এখন কার্তিকে বন্যা হয়, চৈত্র মাসেও মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়, পাহাড়ি ঢল নামে, অকালবন্যা হয়। সারা পৃথিবীতে কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে। এই লড়াইয়ের জন্য আধুনিক ও টেকসই কৃষিনীতিতে আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে কর্মসূচি নির্ধারণ করা হচ্ছে। আমাদেরও এসব পরিকল্পনা গ্রহণ করা আছে। কিন্তু সময়মতো কাজ শুরু ও বাস্তবায়নে অবহেলার জন্য প্রতিবছর হাওরে এবং সীমান্তবর্তী নদীগুলোর নিচু জমিতে উঠতি ফসল ডুবে প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের সর্বস্বান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে চলেছে।
এ বছর চৈত্র মাসে প্রায় সারা দেশে বৃষ্টিপাত হয়েছে। দেশের বাইরে উজানের দেশে পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপক বৃষ্টির কারণে অতিরিক্ত পানির ঢল নেমে কাঁচা বোরা ধান কোমরপানিতে ডুবে পচে গেছে। কাঁচা, পচা ধানগাছ কেটে নৌকায় ভরে ঘরে আনছেন কৃষক, গবাদিপশুকে খাওয়ানোর আশায়। সুনামগঞ্জের হাজার হাজার একর বোরা ধান থইথই পানির নিচে। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ প্রভৃতি জেলায় এক সপ্তাহে ঢলের পানির তোড়ে চার উপজেলার নয়টি বাঁধ ভেঙে গেছে। বোরো ধানের মৌসুম শুরু হওয়ার আগে কাঁচা ধানের খেত পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে।
গত শনিবারেও সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের পাটলী ইউনিয়নের আসামপুরে নলজুর নদীর পাড় উপচে পানি ঢুকেছে হাওরে। ফলে তলিয়ে যায় আধা পাকা ধান। হাওরের বেশির ভাগ এলাকায় এখনো বোরো ধান কাটা শেষ হয়নি। এর মধ্যেই বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরগুলোতে পানি বাড়ছে।
সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ছাড়াও সীমান্তের জেলা লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামেও প্রতিবছর ঘটে একই ঘটনা। তিস্তা ও ধরলা নদীর চরাঞ্চলে হঠাৎ বন্যার প্রকোপ দেখা দেয়। উজানে প্রবল বৃষ্টিপাত হলে তার আগাম তথ্য বাংলাদেশের আবহাওয়াবিদদের সংগ্রহে থাকে না। থাকলেও কৃষকদের কাছে সেসব তথ্যের সতর্কবাণী পৌঁছানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। তিস্তার চরে পেঁয়াজ, রসুন, মিষ্টিকুমড়া, চিনাবাদাম, মিষ্টি আলু সবকিছুই হঠাৎ ‘ফ্লাশফ্লাড’-এর তোড়ে তলিয়ে গেছে। কারণ সীমান্তের ওপারের বাঁধগুলোর সব গেট একসঙ্গে খুলে দেওয়া হয়েছে। সেই পানির উচ্চ চাপ সামলাতে না পেরে আমাদের ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজের সব গেট খুল দেওয়ায় ৩০০ কিমি এলাকার গোটা চরাঞ্চল পানিতে ডুবে গেছে। অপুষ্ট পেঁয়াজ, রসুন ও সবজি পচে গেছে। কেউ কেউ পানিতে নেমে ডুবন্ত ফসল তোলার প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন।
আর এক-দুই সপ্তাহ পার হলে কাঁচা ধান পেকে যেত। কিছুদিন পর তিস্তার চরের বড় বড় বিখ্যাত মিষ্টিকুমড়া, মিষ্টি আলু, চিনাবাদাম ঘরে তুলতে পারতেন প্রান্তিক কৃষকেরা। কিন্তু এবারের চৈত্রে হঠাৎ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে তাঁদের স্বপ্ন। সবকিছু হারিয়ে তাঁরা অনেকেই নির্বাক হয়ে গেছেন। অনেকের বুকফাটা আর্তনাদ ও কান্নায় হাওরের বাতাস ভারী হলেও তাঁরা সবাই মিলে বাঁধ রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেও ভাঙন ঠেকাতে না পেরে অসহায়ের মতো চেয়ে দেখছেন বাঁধভাঙা স্রোতের তাণ্ডব।
প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা অনেকেই মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন ও কৃষিঋণ নিয়েছেন। তাঁরা হতাশায় ভুগছেন—কীভাবে ঋণের টাকা শোধ দেবেন সেই আশঙ্কায়। একদিকে ঋণ শোধের চিন্তা, অন্যদিকে সামনের দিনগুলাতে কী খেয়ে দিনাতিপাত করবেন ও পরিবারের চাহিদা মেটাবেন—সেটা এখন তাঁদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
হাওর বাঁচাতে সরকারের উদ্যোগ আছে, কিন্তু তা কঠোর নয়। প্রতিবছর বাঁধ মেরামত বা সংস্কার ও নতুন বাঁধ নির্মাণের জন্য বড় অঙ্কের টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে। গত বছর ৬২১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ফসল রক্ষা হয়নি। কারণ, সময়মতো কাজ শেষ হয়নি। কাজের সুষ্ঠু মনিটরিং হয়নি। যেটুকু কাজ হয়েছিল তা সাময়িক ও দুর্বল। ফলে প্রচণ্ড পানির তোড়ে শেষরক্ষা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবছর বর্ষা শুরু হলে বিপদের আশঙ্কায় অসহায় মানুষ বাঁশ গেড়ে, কাদামাটির ডালি নিয়ে অসহায়ের মতো বাঁধ রক্ষার্থে ছোটাছুটি শুরু করেন। কিষানিরা দল বেঁধে তাঁদের সহায়তা করতে এসে কিছু না পেরে আর্তনাদ করতে থাকেন। এ দৃশ্য কি আমরা প্রতিবছর বোরো মৌসুমে টিভিতে করুণভাবে প্রত্যক্ষ করে যেতেই থাকব?
এ জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কথা উঠেছে। কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি স্থানীয়দের।
হাওরের সোনার ফসল যেহেতু আমাদের খাদ্যের বিরাট অংশের জোগান দেয়, সেহেতু এই সোনার ফসল রক্ষার জন্য স্থায়ী ও টেকসই পরিকল্পনা নিয়ে নেমে পড়া প্রয়োজন। একটি সুদূরপ্রসারী মজবুত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে পারলে হাওরের মানুষের ফি বছর পুনঃপুন কান্না থামানো যেতে পারে।
উপমহাদেশের ভাটিতে অবস্থান করায় উজানের পানির তোড় সামাল দেওয়া আমাদের নিয়তি। বন্যা, অকালবন্যা, ‘ফ্লাশফ্লাড’ ইত্যাদি প্রতিরোধের জন্য আমাদের আগাম সতর্কবার্তা নিয়ে কৃষি পরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে হবে; বিশেষ করে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত নদীগুলোর ব্যাপারে ডেলটা প্ল্যানে অতি জরুরি ভিত্তিতে খরা মৌসুমে সেচ ও হঠাৎ পাহাড়ি ঢলের নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ ধারা ও সতর্কতা সংযুক্ত করতে হবে। ডেলটা প্ল্যানে ‘তিস্তা রিস্টোরেশন প্রকল্প’ এবং হাওর বাঁচাও প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, তা দ্রুত খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ, ভাবতে হবে কৃষির উন্নয়নই আমাদের প্রকৃত উন্নয়ন।
প্রতিবছর কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমাদের কর্তৃপক্ষের তোড়জোড় শুরু হয়। কিন্তু আমরা সময় থাকতে সেসব ব্যবস্থা নিতে ঢিলেমি করি কেন? সরকারি সম্পদের অপচয় রোধ করতে সময়ের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাপ্ত করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। সেটা করতে না পারায় দেশের অন্যান্য প্রকল্পের মতো দুর্নীতির বেড়াজালে বন্দী হয়ে থাকবে হাওরের সর্বস্বান্ত প্রান্তিক চাষিদের ফি বছরের বোবা কান্না। এ অবস্থার দ্রুত নিরসন হওয়া প্রয়োজন।
ড. মো. ফখরুল ইসলাম, অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়










