরই প্রতিদান দিচ্ছিলেন।
২০২৬ বিশ্বকাপে কেপভার্দের গ্রুপে রয়েছে স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের মতো অভিজ্ঞ দল। এই বড় মঞ্চে তাদের চ্যালেঞ্জটা অনেক কঠিন। তবে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র কীভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিভাকে দেশীয় আবেগের সঙ্গে একীভূত করে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছাতে পারে, কেপভার্দে সেই আধুনিক স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টের উদাহরণ। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে আটলান্টিকের ঢেউয়ের মতোই সব বাধা পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।
দল
গোলকিপার: ভোজিনিয়া, মার্সিও হোজা ও সিজে দুজ সান্তুজ।
.gif)
.gif)































