Ajker Patrika

ফ্যাক্টচেক /লোডশেডিং নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
লোডশেডিং নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি
লোডশেডিং নিয়ে বিভিন্ন জনের মন্তব্য দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট

একদিকে জ্বালানি সংকট, গত কয়েক দিন তীব্র গরম, সেই সঙ্গে লোডশেডিং মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। দিনে-রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তব সংকট এখন নতুন এক সামাজিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিদিনের রুটিনই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে।

আর এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে একের পর এক ভুয়া তথ্য, কাল্পনিক উদ্ধৃতি কিংবা বিকৃত ফটোকার্ড। এমন সংকটে মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা এসব কনটেন্টে ব্যবহার করা হচ্ছে জনপরিসরে পরিচিত ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নাম ও ছবি। কখনো রাজনীতিবিদ, কখনো সরকারি কর্মকর্তা, আবার কখনো জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব—সবার নাম ও ছবি ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে মনগড়া মন্তব্য কিংবা প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আগের কোনো মন্তব্য কিংবা ভিডিও। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা অনেক সময় সত্য ভেবে এসব পোস্ট শেয়ার করছেন, আর তা ভাইরাল হয়ে বিভ্রান্তি আরও বাড়াচ্ছে।

বেশিরভাগ সময় এই ধরনের কনটেন্টে সাধারণত কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র, তারিখ বা প্রেক্ষাপট উল্লেখ থাকে না। তবুও আকর্ষণীয় শিরোনাম কিংবা আবেগী ভাষার কারণে এগুলো সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে এবং মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে।

উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের নামে ভুয়া ফটোকার্ড

লোডশেডিং নিয়ে জাহেদ উর রহমানের নামে প্রচারিত ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট
লোডশেডিং নিয়ে জাহেদ উর রহমানের নামে প্রচারিত ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট

সাম্প্রতি ‘প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের পলিসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান’-এর নামে একটি ফটোকার্ড ছড়ানো হয়। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি মন্তব্য করেছেন—‘এই সামান্য লোডশেডিংয়ে যদি এতই সমস্যা হয়, তাহলে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করুন, কারেন্ট বিলও দিতে হবে না।’

তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, জাহেদ উর রহমান এমন কোনো মন্তব্য করেননি। তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, গণমাধ্যম কিংবা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রেও এ ধরনের বক্তব্যের প্রমাণ মেলেনি। বরং কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই উক্ত মন্তব্যটি তাঁর নামে প্রচার করা হয়েছে।

মারজুক রাসেলের নামে ছড়ানো উক্তিটি বানোয়াট

লোডশেডিং ইস্যুতে মারজুক রাসেলর নামে প্রচারিত ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট
লোডশেডিং ইস্যুতে মারজুক রাসেলর নামে প্রচারিত ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট

একইভাবে লোডশেডিং নিয়ে আরেকটি আলোচিত দাবি ছড়িয়েছে জনপ্রিয় কবি, গীতিকার ও অভিনেতা মারজুক রাসেলের নামে। ফেসবুকে প্রচার করা হয়েছে—‘কারেন্ট দে হারামজাদা, নইলে খাম্বা চিবিয়ে খাবো’ —এমন মন্তব্য করেছেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মারজুক রাসেল এমন কোনো মন্তব্য করেননি। তাঁর কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট বা গণমাধ্যম সূত্রেও এ ধরনের বক্তব্যের অস্তিত্ব নেই। ফলে এটি একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ‘পদত্যাগ’ চ্যালেঞ্জের নেপথ্যে সার্কাজম

লোডশেডিং থাকলে পদত্যাগ করবেন দাবিতে মন্ত্রীর নামে প্রচারিত ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট
লোডশেডিং থাকলে পদত্যাগ করবেন দাবিতে মন্ত্রীর নামে প্রচারিত ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নামেও একটি ফটোকার্ড ছড়ানো হয়, যেখানে দাবি করা হয়—‘দেশে লোডশেডিং আছে প্রমাণ করতে পারলে মন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেব।’

তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি। ফটোকার্ডটির উৎস বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি একটি স্যাটায়ার পেজ থেকে প্রথম ছড়ানো হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে প্রচার করা হয়।

গিয়াসউদ্দিন তাহেরীর নামে চ্যানেল ২৪-এর নকল ফটোকার্ড

‘শেখ হাসিনার সাজানো বাংলাদেশ এখন লোডশেডিংয়ে অন্ধকার হয়ে গেছে’— তাহেরীর নামে প্রচারিত ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট
‘শেখ হাসিনার সাজানো বাংলাদেশ এখন লোডশেডিংয়ে অন্ধকার হয়ে গেছে’— তাহেরীর নামে প্রচারিত ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট

ইসলামি বক্তা গিয়াসউদ্দিন তাহেরীর নামেও একটি ফটোকার্ড ছড়িয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়—তিনি বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার সাজানো বাংলাদেশ এখন লোডশেডিংয়ে অন্ধকার হয়ে গেছে।’

তবে ফটোকার্ডটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এতে ব্যবহৃত ডিজাইন ও লোগো চ্যানেল ২৪-এর আদলে তৈরি হলেও লোগোতে ‘Sujon 424’ লেখা রয়েছে এবং কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র বা তারিখ উল্লেখ নেই। চ্যানেল ২৪-এর ভেরিফায়েড পেজ ও ওয়েবসাইটেও এমন কোনো সংবাদ বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরবর্তীতে গিয়াসউদ্দিন তাহেরীর ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট ও অন্যান্য গণমাধ্যমেও অনুসন্ধান করে এ ধরনের বক্তব্যের কোনো প্রমাণ মেলেনি। বরং একটি স্যাটায়ারধর্মী ফেসবুক পেজ থেকে প্রথম এই দাবি ছড়ানো হয়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন পেজে প্রচারিত হয়।

পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সংকটের মতো সংবেদনশীল ইস্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পরিকল্পিত গুজবচক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা বাস্তব সমস্যাকে কাজে লাগিয়ে পরিচিত ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে চটকদার ও উত্তেজনাপূর্ণ ফটোকার্ড তৈরি করছে। এসব কনটেন্টে কোনো সূত্র, প্রেক্ষাপট বা প্রমাণ না থাকলেও দ্রুত ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে, কারণ অনেক ব্যবহারকারী না জেনেই এগুলো শেয়ার করছেন। ফলে একটি বাস্তব সংকটকে ঘিরে জনমনে বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে।

সিদ্ধান্ত

সুতরাং, লোডশেডিং ও দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে প্রচারিত এসব মন্তব্য কোনো সত্য তথ্যের ভিত্তিতে নয়। এগুলো মূলত ভুয়া, বিকৃত ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট থেকে তৈরি করে বিভ্রান্তিকরভাবে ছড়ানো হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নিউমার্কেট এলাকায় গুলিতে নিহত ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের সহযোগী টিটন

‘বছিলা গরুর হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলালের সঙ্গে বিরোধ ছিল টিটনের’

অনিয়ম ও নীতিমালা লঙ্ঘনে অভিযুক্ত ২৩১১ সার ডিলার: কৃষিমন্ত্রী

শাহজালাল বিমানবন্দর: তৃতীয় টার্মিনাল চালুর সময় আরও পেছাল

আমিরাতের ‘ওপেক’ ত্যাগ একটি বড় ঘটনা: বিবিসি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত