Ajker Patrika

ইউপি নির্বাচনে এসএসসি-এইচএসসি সনদ বাধ্যতামূলক হয়েছে দাবিটি ভুয়া

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৭: ৫৫
ইউপি নির্বাচনে এসএসসি-এইচএসসি সনদ বাধ্যতামূলক হয়েছে দাবিটি ভুয়া
ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রচারিত পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

‘চেয়ারম্যান পদে এইচএসসি এবং মেম্বার পদে এসএসসি সনদের মূল কপি ছাড়া মনোনয়নপত্র বাতিল করা হবে’—এমন একটি দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

নির্বাচন কমিশন সচিবের বরাতে প্রচারিত এই দাবিটি ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ’ শিরোনামে জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর একটি পেপার কাটিংও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দাবিটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করছে।

আলোচিত দাবিতে কয়েকটি পোস্ট আছে এখানে, এখানে, এখানে , এখানে এখানে, এখানে এবং এখানে

‘Md Mohiuddin’ নামের একটি ফেসবুক পেজে গত ২৮ জুলাই আলোচিত দাবিতে একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়। শেয়ার করা ওই পোস্টে ৩১ জুলাই দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার রিয়েকশন, ৩৪৭ কমেন্ট ও ৩৩৮ শেয়ার রয়েছে।

আলোচিত দাবিতে শেয়ার করা এসব পোস্ট, ফটোকার্ড ও পেপার কাটিং-এর কমেন্ট পর্যালোচনা করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। অধিকাংশ ব্যবহাকারী এমন দাবিকে সাধুবাদ জানালেও অনেকেই এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ইউপি নির্বাচনের প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ছড়ানো পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট
ইউপি নির্বাচনের প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ছড়ানো পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

প্রচারিত পোস্ট ও ফটোকার্ডের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড দিয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার কোনো গণমাধ্যমে এমন কোনো প্রতিবেদন কিংবা তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও চেয়ারম্যান বা মেম্বার পদে প্রার্থিতার জন্য এমন কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের তথ্য বা প্রজ্ঞাপন পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া ২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন পর্যালোচনায়ও আলোচিত দাবির কোনো ভিত্তি মেলেনি। আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়নি। অর্থাৎ, শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও আইনগতভাবে একজন ব্যক্তি ইউপি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে পারেন।

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন। ছবি: স্ক্রিনশট
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন। ছবি: স্ক্রিনশট

পরে ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ’ শিরোনামে প্রচারিত জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন–এর পেপার কাটিংটি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে ডিজাইন, ফন্ট, নিউজের মধ্যে স্পেস, বানান এবং হিন্দি লেখা-সহ একাধিক অসঙ্গতি দেখা যায়।

এ ছাড়া পেপার কাটিংটিতে প্রকাশের তারিখ ১৯ মে, ২০২৬ উল্লেখ থাকায় ওই তারিখ ধরে অনুসন্ধান চালানো হয়। তবে বাংলাদেশ প্রতিদিন–এর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট কিংবা প্রিন্ট সংস্করণে এমন কোনো প্রতিবেদন বা তথ্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। উপরন্তু প্রচারিত পেপার কাটিংটির সঙ্গে পত্রিকার প্রকৃত প্রকাশনার অমিল পাওয়া যায়।

কম্পেরিজন। ছবি: স্ক্রিনশট
কম্পেরিজন। ছবি: স্ক্রিনশট

বিষয়টি আরও যাচাই করতে এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম ‘ডিপফেক-ও-মিটার’–এর সহায়তা নেওয়া হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রচারিত ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯৫ শতাংশ।

হঠাৎ এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২২ জুলাই ‘ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিতে নির্দেশ কেন নয়’ শিরোনামে জাতীয দৈনিক প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন পাওযা যায়। ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা (অন্তত স্নাতক) নির্ধারণের নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবীর করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত এই রুল দেন এবং স্থানীয় সরকারসচিব, আইনসচিব ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেন।

রিটকারীদের দাবি, ২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন–এর ২৬ ধারায় ইউপি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতার জন্য কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়নি। অথচ গ্রাম আদালত আইনের অধীনে একজন ইউপি চেয়ারম্যান বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন এবং জরিমানা আরোপসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের মতে, এ ধরনের দায়িত্ব পালনের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। তাই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাকে সংবিধান ও গ্রাম আদালত আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দাবি করে তা সংশোধনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

হাইকোর্টের রুল ও নির্বাচন কমিশনের মন্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
হাইকোর্টের রুল ও নির্বাচন কমিশনের মন্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তিনি জানান, হাইকোর্টের রুলটি পর্যালোচনা করার পর বিদ্যমান আইন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর আইন এবং এ–সংক্রান্ত আদালতের আগের রায় বা নির্দেশনা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সিদ্ধান্ত

হাইকোর্টের রুল জারি হওয়ার ঘটনাকে ভিত্তি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত দাবিটি ছড়ানো হয়েছে। বর্তমানে কার্যকর আইনে ইউপি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য এইচএসসি কিংবা স্নাতক পাস বাধ্যতামূলক নয়। একইভাবে ইউপি সদস্য (মেম্বার) পদে এসএসসি সনদের মূল কপি জমা না দিলে মনোনয়নপত্র বাতিল হবে, এমন কোনো বিধানও নেই। ফলে নির্বাচন কমিশনের সচিবের বরাতে প্রচারিত দাবি এবং বাংলাদেশ প্রতিদিন–এর নামে ছড়ানো পেপার কাটিংটি ভুয়া।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত