Ajker Patrika

সত্যেন-রণেশের আঁকা পদচিহ্ন...

সঙ্গীতা ইমাম
আপডেট : ০২ জুন ২০২২, ১০: ১৭
সত্যেন-রণেশের আঁকা পদচিহ্ন...

১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর সাংস্কৃতিক জাগরণের মাধ্যমে মানুষের মুক্তির সংগ্রামে শামিল হয়ে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের প্রত্যয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। সত্যেন সেন উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

মানবিক ও সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে সত্যেন সেন ১৯৪৬ সালে গঠন করেন কবিয়াল দল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ১৯৪৯ পর্যন্ত আত্মগোপনে থাকেন এই মহান বিপ্লবী। এরপর ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত কারান্তরালে থাকতে বাধ্য হন শিল্পী ও সাহিত্যিক সত্যেন সেন। তবে এত নির্যাতনের মধ্যেও কৃষকদের মধ্যে অবিরত কাজ করে গেছেন তিনি। কৃষক আর মেহনতি মানুষের সঙ্গে কাজ করতে করতেই তিনি অনুধাবন করেছিলেন, বক্তৃতার চেয়ে গান দিয়েই মানুষকে বেশি উদ্বুদ্ধ করা যায়। তাই ১৯৫৬ সালে ‘ঢাকা জেলা কৃষক সম্মেলন’-এর পর সত্যেন সেন এমন একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন তৈরির তাগিদ হৃদয়ে লালন করেন, যে সংগঠন গান, নাটকের মধ্য দিয়ে সমাজ ও সংস্কৃতি বদলের আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

১৯৫৮ সালে তিনি একটি গানের দল তৈরি করেন। এই দল তৈরির পরপরই সত্যেন সেন বেশ কয়েক বছর কারারুদ্ধ থাকলেও শক্ত হাতে হাল ধরে তাঁর তৈরি এ দলটির কর্মকাণ্ড টিকিয়ে রাখেন গোলাম মোহাম্মদ ইদু ও সাইদুর রহমান।

১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত এ নামহীন দলটি বিভিন্ন কৃষক সমাবেশে ও শ্রমিক জমায়েতে গান গেয়েছে, যার বেশির ভাগই ছিল বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের গান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের দেশপর্যায়ের গান, ভারতীয় গণনাট্য সংঘের তৎকালীন প্রচলিত কিছু গণসংগীত এবং সত্যেন সেনের নিজের লেখা ও সুর করা গান। ১৯৬৫-৬৭ সালে এর সঙ্গে যুক্ত হন আরও অনেকেই। সংস্কৃতিকে মানব মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আদর্শিক সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন তাঁরা।

পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে যখন বাংলার আপামর মানুষ ফুঁসে উঠছিল, একটি কালজয়ী গণ-অভ্যুত্থান যখন বাঙালির দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তেমন একটি সময়ে ঢাকা তথা গোটা বঙ্গদেশের গণসংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ ও বিশিষ্ট সাংবাদিক ঔপন্যাসিক সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লা কায়সারের মতো প্রগতিশীল শিল্পী-সংগ্রামীদের নেতৃত্বে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।

প্রথম উদীচীর যে আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়, তার আহ্বায়ক ছিলেন কামরুল আহসান খান। আর সদস্য ছিলেন সত্যেন সেন, গোলাম মোহাম্মদ ইদু, মোস্তফা ওয়াহিদ খান, ইকরাম আহমেদ, আখতার হুসেন, রাজিয়া বেগম, মঞ্জুর মোরশেদ প্রমুখ। এ ছাড়া ছিলেন ইকবাল আহমেদ, মাহফুজ আলী মল্লিক, তাজিম সুলতানা প্রমুখ।

রাজনৈতিক নানা ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি দেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে, মানবিক বিপর্যয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে উদীচী। মুক্তিসংগ্রামে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে ছায়ানট, ক্রান্তি, সৃজনীর সঙ্গে উদীচীর ভূমিকাও অনস্বীকার্য।

স্বাধীন দেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের এবং ৩ নভেম্বর কারাগারে জাতীয় চার নেতার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সমগ্র জাতি যেন স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সব কর্মকাণ্ডই মুখ থুবড়ে পড়েছিল। কিন্তু আদর্শের পরাজয় হয় না কোনো দিন। উদীচীর শিল্পীকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের আদর্শকে বুকে নিয়েই নিজেদের সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিলেন সেদিন।

উদীচী একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন কেবল নয়, উদীচী একটি আন্দোলন, একটি চেতনার নাম। যে চেতনার মর্মমূলে মানুষ আর যে আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই মানুষের জন্য একটি মানবিক সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা। তাই কেবল সংস্কৃতিচর্চার মধ্যেই উদীচী নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি; একদিকে যেমন গণমানুষের সংস্কৃতিচর্চার পথ নির্মাণ ও নির্দেশ করেছে, অন্যদিকে গণমানুষের জীবনবোধ ও অধিকার আদায়ের রাজনৈতিক সংগ্রামেও নেতৃত্ব দিয়েছে। ফলে বারবারই উদীচীর ওপর আক্রমণ করেছে মৌলবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, বাংলাদেশবিরোধী অপশক্তির দানব থাবা।

১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোর টাউন হল মাঠে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের শেষ দিনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা হামলা করা হয়। ধর্মীয় উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠী ২০০৫ সালের ৮ ডিসেম্বর নেত্রকোনা শহরের অজহর রোডে উদীচী কার্যালয়ে বোমা হামলা করে। কিন্তু উদীচীর শিল্পীকর্মীরা কখনোই তাঁদের আদর্শিক লড়াই থেকে সরে আসেননি। শহীদ সহযোদ্ধাদের ত্যাগের বেদি স্পর্শ করে আদর্শের লড়াই অব্যাহত রাখার দৃপ্ত শপথ নিয়েছেন বারবার, এগিয়ে চলছেন মুক্তিযুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা প্রতিটি আন্দোলনে উদীচী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

২০১৩ সালের ১২ থেকে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত চিহ্নিত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং জামায়াত-শিবিরসহ সব ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে সপ্তাহব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।

একই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা শাহবাগ আন্দোলনে উদীচীর শিল্পীকর্মীরা সর্বাত্মক অংশগ্রহণ করেছেন। একের পর এক ব্লগার, লেখক, প্রকাশকসহ মুক্তচিন্তার মানুষদের হত্যার মধ্য দিয়ে সারা দেশে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো, উদীচী তার প্রতিবাদে সব সময় রাজপথে থেকেছে কণ্ঠে স্লোগান আর গণসংগীত নিয়ে।

উদীচীর ২২তম জাতীয় সম্মেলনের স্লোগান, ‘শ্রেণিভেদ ভাঙি শোষিতের রোষে/ সম্প্রীতির মালা গাঁথি ভেদাভেদ নাশে’। এটি কেবল উদীচীর সম্মেলনের স্লোগানই নয়, এটিই বর্তমান সময়ে জনতার লড়াইয়ের মূলমন্ত্র। আজ থেকে রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া তিন দিনব্যাপী জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন সম্প্রতি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের শিকার বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল।

বর্তমানে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার যে পাকে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ, তা থেকে উদ্ধারে যূথবদ্ধ সাংস্কৃতিক আন্দোলন অনস্বীকার্য। সে ব্রতকে সামনে রেখেই উদীচীর এবারের জাতীয় সম্মেলন। গণমানুষের সাংস্কৃতিক ঐক্যের ভিত্তিতেই নির্মিত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। আদর্শিক এ ঐক্যের প্রয়াসই উদীচীর এবারের সম্মেলনের মূল ব্রত। জয় উদীচী।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত