‘নারী ও কন্যা নির্যাতন বন্ধ করি, নতুন সমাজ নির্মাণ করি’ স্লোগান নিয়ে এবার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ পালন করেছে। এই ডিজিটাল যুগেও যখন নতুন সমাজ নির্মাণের জন্য স্লোগান ধরতে হয়, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না এ সমাজ যতই ডিজিটাল হোক, মানুষের পোশাকপরিচ্ছদ, বাড়িঘর চকচকে-ঝকঝকে হোক আর পুরোটা না হলেও খানিকটা মসৃণ সড়ক, জৌলুশময় বিশাল সেতুসহ চলার পথ বড় বড় বিলাসবহুল বাস এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে যতই সয়লাব হোক, সমাজটা সেই পুরোনোই রয়ে গেছে! যে সমাজে মানুষের কোনো দাম নেই, বিশেষ করে নারীকে যে সমাজ এখনো পূর্ণ মানুষ ভাবে না, সেই সমাজ যে কোনোভাবেই সভ্য ও আধুনিক সমাজ হতে পারে না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
মানুষকে দাবিয়ে রাখার পন্থা দাসপ্রথা গেছে, সামন্তপ্রথা গেছে, রাজতন্ত্র, ঔপনিবেশিকতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্রও গেছে। এখন নাকি চলছে গণতন্ত্রের যুগ! গণতন্ত্র মানে স্কুলে আমরা পৌরনীতি পাঠে শিখেছিলাম, ‘জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জনগণের সরকার’। সেই জনগণের অর্ধেক নারী (যাঁরা ভোটারও বটে) যদি সম্পদ-সম্পত্তিতে অধিকার না পান, রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার তো পরের কথা, তাঁদের নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন, তাহলে কি বলা যায় যে আমাদের সমাজ থেকে দাসপ্রথা, সামন্তপ্রথা ও রাজতন্ত্র বিলোপ হয়ে গণতন্ত্র এসেছে? নাকি আমরা এমন এক সমাজে আছি, যেখানে দাসপ্রথা, সামন্তপ্রথা, রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র এবং মোল্লাতন্ত্রের মিশেলে তৈরি ককটেল বা জগাখিচুড়িতন্ত্রকে গণতন্ত্র ভেবে কাল্পনিক সুখে বিভোর হয়ে আছি! দাসপ্রথায় মানুষের অবস্থা কেমন ছিল, তা ইতিহাস পড়া মানুষেরা কমবেশি জানেন। কোনো একজন মানুষ বা একদল মানুষকে, কিছু মানুষ পেশিশক্তিতে বা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কবজা করে নিত। তাকে পশুর মতো খাটাত, তাকে বিক্রি করে দিত, তার সঙ্গে যা খুশি ব্যবহার করতে পারত। একজন দাসের কোনো ব্যক্তিসত্তা ছিল না। তার বাক্স্বাধীনতা, কোনো ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রকাশ করার কোনোই সুযোগ ছিল না। তা আজকের ডিজিটাল যুগেও আমাদের অধিকাংশ পরিবারব্যবস্থায় একজন নারীর অবস্থা কি দাসের চেয়ে খুব বেশি ভালো? একজন নারী কি নিজের ইচ্ছায় কিছু করতে পারেন? একজন পিতা (অনেক ক্ষেত্রে মাতাও যে পুরুষতন্ত্রকে অস্থিমজ্জায় ধারণ করেন যে তাঁর নিজের ওপর সংঘটিত বাল্যবিবাহের অত্যাচার ও পাশবিকতার ভেতর দিয়ে এসেও বিয়ের মাঝেই একজন মেয়ের জীবনের পূর্ণতা। পুরুষতন্ত্রের ক্ষারে ধোলাই করা মগজ নিয়ে যে মনে করেন নারীর জন্ম হয়েছে পুরুষের অধীনে থেকে অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে সংসারের ঘানি টানার জন্য) তাঁর কন্যা সাবালক হওয়ার আগেই যখন বিবাহের মাধ্যমে পরের ঘরে পাঠিয়ে দেন স্রেফ দাসত্ব করার জন্য। অনেকের খারাপ লাগতে পারে কিন্তু এটাই সত্য। শ্রমদাসত্ব ও যৌনদাসত্ব করতেই পিতা ও তাঁর পরিবার তাঁদের কন্যাসন্তানকে একজন পুরুষের অধীন করে পাঠিয়ে দেন। আর সমাজ তাতে সহযোগিতা করে। অনেক সময় সমাজ পরিবারকে বাধ্য করে।
যেসব মা-বাবা তাঁদের কন্যার প্রতি একটু বেশি স্নেহশীল এবং মেয়েকে লেখাপড়ার সুযোগ দিয়ে স্বাবলম্বী করতে বিয়ের ভাবনাটা একটু দূরে সরিয়ে রাখেন, দেখা যায় তাঁদের সমাজ ও আত্মীয়স্বজন এসে উত্ত্যক্ত করে—মেয়েকে কেন বিয়ে দিচ্ছে না, আইবুড়ো বানিয়ে ঘরে রেখে দিচ্ছে বলে নানা রকম কটূক্তি করে। এই কটূক্তি সহ্য করার মতো শক্ত মানসিকতা তাঁদের সবার থাকে না। যাঁদের থাকে না সেসব কন্যার মা-বাবা একটা সময় বিভ্রান্ত হন। তাঁরা মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে না দিয়ে যে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন, সেটা ঠিক না ভুল—বুঝতে না পেরে শেষ পর্যন্ত মেয়ের বাল্যবিবাহ দেওয়ার ভুলটি করে বসেন। মা-বাবা হলেও মেয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে সময় আসার আগেই মেয়েকে বিয়ে দেওয়া, অর্থাৎ মেয়ের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধে দেওয়ার কাজটি করেন। নিজের মেয়ের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেন প্রথমে তাদের মা-বাবা। কারণ, বাল্যবিবাহ দিয়ে প্রকারান্তরে তো মেয়েটিকে সহিংসতার মাঝেই ঠেলে দেওয়া হয়। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পপুলেশন রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (নিপোর্ট) ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির প্রকাশিত গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, ৭৭ শতাংশ বিবাহিত নারী তাঁদের বরের দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। তথ্যে আরও জানানো হয়েছে, দেশে ৩৩ শতাংশ অবিবাহিত নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়, যাদের অধিকাংশ কিশোরী। মোটকথা, বিবাহিত বা অবিবাহিত, পিত্রালয় বা শ্বশুরালয়ে নির্যাতিত নারীর অধিকাংশই থাকে কিশোরী। কারণ কিশোরীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল থাকে, বুদ্ধিজ্ঞান কম থাকে, সাংসারিক কাজকর্ম করার ও কূটবুদ্ধি বোঝার অনভিজ্ঞতা থাকে, যা থাকাটাই স্বাভাবিক। অথচ কখনো এসব কারণে, কখনো যৌতুকের জন্য এমনকি পুত্রসন্তান জন্ম না দেওয়ার জন্যও নির্যাতিত হয় তারা।
দেখা যাচ্ছে কন্যা ও নারী নির্যাতন শুরু হয় ঘর থেকেই। পরিবারে কন্যার মর্যাদাহীনতা ও নির্যাতনের প্রভাব পড়ে সমাজে। ধর্মীয় বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে কোণঠাসা করে রাখে সর্বত্র।
মিডিয়া হাউসগুলো সিনেমা, নাটক, বিজ্ঞাপনে নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপন করে। তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের সুযোগে পর্নোগ্রাফির অবাধ প্রবাহ নারী ও কন্যাদের ওপর যৌন হয়রানি, উত্ত্যক্তকরণ, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার মতো সহিংসতা ঘটাতে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ কমিটির একটি প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০২১ সালে দেশে ৮১০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে; যা এক বছরে সর্বোচ্চ। ওই একই বছর গণধর্ষণ ২২৫টি, ধর্ষণচেষ্টা ১৯২টি এবং ৯৬টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। অথচ এসব ঘটনার কোনো একটিরও উল্লেখযোগ্য বিচার হয়েছে বলে কোথাও খবর আসেনি; বরং অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারা অব্যাহত রয়েছে। যে কারণে দেখা গেছে, ধর্ষণের ঘটনা ২০২২ সালে এসেও কমেনি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ১২টি দৈনিক পত্রিকার কাটিং অনুযায়ী, এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৪৩ জনের অধিক নারীর ধর্ষণের খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে প্রায় ২০০ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে অধিকাংশই আবার কিশোরী, তরুণী ও শিশু। যে শিশু-কিশোরীরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।
একটা কথা কোথায় পড়েছিলাম—কোন সমাজ কতটুকু সভ্য, সেটা বোঝা যায় সেই সমাজের নারীর অবস্থা ও অবস্থান দেখে। আমাদের সভ্যতার মাত্রাটাও ঠিক কোন জায়গায়, তা বোঝা যাবে নারীবাদী লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের লেখার এই অংশটুকু পড়লে। ‘সমাজ নারীকে কতখানি ভয় পায়, কতখানি শেকলে তার হাত-পা-আত্মা বেঁধে তাকে পীড়ন করতে চায়, সেটা জানা গেলে জানা হয়ে যায় তার সভ্যতার মাত্রা। বোঝা যায় ঐ সমাজের কতটুক পড়ে আছে মধ্যযুগে বা তারও আগে, আর কতটুক ঢুকেছে আধুনিক যুগে, আমাকে নারীর অবস্থাটি বলুন আমি সমাজের সভ্যতার মাত্রা বলে দেবো।’ আমাদের দেশে বিরাজমান নারীর অবস্থা বলে দিচ্ছে, সভ্যতার কোন মাপকাঠিতে আমরা আছি। কিন্তু আমরা এই পচা-গলা পুরোনো সমাজে থাকতে চাই না, যেখানে প্রতিদিন নারীর প্রতি ধর্ষণসহ বহুমাত্রিক নির্যাতনের খবর দিয়ে আমাদের দিন শুরু করতে হয়। এর অবসান দরকার। ‘জন্মসূত্রে সকল মানুষ স্বাধীন এবং সম-অধিকার ও সমমর্যাদা লাভের অধিকারী’ সর্বজনীন মানবাধিকারের এই দর্শনকে ধারণ করে আসুন, নারীমুক্তি তথা নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এমন এক নতুন সমাজ বিনির্মাণ করি, যেখানে আর একটি কন্যা ও নারী কোনো দিন নির্যাতিত হবে না। যেখানে কেউ কখনো কোনো মানুষকে নির্যাতন করবে না। তার জন্য শুধু আমাদের চেতনায় শাণ দিতে হবে আর দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও নারী অধিকারকর্মী










