Ajker Patrika

ক্ষুধার্ত মানুষ বাঘের গায়ে কামড় বসাতে পারে

মইনুল হাসান 
আপডেট : ২৩ মে ২০২২, ০৯: ৩৩
ক্ষুধার্ত মানুষ বাঘের গায়ে কামড় বসাতে পারে

শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় কোষাগার প্রায় শূন্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তীব্র অভাব। দুর্ভিক্ষের কালো ছায়া ঢেকে দিচ্ছে সব আশার আলো। বিপন্ন, অসহায় মানুষ উদভ্রান্তের মতো দিগ্‌বিদিক ছুটছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের খোঁজে। জ্বালানির অভাবে স্থবির হয়ে যাচ্ছে উচ্ছল, চলমান জনজীবন। হাসপাতালে জটিল অস্ত্রোপচারের সময় নিভে যাচ্ছে আলো আর জীবন—দেশজুড়ে ভয়ংকর ব্ল্যাকআউট!

দ্বীপরাষ্ট্রটির শান্ত মানুষেরা ভীষণ রকম খেপে উঠেছে। হাজার হাজার ক্ষুধার্ত, কর্মহীন বিক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়েছে ক্ষমতাসীনদের কারও কারও গাড়ি, বাড়ি-ঘর আর আস্তানা। হামলায় মৃত্যুর মতো দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে। দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা, কারফিউ জারি করেও ক্ষুধার্ত জনগণকে বাগে আনা যাচ্ছে না। মনের আগুন সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী আর ক্ষমতাসীন সরকারদলীয় বাহিনী দিয়ে তাঁদের মোটেই দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না। চারদিকে শুধু হাহাকার। কেন পুরো একটি দেশ দুরবস্থার এমন চরমে পৌঁছে গেল?

দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ আর বর্তমানে রাজাপক্ষে পরিবারের গোষ্ঠীতন্ত্র, অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত, ভুলনীতি, ভুল প্রকল্প বাছাই এবং দুর্নীতির কারণেই চরম দুর্দশায় পড়েছে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে বিপর্যস্ত একটি দেশ এবং সেই দেশের মানুষেরা।

সিন্ধুর টিপ সিংহল দ্বীপ, ২ কোটি ২২ লাখ জনসংখ্যার শ্রীলঙ্কায় গণবিক্ষোভ শুরু হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তার ঢেউ এসে খানিকটা আছড়ে পড়ে। শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি দেখে বাংলাদেশেও এ রকম হবে বলে একদল প্রচারে পঞ্চমুখ হচ্ছে। তাদের যুক্তি, বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান উৎস হচ্ছে প্রবাসীদের দেশে পাঠানো অর্থ। কোনো কারণে তাতে ধস নামলে, বিকল্প হিসেবে তৈরি পোশাক রপ্তানির আয় দিয়ে তা সামলানো কঠিন হবে। দুর্নীতি, অর্থ পাচার, স্বজনপ্রীতি, আত্মীয় তোষণ, অব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিহীন শ্রীলঙ্কার থেকে বাংলাদেশেও কম নয়; বরং ক্ষেত্রবিশেষে তা মাত্রা ছাড়িয়েছে। অর্থ পাচার আর কালোটাকার দাপাদাপিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অচল হতে সময় নেবে না। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে ভয়াবহ সামাজিক অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক সংকট দেখা দেবে। ক্ষমতায়নে এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে দলের প্রতি আস্থাভাজন এবং স্বজনদের প্রাধান্য দেওয়া এখন অনেকটাই যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। স্বজন তোষণ-পোষণে শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশও কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সংসদ সদস্যের বেশির ভাগই ব্যবসায়ী। বিস্তর টাকা ছড়িয়ে, মনোনয়ন কিনে নিয়ে এমপি হয়েছেন। তাঁরা বিপুল অর্থ লগ্নি করেছেন সদস্যপদপ্রাপ্তির জন্য। প্রজ্ঞাহীন এসব সংসদ সদস্য নিজের স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভাবেন এবং ক্ষমতার বলয়ে টিকে থাকতে পেশিশক্তির ওপর নির্ভরশীল। দেশের ক্রান্তিকালে আত্মসর্বস্ব তাঁদের কাছ থেকে কিছুই আশা করা যায় না।

শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের আরেকটি মিল হচ্ছে, বৈদেশিক ঋণে উন্নয়ন প্রকল্প। বিরোধীরা একে ‘ঋণ করে ঘি খাওয়া’ বলছেন। তাঁদের কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে সীমাহীন দুর্নীতির কারণে প্রকল্প ব্যয় পৃথিবীর প্রায় সব দেশের চেয়ে বেশি। আর তাই ঋণের অর্থে এসব ‘শ্বেতহস্তী’ মেগা প্রকল্প একসময় জনগণের ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়াবে। উদাহরণ দিতে তাঁরা আঙুল তুলে দেখিয়ে দিচ্ছেন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ প্রকল্পটির জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে ২০ বছরের মেয়াদে ১ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ করা হয়েছে। ২০২৫ সাল থেকে প্রতিবছর ৫৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার করে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। বিদেশি ঋণের জন্য কিস্তি হিসেবে বাংলাদেশকে ২০২৪ সাল থেকে প্রতিবছর ৪০০ কোটি ডলার করে পরিশোধ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তাঁরা ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির কথাও উল্লেখ করতে ভুলে যাননি। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমতির দিকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধিতে সমাজের একটি বিশাল অংশের মানুষ দুঃসহ জীবনযাপন করছেন, তাতেও উদ্বিগ্ন হচ্ছেন অনেকেই।

মইনুল হাসান আর যাঁরা ভাবছেন যে শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতির মোকাবিলা বাংলাদেশকে কখনোই করতে হবে না, তাঁদের যুক্তিতেও ধার খুব একটা কম নেই। প্রথমত, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সপ্রবাহ বরাবরের মতোই গতিশীল। কারণ প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর সরকার যে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দিচ্ছিল, সেটি এখন বাড়িয়ে আড়াই শতাংশ করা হয়েছে। ফলে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং প্রবাসীদের অর্থ অনর্থ বাধাবে—এমন কোনো আশঙ্কা দূর ভবিষ্যতেও দেখা যাবে না।

সেই সঙ্গে তাঁরা যুক্তি দিচ্ছেন যে দক্ষিণ এশিয়ার চারটি বড় অর্থনীতির দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ভারত থেকে খানিকটা পিছিয়ে থাকলেও শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে, অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার পর দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা পাকিস্তানের, বাংলাদেশের নয়। কারণ শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তান দুই দেশের জিডিপি একত্র করলেও বাংলাদেশের জিডিপি তার চেয়ে বড়। তা ছাড়া, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের রপ্তানির চেয়েও বেশি। অধিকন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভ ৪ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সম্মিলিত রিজার্ভের দ্বিগুণ।

আর শ্রীলঙ্কা অনুৎপাদনশীল প্রকল্পের জন্য চড়া সুদে ঋণ নিয়েছে। এসব প্রকল্প বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, ফলে সেগুলো প্রায় সবই পরিত্যক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে তা হয়নি। তাঁরা জোর গলায় জানিয়ে দিয়েছেন যে বাংলাদেশে কখনোই লঙ্কার মতো লঙ্কাকাণ্ড ঘটবে না।

বাংলাদেশও শ্রীলঙ্কার ভাগ্য বরণ করুক, এটা মোটেই কারও কাম্য হতে পারে না। তবে পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে, নিজের বাড়ি রক্ষা পাবে কি না, এ নিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে তর্ক-বিবাদে লিপ্ত হয়ে কাল ক্ষয় করা মোটেই উচিত হবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোভিড অতিমারির হাত ধরে এসেছে মানবসৃষ্ট বিপর্যয় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। পৃথিবীজুড়ে খাদ্যসংকট দেখা দেবে না, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। বিশ্বায়নের এ যুগে বিশ্বের কোনো একটি দেশে দুর্যোগ দেখা দিলে তা সবাইকে ছুঁয়ে যায়। নৌকার তলদেশের এক পাশে ছিদ্র হলে অন্য পাশে সরে গেলে রক্ষা পাওয়া যাবে না, তা চরম নির্বোধ ব্যক্তিটিরও না বুঝতে পারার কথা নয়। সাধারণ মানুষ অর্থনীতির জটিলতা বোঝে না। কূটনীতির কুটিলতা তাদের স্পর্শ করতে পারে না। রাজনীতির নীতি-রীতিও তাদের মাথায় তেমন ঘোরে না। তাদের চাওয়া শুধু একটু স্বস্তি, শান্তির জীবন।

আমাদের দেশের নীতিনির্ধারক এবং রাজনীতিকেরা নিশ্চয়ই জানেন যে ক্ষুধার জ্বালার সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনো কষ্টের তুলনা হয় না। এমনিতেই পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী হচ্ছে মানুষ। আর এই মানুষের মধ্যে আরও বেশি ভয়ংকর হচ্ছে ‘ক্ষুধার্ত মানুষ’। ক্ষুধার্ত মানুষ বাঘের গায়ে কামড় বসাতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত