বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ইতিহাসে একটি প্রবাদ আছে—‘যখন জেনিকায় গর্জন ওঠে, তখন বিশ্ব থমকে দাঁড়ায়’। ২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে সেই গর্জনের প্রতিধ্বনি এবার বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে দর্শক বানিয়ে দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার ইতি টেনে বসনিয়া ঘোষণা দিল নতুন ফুটবল বসন্তের।
মার্চে বাছাইপর্বে প্লে-অফের রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটি শেষ হওয়ার পরপরই রাজধানী সারায়েভোর রাজপথ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বসন্তের কনকনে ঠান্ডা আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির দুশ্চিন্তা ভুলে মানুষ সমবেত হয় ভিয়েচনা ভাত্রায় (চিরন্তন শিখার পাদদেশে)। প্রতিটি অলিগলিতে মানুষের ঢল নামে। ভক্তদের কণ্ঠে ধ্বনিত সেই গান—‘আমি বসনিয়া থেকে এসেছি, আমাকে আমেরিকায় নিয়ে চলো’। আজ আর তা কেবল প্রার্থনা নয়, বরং বাস্তবতা। এই আবেগ শুধু ফুটবলের জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক অচলাবস্থায় স্থবির হয়ে থাকা একটি জাতির দীর্ঘশ্বাস। সাধারণ মানুষ এই জয়কে দেখছে এক নতুন আশার আলো হিসেবে, যা তাদের দৈনন্দিন গ্লানি ভুলিয়ে দিয়েছে।
২০১৪ সালে বসনিয়াকে প্রথম বিশ্বকাপে নিয়ে গিয়েছিলেন সাফেক সুসিচ। এবার সেই একই কৃতিত্ব দেখালেন সের্গেজ বারবারেজ। বড় কোনো কোচিং অভিজ্ঞতা ছাড়াই দায়িত্ব নেওয়া বারবারেজ তাঁর ৪-৪-২ ফরমেশনে অভিজ্ঞ ও তরুণের যে মিশেল ঘটিয়েছেন, তা ছিল দেখার মতো। জেকোর সঙ্গে মাঠ কাঁপিয়েছেন এসমির বাজরাক্তারেভিচ ও কেরিম আলাজবেগোভিচের মতো তরুণেরা। বিশেষ করে মাঠের কৌশলী দাবার চালে তিনি টেক্কা দিয়েছেন ইতালির মতো পরাশক্তিকে। এর আগে বাছাইপর্বের গ্রুপ ‘এইচ’-এ ৮ ম্যাচে ১৭ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় হওয়া এবং প্লে-অফে হারিয়েছেন ওয়েলসকে। নামীদামি বিদেশি কোচের চেয়ে কখনো কখনো মাটির টান ও দেশীয় মেধা বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে, সেটাই যেন মনে করিয়ে দিলেন বারবারেজ।
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে বসনিয়াকে চিনেছিল বিশ্ব। পিয়ানিচ, বেগোভিচ আর জেকোর সেই দলকে বলা হতো ‘সোনালি প্রজন্ম’। কিন্তু সময় বদলেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের বসনিয়া দলে এখন নতুন প্রাণের স্পন্দন। বিশেষ করে প্রবাসী বসনিয়ান প্রতিভারা, যাঁরা ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ লিগে খেলছেন, তাঁরা দেশের ডাকে ফিরে এসেছেন। দুই বিশ্বকাপের মাঝে সেতু হয়ে আছেন এডিন জেকো। ৪০ বছর বয়সেও পারফরম্যান্স করে যাচ্ছেন সমানতালে। বাছাইপর্বে একাই করেছেন ৬ গোল। ওয়েলসের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের হেডারটা তাঁর মাথা থেকেই এসেছিল।
২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে বসনিয়ার সামনে এখন কঠিন সমীকরণ। ১২ জুন টরন্টোতে স্বাগতিক কানাডার বিপক্ষে শুরু হবে তাদের মূল লড়াই। এরপর ১৮ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে সুইজারল্যান্ড এবং ২৪ জুন সিয়াটলে কাতারের মুখোমুখি হবে ড্রাগনরা। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে বসনিয়া তিনটি ম্যাচ খেলে দেশে ফিরেছিল। সেবারও ছিল রোমাঞ্চের প্রত্যাশা। কিন্তু আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়ার বিপক্ষে হেরে স্বপ্ন শেষ হয়েছিল গ্রুপপর্বেই। ইরানকে হারিয়ে বিশ্বকাপে জয়ের স্বাদ অবশ্য পেয়েছে। এবার দলটা আলাদা, প্রজন্ম বদলেছে। ইতালিকে হারিয়ে পাওয়া আত্মবিশ্বাস সহজে যায় না।
তবু ফুটবল নিষ্ঠুর। জেনিকার সেই রাতের আনন্দ আর বিশ্বকাপের বাস্তবতা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা। বসনিয়া এখন এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে। স্বপ্ন আছে, সামর্থ্য আছে। শুধু দেখার অপেক্ষা সেই স্বপ্ন কত দূর যায়।
দল
গোলকিপার: ওসমান হাদজিকিচ, নিকোলা ভাসিল্ই ও মার্টিন জ্লোমিসলিচ।
ডিফেন্ডার: নিদাল চেলিক, আমার দেদিচ, ডেনিস হাদজিকাদুনিচ, নিকোলা কাটিচ, সেয়াদ কোলাশিনাৎস, তারিক মুহারেমোভিচ, নিহাদ মুইয়াকিচ ও স্তিয়েপান রাদেলইচ।
মিডফিল্ডার: কেরিম আলাইবেগোভিচ, এসমির বাইরাকতারেভিচ, ইভান বাশিচ, জেনিস বুর্নিচ, আরমিন গিগোভিচ, আমির হাদজিয়াহমেতোভিচ, এরমিন মাহমিচ, আমার মেমিচ, ইভান সুনইচ ও বেঞ্জামিন তাহিরোভিচ।
ফরোয়ার্ড: সামেদ বাজার, এরমেদিন দেমিরোভিচ, এডিন জেকো, ইয়োভো লুকিচ ও হারিস তাবাকোভিচ।
.gif)
.gif)
































