Ajker Patrika

মেয়েজীবনের ভাষ্য ‘মেয়েলি ভাষা’

রুমা মোদক
আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২২, ১২: ৩৪
মেয়েজীবনের ভাষ্য ‘মেয়েলি ভাষা’

অভিযোগটি অর্জুনের লক্ষ্যভেদী তিরের মতো আমার দিকে ছুটে এসেছিল যেদিন, সেদিনই প্রথম আমি সচকিত হয়েছিলাম ব্যাপারটি নিয়ে। বেশ আগে। বছর ত্রিশ হবে। এর আগে আমি সত্যি তলিয়ে ভাবিনি বিষয়টি নিয়ে। শব্দটি আমার জন্য প্রয়োগ করেছিল আমার এক বন্ধু, লিঙ্গে পুরুষ। এক বন্ধুর ছোট বোনের বিয়ে নিয়ে আমার কৌতূহল ছিল এমন, বিরক্ত পুরুষ বন্ধুটি বলেছিল, ‘একদম মেয়েদের মতো করে করছ প্রশ্নগুলো।’

‘মেয়েদের মতো!’ আমি একদম প্রতিক্রিয়াহীন তার অভিযোগের মর্ম উপলব্ধি করেছিলাম। সৎ স্বীকারে সুস্পষ্ট পার্থক্যটা নির্ণয় করেছিলাম—কাকে বলে ‘মেয়েদের মতো’, ঠিক কী বললে তাকে বলে মেয়েলিপনা। কথায় কিংবা আচরণে মেয়েদের আলাদা ভাষা থাকে। মেয়েলি ভাষা। সাধারণে তা-ই বলে। আক্রমণে বলে, নেতিবাচকতায় বলে, ‘মেয়েদের মতো কথা বলো না।’

মেয়েরা কী ভাষায় কথা বলে? সেকি আমাদের নিত্যদিনের ব্যবহার্য ভাষা থেকে আলাদা কোনো ভাষা? আলাদা বর্ণমালায় গড়া? কেনই-বা সে ভাষা ‘মেয়েলি ভাষা’ বলে আলাদা হয়ে যায়? এই মেয়েলি ভাষার ব্যবহার কেন আমাকে কিংবা মেয়েদের আলাদা করে দেয় নেতিবাচক অর্থে?

এর কারণ শুধুই লিঙ্গবিশেষে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো বৈষম্য? নাকি সমাজ ও ব্যবস্থা আরোপিত অনস্বীকার্য বাস্তবতা। ব্যবস্থায় অঙ্কুরিত বীজের অনিবার্য ফলন। মেয়েরা কেন শুধুই ‘মেয়ে?’ কেন মেয়ে কেবলই ন-অর্থক শব্দ? মেয়েকেই কেন বলি মেয়ে নয়, মানুষ হও? মেয়ে কি তবে মানুষ নয়?

আমি লিঙ্গপরিচয়ে নারী। প্রাকৃতিকভাবে নারী। জৈবিকতায় নারী। মেয়ে। ব্যক্তিগতভাবে আমার সব সম্ভাবনা এবং সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমি কখনোই অস্বীকার করি না, করতেও চাই না আমি নারী কিংবা মেয়ে; বরং এই নারীত্ব নানা কারণে আমার অহংকার। কিন্তু তবু আমি অন্য নারীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারি না। মেয়েলি ভাষায় কথা বলতে পারি না। এটা আমার ইগোও নয়, অক্ষমতাও নয়। অন্য নারী যে আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেতে পারে না, এটা তারও অযোগ্যতা নয়, অহমিকাও নয়। আমি বরং স্বভাবজাত কারণ আবিষ্কার করি এবং বিবেচনাসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারি। ফলে সে নারী যে মেয়েলি ভাষায় কথা বলে তাকে মোটেই করুণা করি না, দোষ দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না; বরং তার সীমাবদ্ধতা আমাকে অপরাধী করে দেয়। পুরো সিস্টেমকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।

আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ আর প্রথাগত ব্যবস্থা বিবেচনা করলে মেয়েদের এই ‘মেয়ে’ হয়ে থাকার কারণগুলো স্পষ্ট চিহ্নিত করা যায়। চিহ্নিত করা যায় তাকে মানুষ হয়ে উঠতে বলার প্রবণতার উৎস।

তার আগে দেখি মেয়েরা কী ভাষায় কথা বলে, যাকে আমরা বলছি ‘মেয়েলি ভাষা’। মূলত তাদের সে ভাষা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সীমায়িত থাকে শাড়ি, গয়না, গাড়ি, বাড়িসংক্রান্ত বৈষয়িক লক্ষণগণ্ডিতে। সে লক্ষণগণ্ডি পোক্ত হয় স্বামীদের প্রতিষ্ঠাগত অবস্থানে। তার পরের ধাপে সন্তানকেন্দ্রিকতা আর সবশেষে আলোচনা উপসংহারে যায় পড়শি, পরিচিতদের হাঁড়িখুরি খুঁটে ভেতরের সত্য-অসত্য নানা রঙের কাহনে। মেয়েদের আড্ডা মানে তাই এক বহু বর্ণিল ট্যাবলয়েড। সত্য-মিথ্যায় মাখামাখি, মুখরোচক। আর মেয়েলি ভাষা তার অনুগামী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষের সংকীর্ণ অভ্যাস, হীনতা, হীনম্মন্যতার আকর এসব মেয়েলি আসর। এখানে জ্ঞান নেই, বিজ্ঞান নেই, দর্শন নেই। সমাজ, রাষ্ট্র কিচ্ছু নেই। সৃষ্টিশীলতা নেই, এমনকি সমাজ সংসারের জন্য দায়ও নেই।

একসময় দৈনিক পত্রিকায়, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মেয়েদের জন্য আলাদা পৃষ্ঠা ছিল, ছিল আলাদা বিষয়। আর সেসব বিষয়-আশয় আয়োজন ছিল ফ্যাশন, সাজগোজ আর রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ। এমনকি মেয়েদের লেখা সাহিত্যও স্থান পেত শুধুই মেয়েদের পাতায়। সেসবের ভাষা ছিল আলাদা। কিংবা আলাদা ভাষার কারণেই সম্পাদক-পাঠক মহলে এ লেখাগুলো পরিগণিত হতো মেয়েদের লেখা বলে।

আরেকটি খুব প্রচলিত বক্তব্য, ‘মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু’। শাশুড়ি-বউয়ের কিংবা বউ-শাশুড়ির। পড়শি বধূটি পড়শি বধূর। ননদ-ভাবির, কিংবা ভাবি-ননদের। নারীদের যত অশান্তি অসুখের সমীকরণ অধিকাংশই নারীতে-নারীতে।

এর দায় কী কেবল নারীরই? মেয়েরই? প্রশ্নটি আমি আমার শ্রেণিকক্ষে ছুড়ে দিই। আমাদের এই পশ্চাৎপদ সমাজে একটি মেয়ে যেভাবে বড় হয়, তার বাস্তব প্রেক্ষিত দেখি। স্কুল, কলেজ কিংবা কর্মজীবন শেষে মেয়ের জন্য চার দেয়ালের বন্দিজীবন। রান্নাবান্না, কাটাকুটি, ঘর-গেরস্থালি, সংসার-সন্তান। বড়জোর ঘরের অন্য নারীর শ্যেনদৃষ্টি, বাক্যবাণ। পুকুরঘাট থেকে রান্নাঘর, হালের হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার। সময়, প্রযুক্তি এগিয়ে যাচ্ছে। নারী তাল মেলাতে পারছে না, কিংবা তাকে তাল মেলাতে দেওয়া হচ্ছে না। সে পড়ে আছে কূপমণ্ডূকতায়, প্রথাবদ্ধ গণ্ডিতে। চ্যানেলে চ্যানেলে যে সিরিয়ালের হাজার পর্ব, তারও বিষয় সেই সংকীর্ণ ঈর্ষা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা।

নারীর জন্য অবকাশ কই? সুস্থ ভাবনার, সৃষ্টিশীল চর্চার? কোথায় গেলে সে পায় নিজেকে সমৃদ্ধ করার উন্মুক্ত মাঠ? আছে কি কোথাও?

একটি ছেলে কিংবা পুরুষ যেভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে বিশ্ববীক্ষণে-চা খানায়, মাঠে-ময়দানে, তুমুল আড্ডায়, ক্লাবঘর, স্টল, রেস্টুরেন্ট কিংবা পাড়ার মোড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়া দৈনিক পত্রিকার হালনাগাদ সংবাদে; তার জন্য যতটা খোলা পৃথিবী, জানা পৃথিবী, অজানা পৃথিবী, মেয়েদের জন্য ততটাই অবরুদ্ধ। এই মেয়ে ঘরে ঢুকেই শুনছে, জানছে, দেখছে মা-চাচির কটুকথা। পাড়া-পড়শি নারীর গায়ে পড়া কৌতূহল। এতসব হীনতার পাহাড় ডিঙিয়ে সুযোগ কই তার নিজের জগৎ গড়ার, নিজেকে গড়ার, উচ্চ মানসিকতার সৃষ্টিশীল জগৎ গড়ার? আমরা তাকে গড়ে ওঠার সামান্য সুযোগ না দিয়েও তার ভাষাকে অপরাধী করছি ‘মেয়েলি ভাষা’ বলে। তার অযাচিত আচরণকে হেয় করছি মেয়েলিপনা বলে!

নিশ্চয়ই ব্যক্তি মানুষের হোক সে নারী কিংবা পুরুষ তার নিজস্ব দায় রয়েছে মানুষ হয়ে ওঠার। সব সুকোমল বৃত্তির উন্মেষের অনুকূলে নিজেকে পরিচালিত করা। কিন্তু বাইরে বাদ থাকুক ঘরের জগৎই-বা তার জন্য কতটা নিরাপদ, নির্ভীক করে রাখা হয়েছে যে সে তার নিজের ভুবন গড়বে! ধর্ষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন—অভিধানের এই শব্দগুলো তো নারীর জন্যই প্রযোজ্য কেবল।

চোখের সামনে কত মেধাকে বিসর্জিত হতে দেখলাম জীবনসঙ্গী, পরিবার কিংবা সমাজের যূপকাষ্ঠে। কত সম্ভাবনাময় নারী শিল্পী, অভিনেত্রী, লেখিকা নিজের প্রচণ্ড ইচ্ছা আর চেষ্টাকে ভাসিয়ে দিলেন শুধু অন্যের ইচ্ছায়।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তাকে নিজের ইচ্ছে পূরণের সামর্থ্য দেবে আমাদের সমাজে, এ-ও বড় জটিল অঙ্ক। মূল্যবোধ বদলায়নি, দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। অর্থনৈতিক প্রয়োজনে যে নারী বেরিয়ে এসেছে বাইরে, তার ঘাড়ে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো চেপে বসে সব দিক দুহাতে সামলানোর দায়। এ হয়তো শুধু লাঘব করেছে তার আধিপত্য হারানোর অনিশ্চয়তা। যেমনটি এক প্রজন্ম আগেও চরম ছিল বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্বে।

হায় মেয়েজন্ম! জন্মই তার আজন্ম পাপ। তবু সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বের হয়ে আসে যে মেয়ে, আসতে পারে সে, সে-ই মেয়েদের কথা বলুক, যে বলতে পারেনি তার না-পারার কারণ। মেয়ের মেয়েলি ভাষা হোক তার জীবনেরই বিশ্বস্ত ভাষ্য। নিশ্চয়ই মানুষের কিছু দায় থাকে মানুষের জন্য। নারী হোক কিংবা পুরুষ। সক্ষম ও সফল নারী তার দায়বোধ করুক। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এটুকু আশা করা নিশ্চয়ই অন্যায় কিছু হবে না।

রুমা মোদক, সাহিত্যিক 

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত