Ajker Patrika

ফ্যাক্টচেক /চট্টগ্রামে শনাক্ত ৪৬৮ এইডস রোগীর ৩৭৪ জনই মাদ্রাসাশিক্ষার্থী—দাবিটি ভুয়া

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০: ০৪
চট্টগ্রামে শনাক্ত ৪৬৮ এইডস রোগীর ৩৭৪ জনই মাদ্রাসাশিক্ষার্থী—দাবিটি ভুয়া
চট্টগ্রামে ৪৬৮ এইডস রোগীর ৩৭৪ জনই মাদ্রাসাশিক্ষার্থী দাবিতে ছড়ানো ফটোকার্ড। ছবি: স্ক্রিনশট

চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন শনাক্ত ৪৬৮ এইচআইভি রোগীর মধ্যে ৩৭৪ জনই মাদ্রাসাশিক্ষার্থী—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে।

মহিউদ্দিন মোহাম্মদ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে আলোচিত দাবিতে গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) একটি ফটোকার্ড শেয়ার করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হয়, এ বিষয়ে গণসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সেদিন একজন সংসদ সদস্য লাইভ টক শোতে জানিয়েছেন, তাঁর জেলা (নওগাঁ) সিভিল সার্জন কর্তৃক দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এইচআইভি রোগীদের প্রায় সবাই মাদ্রাসাশিক্ষার্থী।

শেয়ার করা ফটোকার্ডটিতে আজ বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টা পর্যন্ত ২৪ হাজার ৪০০টি রিঅ্যাকশন, ৩ হাজারটি কমেন্ট ও ২ হাজার বার ৫০০ শেয়ার রয়েছে। এ ছাড়া আরও কিছু (, , , ) অ্যাকাউন্ট থেকেও একই দাবিতে ফটোকার্ডটি শেয়ার করা হয়।

পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যবহারকারী দাবিটিকে সত্য বলে মনে করেছেন। পোস্টের কমেন্টে একজন বলেন, ‘যেমন কর্ম তেমন ফল।’ আরও একজন বলেন, ‘এহন কিছু বললেই বলবে হাজী সাহেবের মুখ ভালো না।’ একজন আবার বলেন, ‘সর্ষের মধ্যে ভূত।’

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

প্রচারিত দাবির বিষয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় কোনো গণমাধ্যমে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে অনুসন্ধানে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ‘চট্টগ্রামে দিন দিন বাড়ছে এইচআইভি আক্রান্ত রোগী’ শিরোনামে ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আক্রান্ত ব্যক্তিদের বড় অংশ তরুণ, সমকামী ও বিদেশফেরত। পাশাপাশি বাড়ছে মৃত্যুও।

২০১৭ সালে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য চালু হওয়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এন্টি রেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সেন্টারটিতে এখন পর্যন্ত মোট ৯৫৯ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী নিবন্ধিত হয়েছেন। বর্তমানে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন ৭২৩ জন। যার মধ্যে যৌনকর্মী নারী তিনজন, যৌনকর্মী পুরুষ ৩২ জন, তৃতীয় লিঙ্গের তিনজন, মাদকসেবী পাঁচজন, স্থানীয় দম্পতি ৯০ জন, প্রবাসী ও দম্পতি ১২৭ জন এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীর ৩২০ জন রয়েছেন।

ডিবিসির প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
ডিবিসির প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

এ ছাড়া, প্রতিবেদনে গত বছরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়, প্রতিবছর পরীক্ষার পরিসর বৃদ্ধির সঙ্গে সামনে আসছে নতুন রোগী। ২০২০ সালে ৫৫৮ জনকে পরীক্ষা করে ৪৪ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। আর চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত আড়াই হাজার টেস্টে পজিটিভ হয়েছেন ৫৯ জন।

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোতে চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ‘সীমান্ত জেলায় এইচআইভি সংক্রমণ বেশি, পার্বত্য চট্টগ্রামে কম কেন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশে যতজন এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সীমান্ত জেলাগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় সংক্রমিত ব্যক্তি পাওয়া গেছে। বিভাগের হিসাবে ঢাকা বিভাগে শুধু গত বছর নয়, কয়েক বছর ধরেই শনাক্তের সংখ্যা বেশি। এরপরই আছে চট্টগ্রাম বিভাগ।

গত বছর মোট আক্রান্তের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৫০ জন ছিল ঢাকা বিভাগে। এরপরই আছে চট্টগ্রাম বিভাগ। এ বিভাগে আক্রান্ত হয়েছিল ৩৭৬ জন। নতুন শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ মূলধারার জনগোষ্ঠী, ১২ শতাংশ প্রবাসী, ১১ শতাংশ রোহিঙ্গা ও অন্য অংশ সাধারণ জনগোষ্ঠীর। লিঙ্গ অনুযায়ী—পুরুষ ৮১ শতাংশ, নারী ১৮ শতাংশ ও হিজড়া এক শতাংশ। এ ছাড়া, প্রতিবেদনে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক নেওয়া ব্যক্তি, সমকামী ও প্রবাসী কর্মীদের সংখ্যা বেশি ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সীমান্তে অবৈধ যাতায়াত একটি বাস্তবতা বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল। তিনি বলেন, এই যাতায়াতের ফলে কেউ এটি বহন করে এলে সীমান্তে তাঁদের স্ক্রিনিংয়েরও কোনো সুযোগ থাকে না। সে ক্ষেত্রে সমস্যা বেড়ে যায়।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
প্রথম আলোর প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশের প্রায় এক-দশমাংশ এলাকাজুড়ে আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। এর তিনটি জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। তিনটি জেলারই সীমান্ত আছে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে। কিন্তু তিনটি জেলাতেই এইচআইভির সংক্রমণ কম। ২০২৫ সালে এই তিন জেলার মধ্যে বান্দরবানে কোনো সংক্রমণ হয়নি। আর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে দুজন করে এইচআইভিতে সংক্রমিত হয়েছেন।

২০১৬ সালে বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে কোনো সংক্রমণ ছিল না। তবে রাঙামাটিতে একজনের সংক্রমণ ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, পার্বত্য তিন জেলায় অনেক আগে থেকেই এইচআইভির সংক্রমণ কম। এটা তাঁরা দেখে আসছেন। ওই তিন জেলায় জনসংখ্যার ঘনত্ব ও প্রবাসী কর্মীর সংখ্যা কম হওয়াও একটি কারণ বলে মনে হয়।

সীমান্ত থাকার পরও ওই তিন জেলায় এইচআইভি সংক্রমণ কম। এর কারণ হিসেবে রাঙামাটির চিকিৎসক ও টংগ্যা নামের একটি বেসরকারি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পরশ খীসা বলেন, বাংলাদেশের অন্য সীমান্তগুলোতে যত লোকজনের যাতায়াত, পাহাড়ের সীমান্তে তা নেই। আবার এখানে সিরিঞ্জে মাদক নেওয়া বা অযাচিত যৌনাচারের সুযোগও কম।

তবে এসব প্রতিবেদনের কোথাও এক বছরে চট্টগ্রামে নতুন এইচআইভি রোগীর সংখ্যা ৪৬৮ জন এবং তাঁদের মধ্যে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ৩৭৪ জন—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং, গত বছর এ বিভাগে মোট আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৩৭৬ জন।

নওগাঁর সংসদ সদস্যের দাবির পেছনের সত্যতা

চলতি বছরের আগস্টে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের এক টক শোতে নওগাঁ-৩ (মহাদেবপুর-বদলগাছী) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য উল্লেখ করে দাবি করেন, তাঁর জেলায় ১২ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাদের সবাই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং তারা হোস্টেলে থাকে বলেও ওই অনুষ্ঠানে জানান।

নওগাঁয় ১২ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী শনাক্তের দাবি। ছবি: স্ক্রিনশট
নওগাঁয় ১২ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী শনাক্তের দাবি। ছবি: স্ক্রিনশট

তবে এই তথ্যের বিষয়ে অনুসন্ধানে বিষয়টি নিয়ে সে সময়ের একাধিক (, , ) প্রতিবেদন পাওয়া যায়।

প্রচারিত এসব প্রতিবেদনে নওগাঁর সিভিল সার্জন আমিনুল ইসলামের বরাতে দাবিটিকে ভিত্তিহীন বলা হয়। প্রতিবেদনে সিভিল সার্জন আমিনুল ইসলাম জানান, নওগাঁয় ১২ মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর এইচআইভি পজিটিভ হওয়ার দাবি ভিত্তিহীন। জেলায় এইচআইভি রোগীর সংখ্যা মাত্র তিনজন। তাঁরা এখন সিভিল সার্জন অফিসের তত্ত্বাবধানে আছেন এবং ভালো আছেন। ২০২৫ সালে তিনজন রোগী জেলায় এইচআইভি পজিটিভ হন। সেই তিনজনই রোগী। ২০২৬ সালে কেউ নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত হননি।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

আমিনুল ইসলাম জানান, গত জুলাই মাসে নওগাঁয় ১২ জন ব্যক্তি রক্ত পরীক্ষা করতে এসে এইচআইভি টেস্ট করেন। তবে তাঁদের কারও মধ্যে এইচআইভি পাওয়া যায়নি। একই তথ্য দেন বদলগাছী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কানিস ফারহানাও।

প্রতিবেদনে নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদার বরাতে বলা হয়, তিনি মোবাইল ফোনে জানান, ১২ জনের মধ্যে তিনজন এইচআইভি পজিটিভ হয়েছেন। এরপর তিনি কল কেটে দেন।

সিদ্ধান্ত

চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন শনাক্ত ৪৬৮ জন এইডস রোগীর ৩৭৪ জনই মাদ্রাসাশিক্ষার্থী—এমন দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডটির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন এইচআইভি রোগী শনাক্তের বিভিন্ন পরিসংখ্যান পাওয়া গেলেও এর মধ্যে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের এমন কোনো সংখ্যা উল্লেখ নেই। একইভাবে, নওগাঁয় ১২ মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর এইচআইভি পজিটিভ হওয়ার দাবিকেও সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত