Ajker Patrika

‘নেপথ্য কণ্ঠে’র চোখে বই মেলা

কাশফিয়া আলম ঝিলিক, ঢাকা
আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১০: ১৫
‘নেপথ্য কণ্ঠে’র চোখে বই মেলা

বৃষ্টি আর বাতাসে লন্ডভন্ড পুরো বইমেলা!

ঘোষণামঞ্চ থেকে সবাইকে নিরাপদ জায়গায় দাঁড়ানোর আহ্বান ভেসে আসছে বারবার। মেলায় আগতদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে দ্রুতই। হঠাৎ একজন হন্তদন্ত হয়ে এলেন। জানালেন, জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন। বইমেলার ঘোষণামঞ্চ থেকে যদি একটু বলে দেওয়া হয়, তাহলে হয়তো বেঁচে যাবে একটি মুমূর্ষু প্রাণ! সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা কম ভেবেও সিদ্ধান্ত হলো, ঘোষণা করা হবে জরুরি রক্তের জন্য এই আকুতির কথা। মুহূর্তেই ভেসে এল ঘোষণা, একজন মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন। উল্লেখ করা হলো রক্তের গ্রুপও। পাওয়াও গেল একজন রক্তদাতা।

এ ঘটনাকে ‘কণ্ঠের সার্থকতা’ বলে উল্লেখ করেন আবিদ করিম মুন্না। কয়েক বছর আগের বৃষ্টিমুখর এক বইমেলা প্রাঙ্গণে নিজের দায়িত্ববোধ থেকে এই ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। ২০০৭ সাল থেকে একুশে বইমেলার ঘোষণামঞ্চ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠগুলোর মধ্যে একটি আবিদ করিম মুন্নার।

নবান্ন প্রকাশনীর স্টল সাজানো হয়েছে রিকশা পেইন্ট দিয়ে।আবিদ করিম দেখেছেন বইমেলার নানান দিক। আগুনে পুড়ে যাওয়া স্টলের দিকে তাকিয়ে প্রকাশক, লেখকদের ভেজা চোখ থেকে শুরু করে বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া বইমেলা প্রাঙ্গণ। প্রিয় লেখককে দেখে পাঠকের চোখে ঝিলিক, নতুন বই কিনে বাড়ি ফেরার তৃপ্ত চোখ, লেখকদের বই প্রকাশ আর বিক্রির আনন্দ—এ সবই দেখেছেন তিনি।

গ্রামীণ পরিবেশের আবহ তৈরি করা হয়েছে আকাশ প্রকাশনীর দোকান সজ্জায়।২০০৬ সালে বাংলা একাডেমির চাকরিতে যুক্ত হন আবিদ করিম। এরপর ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আয়োজিত সব বইমেলায় প্রতিদিনই ঘোষণা মঞ্চ থেকে ভেসে এসেছে তাঁর কণ্ঠ। দায়িত্বের কারণে তিনি কখনো জানিয়েছেন সতর্কবাণী, কখনো মেলার সময়সূচি ও আয়োজন, কখনো উৎফুল্ল কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন নতুন বইয়ের কথা, কখনো কিছুটা ভারী কণ্ঠে জানিয়েছেন হারানো সংবাদ—হোক তা কারও সন্তান কিংবা কোনো মূল্যবান জিনিস। আহ্বান জানিয়েছেন জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় রক্তের।

পড়ন্ত বিকেলে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে আবিদ করিমের কাছে জানতে চাইলাম, কতটা পরিবর্তন দেখছেন বইমেলায়? কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর চোখে হয়তো ভেসে ওঠে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত পুরোনো বইমেলাটি। আবিদ জানালেন, যখন বাংলা একাডেমিতে বইমেলা সীমাবদ্ধ ছিল, তখন থেকে কাজ করছেন তিনি। সেই সূত্রে অনেক বিখ্যাত মানুষ, সাহিত্যিক, আলোকচিত্রী ও পণ্ডিতদের পদচারণায় মুখর বইমেলা তিনি দেখেছেন। একসময় মেলায় শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ‘অন্য প্রকাশ’কে বাংলা একাডেমির দিঘির পাড় ঘেঁষে স্টল দেওয়া হতো। কারণ হ‌ুমায়ূন আহমেদ আসতেন। তাঁর অগণিত পাঠক প্রতিদিন ভিড় করতেন প্রিয় লেখকের জন্য।

পুথিনিলয় প্রকাশনীর স্টল-সজ্জায়ও আছে ব্যতিক্রমী চিন্তা।সময়ের প্রয়োজনে কিংবা কিছুটা সময়ের দাবিতেও বলা চলে, বাংলা একাডেমি বইমেলার পরিসর বেড়েছে, প্রকাশনীর সংখ্যা বেড়েছে। এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার বেশির ভাগ স্টল বসে। তবে আবেদের কণ্ঠে সেই পুরোনো মেলা প্রাঙ্গণ ভুলতে না পারার একটা সুর ভেসে আসে। তিনি বলেন, ‘অনেকে এখন বাংলা একাডেমির দিকে যান না। এখানেই ঘুরেফিরে চলে যান। তবে আমার মনে হয় ওই জায়গাটাকে আরও একটু ব্যবহার করা উচিত। নতুন কোনো সংযোজন দর্শকদের সেদিকে আকর্ষিত করতে পারে।’ সেখানে বিখ্যাত বইয়ের প্রচ্ছদ বা আলোকচিত্রের প্রদর্শনী হতে পারে।

বইমেলায় প্রতিবারই ভিন্ন সজ্জার কিছু স্টল পাঠকদের আকৃষ্ট করে। আর মেলা শেষে স্টলের সজ্জা নিয়েও থাকে বিশেষ পুরস্কার। এ বছর পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে বেশ কিছু দোকানের সজ্জা। শাহবাগের দিক থেকে মেলায় ঢুকে কিছু দূর গেলেই চোখে পড়বে একটা কুঁড়েঘর। বাঁশ আর চাটাই দিয়ে দেয়াল তোলা সেই ঘরে বিভিন্ন ধরনের বই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পাঠক খুব আগ্রহ নিয়ে আসছেন সেখানে। ছবি তুলছেন, বই দেখছেন, কেউ কেউ আবার বই কিনছেনও। এটি আকাশ প্রকাশনীর স্টল। সেখানে দায়িত্বে থাকা রাজিউর রহমান রাজু বলেন, ‘সজ্জার কারণে পাঠকসমাগম হচ্ছে, তবে বিক্রি তেমন হচ্ছে না। কিন্তু পাঠক আসছেন, ঘুরে দেখছেন, এটাতেও আমরা আনন্দিত।’ মূলত গ্রামীণ পরিবেশের আবহ তৈরির জন্যই এমন সজ্জার আয়োজন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন রাজু। এবার তাঁদের স্টলে প্রকাশিত নতুন বইয়ের সংখ্যা বেশি।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্টল-সজ্জার থিম বই।এ ছাড়া নবান্ন প্রকাশনীও তাদের দোকানসজ্জার জন্য আগত পাঠক ও দর্শনার্থীদের মধ্যে বেশ সমাদৃত হচ্ছে। দেশের চিত্রকলার জগতে রিকশা পেইন্ট বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নবান্ন প্রকাশনী তাদের দোকানটি সাজিয়েছে রিকশা পেইন্ট দিয়ে। স্টলের এক পাশে একটি রিকশায় বসে আছে মানুষের আদলে একটি পুতুল। সেটির হাতে খোলা বই। দায়িত্বে থাকা ঐশী জানালেন, তাঁরা স্টলের সজ্জায় কিছুটা ভিন্নতা আনার চেষ্টা করেন। ‘নবান্ন’ শব্দটি যেমন বাংলার সংস্কৃতিকে বহন করে, তাঁদের স্টলটিও তেমনই। গত বছর নবান্নের স্টল সাজানো হয়েছিল দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় গ্রামীণ সরঞ্জাম দিয়ে।

মেলা থেকে বের হওয়ার পথে আবারও দেখা হয়ে গেল আবিদ করিম মুন্নার সঙ্গে। জানতে চাইলাম, মেলার দোকানসজ্জার পরিবর্তনগুলো কেমন দেখছেন এত বছর ধরে? আবিদ জানালেন, পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবেই নিচ্ছেন তিনি। বইমেলায় প্রতিবারই ভিন্ন সজ্জার কিছু স্টল পাঠকদের আকৃষ্ট করে। আর মেলা শেষে স্টলের সজ্জা নিয়ে থাকে বিশেষ পুরস্কার। হতে পারে মেলায় আগত অনেকের হাতেই ফেরার সময় বই থাকছে না। তবু দিন শেষে পাঠক ঠিকই বই পড়বেন বলে বিশ্বাস করেন আবিদ করিম। বিশেষ দিনগুলোতে মেলা প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে, এই সমাগম কম কীসে? স্টলগুলো তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে সাজিয়ে গুছিয়ে ক্রেতা টানতে।

শিশুতোষ বইয়ের দোকানগুলো সাজানো হয়েছে শিশুদের উপযোগী করে।এ ছাড়া অন্যান্য কিছু স্টলেও দেখা গেছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্টলটি তৈরি করা হয়েছে বইয়ের আদলে। শিশুদের আকৃষ্ট করে এমন কার্টুন ও ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছে শিশুদের বইয়ের দোকানগুলো।

এবারের বইমেলার শেষ দিন পর্যন্ত এবং আগামী বইমেলাগুলোতেও হয়তো আমরা শুনতে পাব আবিদ করিমের কণ্ঠ। বইমেলা নিয়ে বাড়বে তাঁর আবেগ, অনুভূতি আর স্মৃতি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিএনপি-জামায়াত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিল নতুন জরিপ

ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্যে সৃষ্ট ধোঁয়াশা পরিষ্কার করল বিসিবি

কী শর্তে গাজায় ট্রাম্পের বাহিনীতে যোগ দেবে বাংলাদেশ, জানালেন প্রেস সচিব

সস্ত্রীক ঢাকায় পৌঁছালেন নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন

ইরানের বিক্ষোভে খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করে ছাত্রীকে হত্যা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত