Ajker Patrika

আসাদের শার্ট আমাদের প্রাণের পতাকা

সঙ্গীতা ইমাম
আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২২, ১১: ২৩
আসাদের শার্ট  আমাদের প্রাণের পতাকা

কবি শামসুর রাহমানের আসাদের শার্ট কবিতাটি সম্ভবত অনেক বাঙালিই পড়েছেন। কবিতাপ্রেমী মানুষেরা তো বটেই, কবিতার সঙ্গে যাঁদের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই, তাঁরাও খবরের কাগজে বা কারও লেখার উদ্ধৃতিতে নিশ্চয়ই পড়ে থাকবেন: ‘আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা/সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক/আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’ এই অসামান্য কবিতাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামের এক অনবদ্য অধ্যায়—উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান।

আজ ২০ জানুয়ারি, ১৯৬৯ সালের এই দিনে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন ছাত্রনেতা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান আসাদ। তাঁর রক্তের মশালে জ্বলে উঠেছিল ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বহ্নিশিখা। যদিও এ আন্দোলনের সূত্রপাত হিসেবে ধরা যেতে পারে ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকারের দায়ের করা আগরতলা মামলা, যা ইতিহাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামেই পরিচিত। ১৯৬৮ সাল, বছরটি ছিল স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের ১০ বছর পূর্তি। এ উপলক্ষে একদিকে জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করা হচ্ছিল ‘উন্নয়নের দশক’ এবং অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা করে পাকিস্তান সরকার। অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে রাজনীতিক, সিএসপি অফিসার ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন। অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে রাজসাক্ষী হওয়ার শর্তে ১১ জনকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিল পাকিস্তান সরকার।

পাকিস্তানিদের এই ষড়যন্ত্রমূলক মামলার প্রতিবাদে জেগে ওঠে বাংলার মানুষ। তারা স্পষ্ট বুঝতে পারে, এ ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফার আন্দোলনকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র। ১৯৬৮ সালের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ হয়ে ওঠে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় বছর। আন্দোলন তখন কেবল রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিতেই কেন্দ্রীভূত ছিল না, তা ছড়িয়ে পড়েছিল গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। ঐক্যবদ্ধ ও সক্রিয় গণশক্তি যে কী বিপুল জোয়ার তৈরি করতে পারে, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান তার এক ঐতিহাসিক দলিল। এ বছরই গঠিত হয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং ঘোষিত হয় তাদের ১১ দফা দাবিনামা।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ‘দাবি দিবস’ পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আন্দোলন দমন করতে পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকেই ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে রেখেছিল। পরবর্তী সময়ে এ ধারা ঢাকা ছাড়িয়ে আরও নানা জেলায় জারি হতে থাকে। দাবি দিবসে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার ছাত্র সমাবেশ থেকে ১৪৪ ধারা বাতিলসহ ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘটের আহ্বান জানায়। কিন্তু এই সমাবেশেও আইয়ুব খানের পুলিশ নির্বিচারে হামলা চালায়। পরবর্তী দুদিন (১৮ ও ১৯ জানুয়ারি) বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আন্দোলনকর্মীদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা চালায় পাকিস্তানি পুলিশ। এরই প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি প্রদেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট আহ্বান করে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।

২০ জানুয়ারির বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সমবেত হন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে শিক্ষার্থীদের এক বিরাট মিছিল বের হয়। নিমতলী রোডে প্রবেশ করলে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ও ইপিআর মিছিলে গুলি চালায়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা আসাদুজ্জামান, সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু, অবজারভার পত্রিকার স্টাফ ফটোগ্রাফার মোজাম্মেল হোসেন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র আবদুল মজিদসহ আরও একজন। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ছাত্রনেতা আসাদকে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

আসাদের রক্তমাখা শার্ট হয়ে ওঠে আন্দোলনের এক দুর্বার প্রতীক। প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে পাড়ায়-মহল্লায় গঠিত হতে থাকে সংগ্রাম পরিষদ। ২৪ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে নিহত হন নবকুমার ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী মতিউর। এদিন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সংগ্রামী জনতার পদভারে স্পন্দিত হয়ে ওঠে রাজপথ থেকে অলি-গলি, ছড়িয়ে পড়ে গণজাগরণের উত্তুঙ্গ ঢেউ। এই বিপুল গণজোয়ারকে দমন করার জন্য পাকিস্তানের পুলিশ নৃশংস নির্যাতন চালিয়েছিল আন্দোলনকারীদের ওপর। ১৫ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে আটক আগরতলা মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করা হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মৌন মিছিলে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় ড. শামসুজ্জোহাকে। তাঁদের পবিত্র রক্তাঞ্জলি থেকেই জেগে ওঠে মানুষের দ্রোহ, তৈরি হয় মুক্তির গান। উনসত্তরের এই অবিস্মরণীয় ইতিহাসের পথ ধরেই আসে সত্তরের নির্বাচনে বাংলার মানুষের ন্যায়সংগত অংশগ্রহণের মাহেন্দ্রক্ষণ।

কিন্তু ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতার কতটুকু জানে আমাদের আজকের প্রজন্ম? শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত বলেই কথাটি বলছি। পাঠ্যপুস্তকে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের যে সত্যচর্চা এখন হচ্ছে, তার পরিধি এবং গভীরতা নিয়ে একজন শিক্ষক হিসেবে আমি নিজেকে সন্তুষ্ট দাবি করতে পারি না। দীর্ঘ সময় আমাদের পাঠ্যপুস্তকে বিকৃত ইতিহাসের চর্চা হয়েছে। আজ যদিও সময়ের সেই কৃষ্ণগহ্বর থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি; কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের জন্য যেটুকু জায়গা বরাদ্দ, তা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও দেশের সচেতন নাগরিকেরা মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি বিষয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির দাবি করে আসছেন। এ দাবির যৌক্তিকতা হলো, ক্ষুদ্র পরিসরে শিক্ষার্থীদের হয়তো ইতিহাস জানানো যায়; কিন্তু ইতিহাসবোধ তৈরি করা যায় না। এর জন্য ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বোঝা খুব জরুরি। আজ শহীদ আসাদের প্রয়াণ দিবস। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়তো শিক্ষকেরা ক্লাসে এ নিয়ে কথা বলবেন, সেটা তাঁদের নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই পাঠ্যক্রমের বাইরে গিয়ে আমরা কতটুকুই-বা জানাতে পারি আমাদের শিক্ষার্থীদের?

এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্বও অনেক। আমাদের মুক্তিসংগ্রামের শহীদদের জীবনী বা ইতিহাস সন্তানদের জানানোর পারিবারিক রেওয়াজ নেই বললেই চলে। পূর্ণ একটি বিষয় থাকলে অন্তত পরীক্ষার প্রয়োজনে হলেও অভিভাবকেরা সে বিষয়ে সন্তানদের জানাবেন। তা না হলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আমাদের সন্তানরা কী করে জানবে—কেন আসাদের শার্ট আমাদের প্রাণের পতাকা হয়ে উঠেছিল?

লেখক: সঙ্গীতা ইমাম শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত