Ajker Patrika

একাত্তর এবং ক্রমশ…

শাওন মাহমুদ
একাত্তর এবং ক্রমশ…

একাত্তরের জুলাই মাসের প্রথম দিকেই ছেলেরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অস্ত্র নিয়ে ঢাকায় ফিরতে থাকে। তাদের অনেকের সঙ্গে বাবার যোগাযোগ হয়। প্রথম যোগাযোগ কার সঙ্গে হয়েছিল, তা মা বা মামাদের কারও জানা নেই। সব কথা বলার অভ্যাস ছিল না তাঁর, নিজেকে সামলে নিতে পারতেন। তবে একদিন ভাত খেতে খেতে হঠাৎ করেই মেজ মামাকে বলেছিলেন, ‘ছেলেরা সব এসে গেছে, এইবার অ্যাকশন শুরু হবে।’ মামা বয়সে তরুণ ছিলেন, তাই ঢাকায় বোমা বা গ্রেনেড হামলা হচ্ছে বা ছেলেরা বাইরে থেকে অস্ত্র নিয়ে আসছে, এসব মামার কাছে ছিল স্বপ্নের মতন।

সেদিন রাতেই স্বাধীন বাংলা বেতার আর মুক্তাঞ্চলের কথা শুনতে শুনতে বাবা অত্যন্ত স্থির স্বরে মামাদের বলছিলেন, ‘দে উইল ফাইট, আপনারাও চলে যান।’ 
‘আপনি যাবেন না?’ বলতেই তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি সবকিছু ঠিক করে যাব।’

ক্রমেই ৩৭০ আউটার সার্কুলার রোডে অবস্থিত আমাদের বাড়িটি গেরিলাদের মিলনকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেখানে ঢাকা শহরের একাধিক ছোট ছোট গেরিলা গ্রুপের কেউ কেউ এসে জড়ো হতেন। গ্রুপগুলো যদিও আলাদা আলাদা অ্যাকশনে যেত, কিন্তু নিজেদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা থাকায় তাঁরা ওই বাড়িতে বসে আলাপ করতেন, অ্যাকশনের আগে বা পরে। তাঁদের কেউ কেউ আবার পূর্বপরিচিত ছিলেন। একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতেন। আবার অনেকে নতুন করে একে অপরকে জেনে নিয়েছিলেন। অ্যাকশন সফল হলে তাঁরা এক হয়ে মাঝে মাঝে সেলিব্রেশনও করতেন। এই বেপরোয়া দস্যু ছেলেদের অনেকেরই রাজনৈতিক ধ্যানধারণা তেমন না থাকলেও তাঁরা গাঢ় দেশপ্রেমে মগ্ন ছিলেন। পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রধান অস্ত্র ছিল অদম্য রাগ, উত্তেজনা এবং সাহস। ধীরস্থির আলতাফ মাহমুদ ছিলেন সেই আড্ডাস্থলের প্রাণকেন্দ্র। ছেলেদের গল্প শুনতেন মন দিয়ে। আদর করতেন, শাসন করতেন, পরামর্শ দিতেন সাহস 
ধরে রাখার জন্য।

একাত্তরের জুলাই মাসের একদম প্রথম দিকে মাকে বলেছিলেন, সবাইকে বরিশালে রেখে এসে কাজে যাবেন, সীমান্ত পেরোবেন। সে যাওয়া আর হয়নি। ঢাকা শহরে অস্ত্র হাতে ছেলেরা গেরিলাযুদ্ধ করছেন, পৃথিবীর কাছে তা জানাতে হবে তো। রেডিও-টেলিভিশনে যাওয়া নিষেধ, তাতে কী! মুক্তিযুদ্ধের গান লেখা হচ্ছে, গাওয়া হচ্ছে। সেগুলো স্পুলে করে ওই পারে পাঠাতে হবে। প্রথম স্পুলে মোট ১২টি গান নিয়ে ধরা পড়েছিলেন নাম না-জানা এক কুরিয়ার, তিনি যাত্রাপথে ধরা পড়েন এবং নিহত হন, সেই স্পুলটির কোনো হদিস মেলেনি আর। এটা ছিল এপ্রিল মাসের কথা। এরপরও বাবার থেমে থাকা হয়নি। আব্দুল লতিফ বাড়িতে আসতেন। দুজন মিলে গান লিখতেন, সুর করতেন। সুর দেওয়া হয়ে গেলেই লেখার পাতা ছিঁড়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলতেন। দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরের মধ্যে একাই সুর করতেন মাঝেমধ্যে। গলা ছেড়ে গান গাইতে না পারার কষ্ট তাঁকে চেপে ধরত প্রায়ই। শেষ যে দুটো স্পুল জুলাই মাসে পাঠানো হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে, তার সবই আব্দুল লতিফ আর বাবার লেখা এবং সুর করা। ঢাকায় দুটো স্টুডিও ছিল তখন। বেঙ্গল ও ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট স্টুডিও। বাবা নিজের গাড়িতে করে যন্ত্রশিল্পীদের জোগাড় করতেন। একটা রিহার্সাল এবং এক টেকে গান রেকর্ডিং। সবচেয়ে কাছের যন্ত্রী ছিলেন হাফিজ এবং রাজা হুসেন খান। এক জায়গায় সবাইকে জড়ো করে গান শিখিয়ে রেকর্ড সারতেন। চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালকের ডান্ডি কার্ড ছিল, তাই রাতবিরাতে গাড়ি নিয়ে আসা-যাওয়ায় সমস্যা কম হতো। স্পুল দুটো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পৌঁছেছিল অনেক দেরিতে, সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি। তাঁর কাজ ছিল, অনেক কাজ। তাই বাবা থেকে গিয়েছিলেন, কণ্ঠে সুর আর সাহসের বরপুত্র হয়ে, বাড়িভর্তি অস্ত্র নিয়ে।

সে সময়ে বাবা অনেককেই খুব নীরবে মেলাঘর ক্যাম্পে পাঠিয়েছিলেন। খালেদ মোশাররফের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বিভিন্ন মাধ্যমে। কলা বা সবজি বিক্রেতা বেশে চিরকুট আদান-প্রদান করতে আসতেন দুজন; বিশেষ করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়িতদের মেলাঘর পাঠানোর অনুরোধ আসত। মেজো মামা আর মেজো খালাকে মেলাঘর পাঠিয়ে দিয়েছিলেন জুলাই মাসে। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে লন্ডন থেকে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, জহির রায়হানকে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন বাবাকে লন্ডন যেতে রাজি করানোর জন্য। বাবা রাজি হননি। জহির রায়হান অনেক জোর করেছিলেন সেদিন, ‘লন্ডন না হোক মেলাঘর চলেন।’ উত্তর এসেছিল, ‘যাব, কিছুদিন পর, কাজ বাকি আছে। আপনারা চলে যান, আমি দিন সাতেকের মধ্যেই আসছি।’ আগস্টের প্রথম দিক থেকে ক্র্যাক প্লাটুনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। কাজ বেড়ে গিয়েছিল তাই।

ক্র্যাক প্লাটুনের আগস্ট অ্যাকশনের বেশ কিছু অস্ত্র, গ্রেনেডভর্তি দুটো ট্রাংক বেঁচে গিয়েছিল। পরের অ্যাকশনে প্রয়োজন হবে, লুকিয়ে রাখার জন্য তাই ৩৭০ আউটার সার্কুলার রোডের কাঁঠালগাছের নিচে গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়েছিল সেগুলো। যুদ্ধ এক অবাক বিস্ময়মাখা গল্প ভর্তি ঝাঁপি নিয়ে তৈরি। কঠিন সাহস, বীরত্ব আর ঐক্যতার গল্পের মাঝেও প্রতারক, হন্তারক আর শত্রুর গল্পও বাদ যায় না। গেরিলাদের মাঝেও লুকিয়ে থাকা প্রতারক একাত্তরের গল্প ঝাঁপিতে বিষের ডালা নিয়ে লকলকিয়ে ছোবল মেরেছিল ঠিকই।

৩০ আগস্ট ১৯৭১, ভোরে বাবা ধরা পড়েন, প্রতারক বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছিল। বলেও দিয়েছিল অস্ত্রভর্তি দুটো ট্রাংকের কথা। এমনকি কোথায় লুকানো রয়েছে তা-ও। একাত্তরের দুর্গবাড়ি নামে পরিচিত, গেরিলাদের ক্যাম্প ৩৭০ আউটার সার্কুলার রোড থেকেই তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তাঁর সঙ্গে ধরা পড়লেন তরুণ শিল্পী আবুল বারাক আলভী, তিনি মেলাঘর যাওয়ার জন্য সেই রাতে দুর্গতে অবস্থান নিয়েছিলেন। চার মামা, প্রতিবেশী তিনজনসহ তিনটি জিপে করে তাদের নিয়ে গিয়েছিল। বাবাকে দিয়েই মাটি খুঁড়ে ট্রাংক দুটো বের করেছিল

ওরা। একা কষ্ট হচ্ছিল বলে সেখানেই বেয়নেট চার্জ করেছিল এক সেনা। বাবার কপালের চামড়া ঝুলে পড়েছিল, ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হচ্ছিল।
৩১ আগস্ট আবারও এসেছিল এক জিপ ভর্তি পাকিস্তানি আর্মি। যেহেতু বাবার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের করতে পারছিল না ওরা, সেহেতু পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে মেলাঘর বা অ্যাকশনের প্রমাণ খুঁজেছিল। লন্ডভন্ড করে রেখে গিয়েছিল বাবার ঘরের সব জিনিস। রেকর্ড, ডায়েরি, স্পুল—কিছুই নষ্ট করতে বাকি রাখেনি।

১ সেপ্টেম্বর বাবা ছাড়া আলভী এবং মামাদের সবাই মুক্তি পেয়েছিলেন। ঢাকার ছেলেদের মধ্যে গেরিলা খ্যাতদের বাবার সঙ্গে ধরে রাখে পাকিস্তানি আর্মিরা। রাতে রমনা থানায় রাখা হতো আর দিনে নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলের টর্চার সেলে আনত। আলতাফ মাহমুদসহ বাকি গেরিলাদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বেশি ছিল। আর একটা নাম বলার জন্য অকথ্য অত্যাচার করা হয়েছিল তাঁদের সবার ওপরে। ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত দেহগুলোকে আর কেউ দেখেনি সেই দিনের পর থেকে। ২৯, ৩০, ৩১ আগস্ট ঢাকার ছেলে রুমী, আজাদ, বকর, জুয়েল, বদী, হাফিজ ও আলতাফ মাহমুদকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অক্টোবরে খবর এসেছিল সেন্ট্রাল জেলে গেলে আসামিদের সঙ্গে দেখা করতে দেয়। মা এবং নানিকে নিয়ে শহীদজননী জাহানারা ইমাম দিনের পর দিন সেখানে গেছেন, ভেতর থেকে খবর এসেছে—এমন নামের কেউ এখানে নেই।

অন্যদিকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নাখালপাড়ায় এন্ট্রি আছে, এক্সিটে তাঁদের নাম নেই। ১৬ ডিসেম্বর রাত থেকে তন্ন তন্ন করে ঢাকার সব ধরনের হাসপাতাল, ক্যাম্প, টর্চার সেল, বাংকারসহ কিছুই খোঁজা বাদ রাখা হয়নি। তাঁরা সাতজন বাংলার বাতাসের সঙ্গে মিশে দূরে কোথাও ভেসে গিয়েছিল যেন। এই খোঁজার পালা বাহাত্তর সাল পর্যন্ত কুমিল্লা, সিলেট বা ত্রিপুরা পর্যন্ত ব্যাপ্ত ছিল।

ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, উনিশ বছরের চেয়েও বেশি সেই রক্তাক্ত পথযাত্রা। সেই কঠিন পথে আলতাফ মাহমুদ হেঁটেই চলেছেন। অথচ সেই সময়কার আইয়ুব-মোনায়েম শাসনামলে বাংলাদেশকেন্দ্রিক দেশাত্মবোধক বা গণসংগীত পরিবেশন শাসক মহলে গর্হিত বা একধরনের দেশদ্রোহের শামিল বলে মনে করা হতো।

আলতাফ মাহমুদ থেমে থাকেননি। তাঁর সুর বেজেই চলেছে সময়ের হাত ধরে। শত্রুকে মোকাবিলা করার জন্য তাঁর প্রধান অস্ত্র ছিল সুর। দীর্ঘদেহী গাঢ় গায়ের রঙে, ঝাঁকড়া কেশ দুলিয়ে তিনি যুদ্ধ করে গেছেন রাজপথ, জনপদে। হাতিয়ার ছিল তাঁর কণ্ঠ, সুর আর গান। সংগীতকে বিপ্লবের আরেকটি নাম দিয়েছিলেন আলতাফ মাহমুদ। কখনো গলায় গামছা দিয়ে ঝোলানো হারমোনিয়ামের রিডের সুরে, পিচঢালা তপ্ত রাজপথে, শহীদ মিনারের পাদদেশে, পল্টন ময়দানে প্রতিবছরের একুশের অনুষ্ঠানসহ সব ধরনের অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তার একজন ছিলেন তিনি। এমনকি অনেকেরই অজানা যে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধের প্রতিবাদে বা ১৯৭০ সালে লেনিনের জন্মশতবার্ষিকী স্মরণে তাঁকে দেখা গেছে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো। তিনি প্রমাণ করেছিলেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত না হলে রাজনৈতিক আন্দোলনের দাবি সফলতার মুখ দেখতে পায় না। বিপ্লবেও সুর থাকতে হয়, লয় এবং তাল থাকতে হয়।

তিরিশ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত জন্ম নেওয়া স্বাধীন ভূমি বাংলাদেশে কৃষক জমিতে লাঙল দিতে ভয় পেতেন। মাটি খুঁড়লেই কঙ্কাল বের হয়ে আসত। জেলেরা নদী-নালায় জাল ফেলতে শঙ্কিত হতেন। মাছের বদলে জলে ভেসে আসত লাশ। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলজুড়ে বধ্যভূমিতে সম্ভ্রম হারানো বীরাঙ্গনাদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস হয়ে এসেছিল ভারী। বাবাও হারিয়ে গিয়েছিলেন এই বাংলাদেশেই। মৃত্যু দিনহীন, কবরহীন আলতাফ মাহমুদ সুর হয়ে স্বাধীন ভূমিতে ভেসে বেড়ান, এ দেশের মানুষের ভাষার চেতনায় উজ্জীবিত অশ্রুজলের ধারায় গড়িয়ে পড়েন। পুরো দেশটাই আমার কাছে বাবা হয়ে গঠিত হয়, ক্রমশ…

লেখক: শহীদ আলতাফ মাহমুদের কন্যা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত