Ajker Patrika

সব আছে কিন্তু শান্তি কোথায়

অজয় দাশগুপ্ত
সব আছে কিন্তু শান্তি কোথায়

আমাদের দেশের মানুষ অনেক কিছু পেয়েছে। একদা আমাদের বড় হওয়ার কালে কত ধরনের যে অপ্রাপ্তি ছিল! আমরা বড় হয়েছি বিদেশের পুরোনো গুঁড়ো দুধ খেয়ে। চেরনোবিলের দুর্ঘটনার পর ফেলে দেওয়া দুধ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছিল—এমনও শুনেছি আমরা। আমাদের সময় পোশাকের সমস্যা ছিল চরমে।

বলা বাহুল্য, পুরোনো পোশাকের বাজার ছিল তখন একমাত্র আশ্রয়। কার কাপড়, কখনকার পোশাক কিছুই জানা ছিল না। শুধু জানতাম ওগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করা। সাইজ মিলত না, ফ্যাশন মিলত না, তবু সে কাপড়েই আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করতাম আমরা।

দিনকাল পাল্টেছে। আমাদের পোশাক এখন দুনিয়াময়। এই যে একক একটি দেশ অস্ট্রেলিয়া, যার কোনো ভৌগোলিক প্রতিবেশী নেই বললেই চলে, তার বাজারেও এখন ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। যেখানে যাই, বাংলাদেশের পোশাকের রমরমা বাজার। সেদিন সেখানকার টিভিতে দেখলাম করোনা-পরবর্তী বাজার সামাল দিতে গিয়ে বাংলাদেশি পোশাকের কথা বললেন সে দেশের বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, দামে-মানে বাংলাদেশ এখন সেরা। যার মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা সহজ হচ্ছে। আরও অনেক দিক থেকে তরতর করে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। খাবারের বাজারে, মসলাপাতির বাজারেও ঢুকেছে এ দেশ। আগের দিন আর নেই।

আমাদের দেশের মানুষ প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্সের কারণে ভালো আছেন। ভালো আছেন পরিশ্রমী কৃষক, পোশাকশ্রমিক আর মেহনতি মেধাবী মানুষের কারণে। এত সব পাওয়ার ভেতর যে অপ্রাপ্তি, আজ তার নাম ‘শান্তি’। শান্তি পাইনি আমরা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের বছর থেকে যে শুরু, এখনো সেই ধারাবাহিকতা চলমান। সবকিছু পাওয়ার পরও শান্তি পায়নি দেশের মানুষ। কেন পায়নি? উত্তর একটাই—রাজনীতি। বছরের পর বছর দেশ শাসনে থাকা দলটি যেমন পারছে না, তেমনি দেশ শাসনের জন্য অধীর আগ্রহ ও উত্তেজনায় ভুগতে থাকা বিরোধীরাও জানে না শান্তি কোথায়।

অনেকেই কথায় কথায় বলেন, এ জন্য কি দেশ স্বাধীন হয়েছিল? এই প্রশ্নটা যাঁরা করেন, তাঁদের কাছে পাল্টা জিজ্ঞাসা, কিসের জন্য স্বাধীন হয়েছিলাম আমরা? যদি তা জানেন তো পথ বাতলে দেন। আর যদি আপনাদের কথা না শোনে কেউ, তো শোনানোর ব্যবস্থা নিন।

জানি এর উত্তরে হাজারটা যুক্তি আর কথা উঠবে। যে কথাটা আমরা বলব না, শুধু এ দেশ কেন, সব দেশের কিছু মৌলিক বিষয় থাকে। যে মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কেউ তর্ক করে না। অথচ আমাদের রাজনীতি সেটা বুঝলেও মানে না। আমি আওয়ামী লীগের হয়ে কথা বলি না। কিন্তু এটা তো সত্য যে মৌলিক বিষয়গুলো না মানলে আখেরে আমাদের রাষ্ট্রই পড়বে বিপদে। যে বিপদ ২১ বছর আমাদের তাড়া করেছিল। সেই বাধা কাটাতে না কাটাতেই আরেক বিপদ এসে পড়ে মাথার ওপর। তাহলে কি নতুন প্রজন্ম বুঝে নেবে যে এই একের পর এক সমস্যার নাম বাংলাদেশ?

কেন শান্তি নেই? একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া কী কারণে কারও প্রতি অগাধ আস্থা নেই মানুষের? কারণ রাজনীতি তা হতে দেয় না। একটি দলের প্রধান ব্যক্তি থাকেন বিদেশে। সেখান থেকে অর্ডার করেন, এটা কী প্রমাণ করে? বিদেশে থাকা অপরাধ কিছু না। কিন্তু দেশের মানুষের পালস বা নাড়ি বুঝতে হলে সেই মাটিতে থাকতে হবে না? তা না হলে বিচার বা রায় কি সঠিক হতে পারে? এটাও তেমন সমস্যা নয় যদি রাজনীতি চলে তার আপন গতিতে। আজকাল তো দেশের নেতাদের কথায় দেখি চিড়েও ভেজে না। ভেজান আমেরিকান রাষ্ট্রদূত। আইনশৃঙ্খলা যাঁরা দেখভাল করেন, তাঁদের গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁদের কথা শোনা, তাঁদের কাজ করতে দেওয়া অবশ্যই আমাদের সবার কর্তব্য। কিন্তু এখন দৃশ্যপট এমন যে তাঁরাই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। সেখানে রাজনীতির লোকজন কোথায়? কোথায় তাঁদের বলিষ্ঠতা?

শান্তি উধাও হওয়ার আরেকটা সহজ কারণ প্রতিশোধপরায়ণতা বা হিংসার বিস্তার। গান্ধীজি বলতেন, চোখের বদলে চোখ নিতে থাকলে দুনিয়াই একদিন অন্ধ হয়ে যাবে। এ কথাটা যেন প্রকট হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আজকের বাংলাদেশে আর যা-ই থাক, সহিষ্ণুতা নেই। এই অসহনীয় বাস্তবতার কারণ শুধুই গদি দখল। কেউ আঁকড়ে থাকার জন্য, কেউ পাওয়ার তাগিদে জনগণের বারোটা বাজিয়ে চলেছেন।গবেষক বলছেন: মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার যেসব দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা অধিক, তারাও আমাদের মতোই মানুষ।তাদের শাসকশ্রেণিও মানুষ। রাজনীতিবিদেরাও মানুষ। সুতরাং তাঁরা পারছেন, আমরা কেন পারছি না?

বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে। আমেরিকার কথাই ধরা যাক। যেখানে রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ বিরল। সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো প্রয়োজনে নাগরিকদের ধরনা দিতে হয় না রাজনীতিবিদদের কাছে। যেমন জায়গা কেনা, বাড়ি কেনা, ব্যাংক থেকে লোন নেওয়া, চাকরিবাকরি পাওয়া ইত্যাদি। দলীয় রাজনৈতিক পরিচয় কেউ কোথাও বলে বেড়ায় না। দোকানে, রাস্তাঘাটে, চা-স্টল বা কফি হাউসে কে কোন দলের তা কোনো আলোচ্য বিষয় হয় না। এ নিয়ে ঝগড়া বা মারামারির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিংবা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কোনো অন্যায়, অনৈতিক ফায়দা হাসিল বা সুবিধা আদায়ের কোনো ধান্দা কেউ করে না।

শুধু আইন দিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না, দরকার সহনশীলতা। আলবার্ট আইনস্টাইনের এই কথাটা আজ বড় সত্য। কী যে চলছে, সেটা বোঝা কঠিন হলেও যেটা সবাই জানেন, আমাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হওয়ার পথে। একদিকে যেমন দেশের অর্থনীতির সামনে যাওয়ার খবর, আরেক দিকে চলছে নীরব অভাবের সময়। এই অভাবের বহিঃপ্রকাশ এখনো সীমিত। যদি তা আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বের হয়ে আসে তাহলে যে কী হয় তা বলার দরকার পড়ে না। আমরা আর যা-ই চাই, সেটা চাই না। যে অলীক ভয় আর বাস্তব সমস্যা—এই দুইয়ের সমীকরণ মেলাতে পারছে না সরকার। যে কারণে শান্তি ক্রমেই সুদূরে চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সাধারণ জনতা বা আমজনতা শান্তিপ্রিয়। কিন্তু তারা ঝুটঝামেলা দেখলে শক্ত হয়ে দাঁড়াতেও ভয় পায় না। সেই ইতিহাসের অংশ হওয়ার পরও সরকারি দল কেন যে তা সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেটাই এখন ভাবার বিষয়। গুজবের ডালপালা যেভাবে ছড়াচ্ছে তাতে আতঙ্কিত হওয়ার বিকল্প নেই; বিশেষ করে বিদেশের বাঙালিদের মনে, ঘরে, আচরণে এই গুজব এখন বেশ পোক্ত। মাঝখানে তাঁদের দৌরাত্ম্য আর পাগলামি এত বেড়ে গিয়েছিল যে মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঘটবেই। এখন তাঁরা হয়তো টের পাচ্ছেন তাঁদের প্রচারণা কাজে আসেনি। কিন্তু ব্যর্থতার জায়গাটা হচ্ছে তাঁদের সোর্স বা আর্থিক উৎস বের করার কোনো তোড়জোড় দেখিনি।

শান্তি আনতে হলে এগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। নজরদারির মানে এই না যে আপনি কাউকে অনাচার-অত্যাচার করে দমিয়ে রাখবেন। তার চেয়ে সহিষ্ণুতা আর নিয়মতান্ত্রিক পথে, গণতন্ত্রের পথে হাঁটলেই হয়তো শান্তির পরশ পেতে পারে দেশের মানুষ। এই শান্তি বিষয়টা যদি অধরা থাকে এবং রাজনীতি যদি তাকে লালন করে, তাহলে আমাদের সব উন্নয়ন তো পথে বসবেই, সঙ্গে থাকবে বিদেশিদের প্রভুত্ব। বিদেশিদের সব কর্মকাণ্ড যে খারাপ তা বলা অন্যায়।

কিন্তু তাদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর চাপের কারণ খুঁজে বের করে ব্যবস্থা না নিলে শান্তি আর আসবে না। এ কথাটা বিদেশের মানুষজন বোঝেন বলেই তাঁদের দেশগুলোতে শান্তি পালাতে পারে না। আমাদের দেশে ধরা দিলেও তাকে রাখা যায় না। রাখার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা কি কথা শুনবেন? নাকি শান্তির পথে হাঁটবেন?

লেখক: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

খালেদা জিয়ার ছায়াসঙ্গী ফাতেমার সন্তানেরা কী করেন, ১৬ বছর কেমন কেটেছে

ছেড়ে দিলে কী আর করার: মোস্তাফিজ

ভেনেজুয়েলায় নজিরবিহীন সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে ‘ধরে নিয়ে গেল’ যুক্তরাষ্ট্র

মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ায় শাহরুখ খানের ক্ষমা চাওয়া উচিত: সর্বভারতীয় ইমাম সংগঠনের সভাপতি

মাদুরোকে ধরে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র—নিশ্চিত করল ভেনেজুয়েলা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত