Ajker Patrika

উৎসবের রঙে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ

সঙ্গীতা ইমাম
আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২১, ১০: ৪০
উৎসবের রঙে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ

বাংলাদেশের কত উপমা—ষড়্ঋতুর দেশ, উৎসবের দেশ, পার্বণের দেশ। এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী আবহমান কাল ধরেই বিভিন্ন উৎসবের আবহে তৈরি করেছে তার সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক পরিচিতি, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে নিজেদের মধ্যে তৈরি করেছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীনির্বিশেষে মানুষের সহাবস্থান। এই ভূখণ্ডের ন্যায়নিষ্ঠ নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গেও তাই যুক্ত থেকেছে উৎসবের রং আর চেতনা।

আবার কোনো কোনো সাংস্কৃতিক উৎসবের শুরুই তো হয়েছিল আন্দোলনের হাত ধরে। তাই উৎসবকে বাদ দিয়ে বাংলার সংস্কৃতিকে যেমন ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, তেমনি এ দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসও উৎসবের চেতনারহিত নয়। এ দেশে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক আন্দোলন; শুধু তা-ই নয়, সংস্কৃতি এ অঞ্চলের মানুষের চেতনায় রাজনৈতিক বোধ নির্মাণ করেছে। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘সংস্কৃতি সোনার মানুষ তৈরি করতে পারে আর রাজনীতি সেই সোনার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে গড়তে পারে সোনার স্বদেশ।’

এ কারণেই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের শুরু থেকে আমরা দেখেছি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রাজনীতির পাশাপাশি এ দেশে বসবাসরত মানুষের সাংস্কৃতিক শক্তিকেও আক্রমণ করেছে। দেশভাগের আগে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার এ দেশের সহাবস্থানের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ধর্ম ও জাতিগত সংঘাতের ষড়যন্ত্র চালিয়েছে। সব ক্ষেত্রে যে তারা বিফল হয়েছে, এ কথা বলা যায় না বটে; কিন্তু এটাও ঠিক, তাদের সাময়িক সফলতা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেনি। মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬১ সালের রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ পালন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি পর্যায়েই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন হাত ধরাধরি করে পথ নির্মাণ করেছে।

জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বকে কবর দিয়ে বাংলার মানুষ রচনা করেছিল তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির ইশতেহার। এ কারণেই বাংলার মুক্তিসংগ্রামকে বুঝতে হলে প্রতিবাদী রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের ইতিহাস বুঝতে হয়, জানতে হয় ছায়ানট, ক্রান্তি, সৃজনী বা উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। আমাদের দেখতে হয়, কীভাবে সে সময়ের ইত্তেফাক বা সংবাদ এ ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ঐক্যকে লালন করেছিল মুক্তিসংগ্রামের পথরেখা নির্মাণে। মানুষের মনন গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে খুঁজে দেখতে হয়, সে সময়ের চলচ্চিত্র, নাট্য আন্দোলন ও যাত্রাশিল্পের ইতিহাস। এই সংস্কৃতিচর্চার ইতিহাসকে রুদ্ধ করতে তখনো উদ্ধত ছিল বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক অপগোষ্ঠী। কিন্তু তাদের সব ষড়যন্ত্র ঠেকিয়ে শিল্পী-সাংবাদিক-লেখক-বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ একটি জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে।

স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের প্রতিটি পর্যায় আমরা কমবেশি জানি। নানাভাবে ইতিহাস বিকৃত করা হলেও আজকের প্রজন্ম কমবেশি মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। পাঠ্যপুস্তক, বিভিন্ন বইপত্র, নাটক, চলচ্চিত্র, সংগীত ছাড়াও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলোয়ও বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। ফলে গত এক দশকের বিচারে, বর্তমানে ইতিহাস জানার সুযোগ কম, এ কথাটি অন্তত বলা যাবে না। কিন্তু এই ইতিহাস আমাদের নতুন প্রজন্ম জানছেন বটে; কিন্তু তা হৃদয়ঙ্গম করছেন কি? এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ, ইতিহাস তো শুধু বইয়ের মলাটের বিষয় নয়, তার ব্যাপ্তিকে ধারণ করতে হয় সৃজনশীলতার প্রতিটি পর্যায়ে, জীবনের প্রায় সবকটি অনুষঙ্গে। ফলে প্রকল্পভিত্তিক ইতিহাসচর্চা বাড়লেও জীবনবোধের যে বিকাশ সেটি ঘটছে না। আমার মনে হয়, এর মূল কারণটি হচ্ছে—আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইতিহাসচর্চা হয়ে গেছে সংস্কৃতিবিবর্জিত। ফলে ইতিহাসের অর্ধাংশ প্রতিফলিত হচ্ছে; কিন্তু তার প্রভাব পড়ছে না মানুষের মননে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস বা জঙ্গি হামলাগুলো নিয়ে যখন আলোচনা করা হয়, তখন আলোচকেরা বারবারই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা বলেন। তাঁদের এই কথা নিঃসন্দেহে সঠিক। কারণ, রাজনীতি রাষ্ট্রের আইনব্যবস্থার বদল ঘটাতে পারে; কিন্তু মনোজগতের বদল ঘটাতে হলে প্রয়োজন সংস্কৃতি। আবার রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে আলাদাভাবে দেখলে এই সংকট কোনো দিন সমাধান হওয়ার নয়। যেমন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলেও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নির্মূল করা যায়নি। কারণ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির পথ এখন দুটি দিকে গেছে বেঁকে। এই বিচ্ছেদে রাজনীতি ও সংস্কৃতি দুটোই একা হয়ে পড়েছে, অর্থাৎ তাদের নিজস্ব শক্তিও কমে এসেছে।

উল্টো দিকে আমরা যদি বাংলাদেশের পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে মৌলবাদের উত্থানপর্বটি দেখি, তাহলে পরিষ্কার দেখা যায়, মৌলবাদ প্রথমেই আক্রমণ করেছে সংস্কৃতিকে। পঁচাত্তরের পর সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ স্তম্ভদ্বয়ের অপসারণ তো শুধু রাজনৈতিক আঘাত ছিল না, এর একটি সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও আছে। সে সময় থেকেই বাংলাদেশের যাত্রাশিল্পকে বিতর্কিত করার একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র শুরু হয় এবং তার এক দশকের মধ্যেই আমাদের যাত্রাশিল্প ও শিল্পীবৃন্দ প্রায় প্রান্তিক হয়ে পড়েন। আশির দশকের শেষ দিকে আমাদের সাংস্কৃতিক জগতে বিশ্বায়নের প্রভাবটির কথা যদি আপাতত ঊহ্যও রাখি, তারপরও কি এ কথা অস্বীকার করা যাবে যে, ধর্মকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে এ দেশের লোকসংস্কৃতিকে বারবার আক্রমণ করেছিল সাম্প্রদায়িক অপগোষ্ঠী। সে আক্রমণ কিন্তু আজও বন্ধ হয়নি। ১৯৯৯ কি ২০০৫ সালে উদীচীর ওপর বোমা হামলা কিংবা ২০০১ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা বা বিভিন্ন সময় অসংখ্য সংস্কৃতিকর্মী হত্যা করাই মৌলবাদীদের একমাত্র আক্রমণ ছিল না।

একই সঙ্গে তারা মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণও করেছে। পয়লা বৈশাখ, বর্ষা উৎসব, নবান্ন উৎসব বা বসন্তবরণ থেকে শুরু করে বাংলার মানুষের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোকে তারা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। এসব এক দিনের ষড়যন্ত্র নয়, দিনের পর দিন তাদের এসব অপকর্মকে আমরা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে দেখেছি, আইনগত ব্যবস্থাও নিইনি; ফলে আজ এগুলো একেকটি বিষবৃক্ষের আকার ধারণ করেছে। ফলে চাইলেই এখন বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তে নাট্যোৎসব বা চলচ্চিত্র উৎসব করা যায় না। সংগঠনগুলোর ইচ্ছে থাকলেও দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আবৃত্তি উৎসব করা যায় না। সবকিছুর জন্য প্রশাসনের অনুমতি লাগে, তাতে সংস্কৃতিকর্মীদের কোনো আপত্তি নেই; কিন্তু প্রশাসন কি আমাদের ঠিকঠাক অনুমতি দেয়? নানা শর্তের বেড়াজালে ঘড়ি ধরে অনুমতি নিয়ে তো আর সাংস্কৃতিক বিপ্লব করা যায় না। পয়লা বৈশাখের মতো সর্বজনীন উৎসবই এখন ঘড়ির কাঁটা ধরে করতে হচ্ছে আমাদের। এভাবে উৎসব পালন করা হয় বটে; কিন্তু সে রং তো আমাদের মর্মে লাগে না।

দিনকে দিন সংস্কৃতিচর্চার পরিসর ছোট হয়ে আসার খেসারত কিন্তু রাজনীতিকেও দিতে হচ্ছে। সরকারদলীয় বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের জন্য সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার জন্য বহিষ্কার করতে হয়, তখন আমরা টের পাই, সংকট কতখানি গভীরে। বহিষ্কার করে তো শুধু দলীয় দায় এড়ানো সম্ভব; কিন্তু বহিষ্কৃত ব্যক্তিটি তো এই বাংলাদেশেরই নাগরিক। তার তো আর দলের অভাব হবে না। স্থানীয় পর্যায়ের মানুষকে একতরফাভাবে বিভ্রান্ত করার সুযোগ তো তার রয়েই গেল। এ জন্য সরকারের কাছে আমাদের দাবি, সংস্কৃতিচর্চার পরিসরটাকে আইনকানুনের দোহাই দিয়ে ছোট করে ফেলবেন না। গত দু-বছরে এই করোনা মহামারিকালেও বাংলাদেশে যেভাবে ওয়াজের নামে নানাবিধ অপপ্রচার চালানো হয়েছে, সে ক্ষেত্রে কিন্তু আইনের প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই না। বাউল রিতা দেওয়ান, শরিয়ত বয়াতি কিংবা মেঘদলের বিষয়ে আইন যতটা তৎপর হয়, ততটা তৎপরতা কিন্তু থাকে না ইউটিউব বা ফেসবুকে প্রকাশিত বিভিন্ন বিতর্কিত ওয়াজ-বক্তাদের বিষয়ে। এই স্খলন কিন্তু ইতিহাস ঠিক মনে রাখবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত