Ajker Patrika

বৃত্তবন্দী রাজনীতি

মযহারুল ইসলাম বাবলা
বৃত্তবন্দী রাজনীতি

পরস্পরবিরোধী পৃথক দুই জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আমাদের এই ভূখণ্ড দুইবার স্বাধীন হয়েছে। একবার ১৯৪৭ সালের মধ্য আগস্টে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদে; দ্বিতীয়বার ১৯৭১ সালের মধ্য ডিসেম্বরে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদে। দুইবারের স্বাধীনতাও এসেছে সম্পূর্ণ বিপরীত উপায়ে। প্রথমটি গোলটেবিল ষড়যন্ত্রে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের দয়া-দাক্ষিণ্যে, অনুগ্রহে। ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের দর্শনে। দ্বিতীয়বার একাত্তরে সশস্ত্র যুদ্ধে প্রতিপক্ষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে। একটি ধর্মীয় বিভাজনে সাম্প্রদায়িক রক্তাক্ত দাঙ্গায়। অপরটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বহু ত্যাগ-আত্মদানে। দুইবারের স্বাধীনতায় মতাদর্শগত পার্থক্য বা বৈপরীত্য জাজ্বল্যমান। অথচ দুইবারের দুই জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা দেশবাসীকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন করেনি, দেয়নি মুক্তিও।

আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ-আত্মত্যাগের দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংকল্পকে ধারণ করে সশস্ত্র যুদ্ধ জয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনের ভিত্তিতে একাত্তরের বিজয়ে আশাবাদী হয়েছিল দেশবাসী। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য, দুইবারের স্বাধীনতায় সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি। পায়নি মুক্তিও। ক্ষমতার হাতবদল ব্যতীত কার্যত কোনো পরিবর্তনই আসেনি। শাসক চরিত্রও সাবেকি আমলের শাসকদের সংস্কৃতিমুক্ত হতে পারেনি। রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন না ঘটায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং পাকিস্তানি সামরিক-স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার আদলে অক্ষুণ্ন রয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে। সাবেকি রাষ্ট্রব্যবস্থা, শাসক চরিত্র কোনোটির বদল ঘটল না; কেবল পৃথক ভূখণ্ড প্রাপ্তি ব্যতীত কোনো প্রত্যাশা পূরণ হলো না।

এ দেশের জনগণ বারবার আন্দোলন-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, পরিবর্তনের আশায়। ত্যাগ স্বীকারের অগণিত নজির স্থাপন করেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। সঠিক অর্থে শাসকশ্রেণি সমষ্টিগত মানুষকে বঞ্চিত করে নিজেদের শ্রেণিস্বার্থকে প্রধান করে শ্রেণিশোষণ অব্যাহত রেখেছে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানও এমনি এমনি ঘটেনি। জনগণের ত্যাগ-আত্মত্যাগে সেই অভ্যুত্থানেও ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটল না। বাস্তবে কেবলই শাসক বদল হলো। ১৯৪৭ ও ১৯৭১-এর অনিবার্য পরিণতি নব্বই-পরবর্তী সময়েও শক্ত-পোক্তভাবে বহাল রয়েছে। দুইবারের স্বাধীনতায়, এমনকি গণ-অভ্যুত্থানে সামরিক স্বৈরাচারের পতনেও দেশে গণতন্ত্রের সুবাতাস বয়নি; বরং ক্রমাগত কর্তৃত্ববাদী শাসন চালু হয়েছে। দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থায় জনগণের ভোট দেওয়ার অধিকারকেই একমাত্র গণতান্ত্রিক অধিকার বলে প্রচারণা করছেন অনেকে; সব মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও সুযোগ উপেক্ষায়। এখন তো ক্ষমতাবদলের ভোটব্যবস্থাও তামাশায় পরিণত। জনগণকে তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে, উদ্দেশ্যমূলক উপায়ে।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু নির্বাচনে তো ব্যবস্থার পরিবর্তনের কোনো অবকাশ নেই। দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় একদল জয়ী হবে, অপর দল হারবে। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে তো হারবে দেশের জনগণ। নির্বাচনে তো জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ অতীতেও হয়নি এবং হওয়ারও নয়। তাই সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি যতই তোলা হোক না কেন, জনগণের প্রত্যাশা নির্বাচন পূরণ করতে পারবে না। এটাই বাস্তবতা।

গণতন্ত্রহীন উন্নয়নে স্বচ্ছতা-জবাবদিহির সুযোগ না থাকায় সর্বত্র ঘটছে রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদের ব্যাপক ও অবাধ লুণ্ঠন। কর্তৃত্ববাদী ব্যক্তি ও দলীয় শাসনের বৃত্তে বন্দী দেশ। সামরিক ও বেসামরিক শাসন-প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে পার্থক্য খুঁজে পাওয়ার অবকাশ নেই। স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির মধ্যে দলীয় নামের ভিন্নতা ব্যতীত রাজনৈতিক-সংস্কৃতিগত কোনোই ভিন্নতা নেই। এযাবৎকালের সব শাসকের দৃষ্টিভঙ্গি এক ও অভিন্ন। রাষ্ট্র বদলে নতুন রাষ্ট্র এল-গেল, এতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটল না। আমরা একই বৃত্তে বৃত্তবন্দী। প্রতিটি পরিবর্তনের বাঁকে স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত হয়েছি। কিন্তু সার্বিকভাবে কোনো অর্জনই ঘটেনি। ঘটেছে অবশ্য তাদেরই, যারা মোট জনসমষ্টির ১ শতাংশ। ওই ১ শতাংশই আমাদের শাসকশ্রেণি। তাদের কর্তৃত্বই রাষ্ট্রে, সরকারে। একমাত্র তাদেরই সর্বাত্মক উন্নতি ঘটেছে। অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশের অবস্থা তথৈবচ।

পরস্পরবিরোধী দুই জাতীয়তাবাদ জনগণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেনি। মুক্তি তো বহু পরের কথা। তাহলে আমাদের উপায়? উপায় অবশ্যই আছে, সেটি সমাজতন্ত্রের পথে। সমাজতন্ত্র একটি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা এবং মুক্তির কোনো বিকল্প পথ নেই। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ব্যতীত আমরা তথাকথিত জাতীয়তাবাদী শোষণ-বঞ্চনার নিষ্ঠুরতা থেকে পরিত্রাণ পাব না।

এযাবৎকালের প্রতিটি শাসকই নিজেদের জাতীয়তাবাদীরূপে আখ্যায়িত করে এসেছে। প্রকৃত জাতীয়তাবাদী মাত্রই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। অথচ আমাদের জাতীয়তাবাদীরা অনিবার্যরূপে সাম্রাজ্যবাদের অনুগত এবং বিশ্ব পুঁজিবাদের দোসর। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক শোষণ প্রবল প্রতাপে বিস্তার লাভ করেছে। পুঁজিবাদ নামের অর্থনৈতিক শোষণে দেশবাসী পিষ্ট হচ্ছে। মানুষের এই চরম দুর্দশায় দেশে পুঁজিবাদবিরোধী জাগরণ এখনো ঘটেনি। সমষ্টিগত মানুষের নিশ্চয় জাগরণ ঘটবে। বিদ্যমান শোষণ-নিপীড়ন, বঞ্চনারও অবসান হবে। ক্ষমতার কেবল হাতবদল নয়, বদল হতে হবে ব্যবস্থার এবং ব্যবস্থা বদলের সঙ্গে সমাজেরও পরিবর্তন ঘটবে। আমরা আর বৃত্তবন্দী থাকব না। বৃত্তটিকেই ভেঙে চুরমার করে দিতে সক্ষম হব। তেমন স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা দেশপ্রেমিক প্রতিটি মানুষেরই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সেই জাগরণ তো সমাজে ঘটছে না। পুঁজিবাদের সুকঠিন থাবার কাছে যেন সবই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। সত্য এই যে আমরা একটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীন। তাই পুঁজিবাদ আমাদের মনোজগতে, চিন্তায়, স্বভাবে পুঁজিবাদী দীক্ষায়, অর্থাৎ ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, মুনাফা ও ভোগবাদিতার অভিমুখে প্রতিনিয়ত ঠেলে দিচ্ছে। সেই স্রোতের বিপরীতে ঘুরে দাঁড়ানোর অত্যাবশ্যক প্রয়োজন ধারণ করতে ব্যর্থ হলে, আমাদের সামগ্রিক পরিবর্তনের উপায় থাকবে না।

স্বীকার করছি আমাদের সামগ্রিক জীবনাচারে অনেক ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটেছে। তবে সে উন্নতি কিন্তু সামাজিক জীবনে বিচ্ছিন্নতা এবং বৈষম্যেরও সৃষ্টি করেছে। ধনবৈষম্য প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে। একশ্রেণির মানুষ ক্ষমতার রাজনীতির বলয়ে অঢেল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছে। অবৈধ অর্থের নিরাপত্তায় এবং ভবিষ্যতের আশঙ্কায় টাকা বিদেশে যেমন পাচার করেছে, তেমনি আবাসনও ক্রয় করে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের শঙ্কায় বিদেশে পাড়ি জমাতে অপেক্ষা করছে। অনেকে পরিবারের সদস্যদের ইতিমধ্যে বিদেশে পাঠিয়েও দিয়েছে। অপর দিকে দেশের সমষ্টিগত মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সংগতি নেই। খাদ্যপণ্যের মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধিতে মানুষ দিশেহারা। অথচ সরকার নির্বিকার, নির্লিপ্ত।

আমাদের এই বৃত্তবন্দী দশা থেকে পরিত্রাণের পথ নির্বাচন নয়, অনিবার্যরূপে সমাজ বিপ্লবে। এটা যেন আমরা ভুলে না যাই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত