কাতার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় মরক্কোর জমাট রক্ষণভাগের সামনে যখন স্পেনের ‘টিকি-টাকা’ ফুটবল মুখ থুবড়ে পড়েছিল, তখন অনেকেরই মনে হয়েছিল স্প্যানিশ ফুটবলের সোনালি দিন হয়তো শেষ। বল দখলের একঘেয়ে জাল বুনেও গোল না পাওয়ার সেই আক্ষেপ লা রোহা সমর্থকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। তবে ফুটবলবিধাতা স্পেনের জন্য একদম ভিন্ন এক বসন্তের চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের হাত ধরে ইউরোর জয় এবং নেশনস লিগের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর স্পেন এখন আবারও বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসন পুনরুদ্ধারের দাবিদার। ২০২৬ বিশ্বকাপে এক আধুনিক ও গতিময় ফুটবলের নতুন মশাল হাতে নিয়ে যাচ্ছে তারা।
স্প্যানিশ ফুটবলের চিরাচরিত দর্শন ছিল বলের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। বর্তমান কোচ দে লা ফুয়েন্তে এই দর্শনে পরিবর্তন এনেছেন। পজেশনভিত্তিক ফুটবলের সৌন্দর্য বজায় রেখেই তিনি দলে যোগ করেছেন অবিশ্বাস্য গতি আর ক্ষিপ্রতা। মাঝমাঠে দীর্ঘক্ষণ বল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করার চেয়ে তাঁর দল এখন উইং ব্যবহার করে দ্রুত আক্রমণে উঠতে ভালোবাসে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘কাউন্টার-প্রেসিং’, যা প্রতিপক্ষকে গুছিয়ে ওঠার কোনো সুযোগই দেয় না। উয়েফা বাছাইপর্বে ৬ ম্যাচের ৫টিতে জয় এবং মাত্র ২ গোল হজম করে ২১ গোল দেওয়ার পরিসংখ্যানই বলে দেয়, এই নতুন স্পেন কতটা ধারালো এবং নিখুঁত।
এই বদলে যাওয়ার নেপথ্য কারিগর দে লা ফুয়েন্তে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে যখন অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২১ দলের এই সফল কোচকে মূল দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন অনেকেই ভ্রু কুঁচকেছিলেন।
বার্সেলোনার বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল মাত্র ১৬ বছর বয়সে জাতীয় দলে অভিষিক্ত হয়ে আজ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হয়েছেন। ডান প্রান্তে তাঁর চোখধাঁধানো ড্রিবলিং আর নিখুঁত ক্রস প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য এক আতঙ্ক। ইয়ামালের পাশাপাশি বাঁ প্রান্তে নিকো উইলিয়ামসের গতি, মাঝমাঠে পেদ্রি এবং রক্ষণভাগে পাউ কুবারসির মতো তরুণদের পরিপক্বতা স্পেনকে অপ্রতিরোধ্য রূপ দিয়েছে।
মূল খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতিতেও বাছাইপর্বে স্পেনের রিজার্ভ বেঞ্চের গভীরতা ছিল দেখার মতো, যা একটি সম্ভাব্য বিশ্বজয়ী দলের অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
২০১০ সালে জাভি-ইনিয়েস্তাদের সেই সোনালি প্রজন্ম দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে স্পেনকে প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিল। এরপর ২০১৪ সালের গ্রুপপর্বের বিপর্যয় কিংবা ২০১৮ ও ২০২২-এর শেষ ষোলোর ট্র্যাজেডি—স্পেনভক্তদের বারবার হতাশ করেছে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। গ্রুপপর্বে কেপভার্দে, সৌদি আরব এবং লাতিন আমেরিকান পরাশক্তি উরুগুয়ের মতো দলগুলোর মুখোমুখি হতে হবে স্প্যানিশদের। অতীতের আক্ষেপ ভুলে, তারুণ্যের অফুরন্ত শক্তি আর দে লা ফুয়েন্তের নিখুঁত মগজাস্ত্রে ভর করে স্পেন এবার তাদের জার্সিতে দ্বিতীয় তারকা যোগ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। লা রোহাদের এই নতুন রূপ কতটা সফল হয়, ফুটবল বিশ্ব এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায়।






























