লিওনেল মেসি: সময়কে হার মানানো এক নাম
লাতিন স্কিল আছে তাঁর মধ্যে। আছে ঘাম ঝরিয়ে মাঠ চষে খেলার মানসিকতাও। খুঁজলে অনেক ফুটবলারের মধ্যেও পাওয়া যাবে তা। কিন্তু লিওনেল মেসি সবার চেয়ে আলাদা হয়ে উঠেছেন তাঁর সাফল্যক্ষুধা আর সৃজনশীলতা দিয়ে। আর এতটাই আলাদা যে তিনি হয়ে উঠেছেন সমসাময়িক ফুটবলের প্রতীকও।
মাঠে বল পায়ে তাঁর চলাফেরা, মুহূর্তের সিদ্ধান্ত, অসম্ভবকে সহজ করে তোলার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তিনি যেন আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিস্ময়। এই জুনেই আটত্রিশ ছাড়িয়ে উনচল্লিশে পা রাখবেন। কিন্তু এই বয়সেও কী তাঁর প্রাণশক্তি!
এই বয়সেও মেসি নিজেকে রাঙিয়ে চলেছেন, নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে নতুন করে তুলে ধরছেন। উদ্যম কিংবা পরিশ্রম আগের মতোই আছে, অভিজ্ঞতা যোগ হওয়ায় তিনি আরও পরিশীলিত, প্রতিপক্ষের জন্য আরও ভয়ঙ্কর।
ফুটবলার হিসেবে গ্রেটনেসের জন্যই বিশ্ব ফুটবলে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। কারণ, মেসি শুধু গোল করেন না; তিনি পুরো ম্যাচের ছন্দ বদলে দেন। কখনো নিখুঁত পাসে, কখনো ড্রিবলিংয়ে, কখনো আবার এমন এক ফিনিশিংয়ে, যা দেখে প্রতিপক্ষেরও করতালি দিতে ইচ্ছে করে। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি তাই শুধু একজন খেলোয়াড় নন, বরং এক অনুভূতির নাম।
ক্লাব ফুটবলে তাঁর পথচলাও ঈর্ষণীয়। বার্সেলোনার হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অসংখ্য শিরোপা জিতে নিজেকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছেন। এরপর পিএসজিতে নতুন অধ্যায়, অতঃপর ক্যারিয়ার সায়াহ্নে মেজর লিগ সকারের দল ইন্টার মায়ামিকে বেছে নেওয়া। সবখানেই নিজেকে চিনিয়েছেন মেসি। কি ইউরোপ, কি আমেরিকা—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ফুটবলকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
তবে মেসির সবচেয়ে আবেগঘন গল্পটা লেখা হয়েছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে। বহু সমালোচনা, হতাশা আর অপেক্ষার পর তিনি দেশের হয়ে প্রথম বড় শিরোপা জেতেন। তারপর যেন খুলে যায় সাফল্যের দুয়ার। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা পায় তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। সেই ট্রফি হাতে মেসির হাসি যেন কোটি ভক্তের স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত হয়ে আছে এখনো।
ফুটবলের বহু কিংবদন্তিও মেসিকে দেখেন বিস্ময়ের চোখে। কেউ তাঁকে ‘ভিনগ্রহের ফুটবলার’ বলেছেন, কেউ আবার দাবি করেছেন—মেসিকে থামাতে সাধারণ কৌশল যথেষ্ট নয়। কারণ, তিনি এমন একজন খেলোয়াড়, যাঁকে বোঝার আগেই ম্যাচের চিত্র বদলে যায়।
পরিসংখ্যানও মেসির শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষী। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা, সবচেয়ে বেশি মিনিট মাঠে থাকা, সবচেয়ে বেশি ম্যাচে নেতৃত্ব দেওয়া কিংবা গোল ও অ্যাসিস্টে অনন্য অবদান—সবখানেই আছে তাঁর ছাপ। ব্যক্তিগত পুরস্কারের তালিকাও দীর্ঘ; বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পেয়েছেন একাধিকবার।
এবারের বিশ্বকাপেও শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন দেখছে আর্জেন্টিনা। আর আর্জেন্টাইনদের স্বপ্ন-সওয়ার লিওনেল মেসি। তাঁর অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীল খেলা বরাবরের মতো এবারও আর্জেন্টিনা দলের বড় শক্তি। মেসি মাঠে থাকলে অসম্ভব শব্দটা যেন একটু হলেও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এটাই মেসির শেষ বিশ্বকাপ যাত্রা। শেষ তাঁর রঙিন হবে এটাই আশা। তা না হলেও ফুটবল ইতিহাসে তাঁর নাম যে চিরকাল আলো ছড়াবে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। মেসি শুধু চ্যাম্পিয়ন এক ফুটবলারই নন, পুরো একটি প্রজন্মকে আলোড়িত করা এক ‘আইকন’ও।
.gif)
.gif)





