Ajker Patrika

‘ভেজাল’ই শুধু খাঁটি আর সবই মিথ্যা

এম আর খায়রুল উমাম
‘ভেজাল’ই শুধু খাঁটি আর সবই মিথ্যা

জেলা শহরের এক পরিচিত স্বর্ণকার। দীর্ঘদিনের পরিচয়ের সূত্রে পরিচিতজনদের মধ্যে কারও স্বর্ণালংকারের প্রয়োজন হলে সঙ্গে করে নিয়ে যাই। হাতের কাজ সুন্দর হওয়ার কারণে সবাই খুশিই হয়। এক সহপাঠীর বোনের বিয়ে। বোনের জন্য সে ছয়টি চুড়ি তৈরি করবে জানালে তাকেও সেই স্বর্ণকারের কাছেই নিয়ে যাই। আন্তরিক আপ্যায়নের পর সহপাঠী সাতটি চুড়ি তৈরি করতে বলেন। ভরিতে দুই আনা খাদ দেওয়ার কথাও বলেন। সাতটি চুড়ির কথা শুনে প্রাথমিকভাবে অবাক হলেও বাইরে এসে কারণ জানতে চাইলে সহপাঠী বলে, ‘পরে দেখতে পাবে কী করব।’

স্বর্ণকারের দেওয়া নির্ধারিত দিনের এক দিন পর চুড়ি আনতে গেলাম। সত্যি চুড়িগুলো খুব সুন্দর হয়েছে বলে উপস্থিত সবাই খুশিও হলো। আলাপচারিতার একপর্যায়ে সহপাঠী সাতটির মধ্য থেকে একটি চুড়ি নিয়ে স্বর্ণকারকে বলে, এটা গলিয়ে দেখুন কতটা সোনা আছে। স্বর্ণকার বহু যুক্তি দিয়ে নানাবিধ ক্ষতির কথা বোঝানোর পরও সে নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থেকে বলে, যা ক্ষতি হবে তা সে মেনে নেবে এবং স্বর্ণকারকে তার মজুরি সে দিয়ে দেবে। একসময় বাধ্য হয়েই স্বর্ণকার একটা চুড়ি গলানোর পর দেখা গেল সেটিতে ছয় আনা খাদ আছে। তখন সহপাঠী বলল, এবার আপনি হিসাব করুন আমাকে কতটা সোনা দেওয়ার কথা আর কতটা দিয়েছেন, সঙ্গে সাতটা চুড়ির মজুরিই বা কত নিয়েছেন। উপস্থিত সবারই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। সোনায় খাদ না মেশালে গয়না তৈরি করা যায় না, এটা ঠিক। কিন্তু কত খাদ মেশানো হবে, তার কোনো সীমা-পরিসীমা থাকবে না!

একটা সময় ছিল যখন মানুষ, বিশেষ করে রোগী দেখতে গেলে ফল কিনে নিয়ে যেত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ফলকে তাজা রাখার জন্য রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে মানুষ ফল কেনা বাদ দিতেই বাধ্য হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক থেকে বাঁচার জন্য বহু পথ ও পদ্ধতির আগমন ঘটেছে। কিন্তু এতেও খুব একটা উপকার হয়েছে বলে মনে হয় না।

সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার বন্ধের বিভিন্ন পদক্ষেপও কার্যকর হয়নি। এর পর থেকে শুরু হয় রাসায়নিকমুক্ত ফল বিক্রির প্রচার। প্রশাসনও এ কাজে এগিয়ে আসে। শুরু হয় রাসায়নিকমুক্ত ফল বিক্রির বাজার। অনেকের হয়তো মনে আছে, ফরিদপুরের জেলা প্রশাসনে কর্মরতদের অনেকে এমন একটা ফলের বাজার উদ্বোধন করার পর তাঁদের পারিবারিক নাশতার টেবিলে রাখা ফল পরীক্ষা করে পেয়েছিলেন ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণ, বাস্তবতা এই যে দেশীয় কলা-মুলা থেকে শুরু করে বাজারের সব ফলেই রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বাজার থেকে একটা ফল কিনে আনার তিন মাস পরও তাতে পচন ধরে না। সারা দেশে এখন রাসায়নিকমুক্ত আমের বাজার রমরমা। কিন্তু আম ব্যবসায়ী আর ক্রেতা সবাই জানেন মুকুল আসার আগে থেকে গাছে রাসায়নিক ব্যবহার করতে হয়। তাহলে আম রাসায়নিকমুক্ত কীভাবে হলো? রাসায়নিকমুক্ত ফল তাই আকাশকুসুম কল্পনামাত্র।

ছোটবেলায় দেখতাম চালে কাঁকর মেশানো হতো। তাই প্রায় প্রতি বাড়িতেই দেখা যেত দুপুরে যে যেখানে পারে, বসে চাল বাছছে। বাসার রেডিওতে অনুরোধের আসর বা নাটক শোনার সুযোগে মাকে অনেকেই চাল বাছার কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। সময়ের পরিবর্তনে এল এক চালের সঙ্গে অন্য চালের মিশ্রণ-প্রক্রিয়া। কোন চালের সঙ্গে কোন চাল মেশালে কিছুটা অন্তত সমতা রক্ষা হয়, সেই বিবেচনার প্রয়োজনও কেউ বোধ করত বলে মনে হয়নি। যারা বাজার থেকে চাল কিনে খেত, তাদের সবাইকে এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হতো। আস্তে আস্তে মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হলো। তারা লাল চাল খেতে চায় না, মোটা চাল খেতে চায় না। তাই সাদা ধবধবে চালের জনপ্রিয়তা ও চাহিদা বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা লাল চাল, মোটা চাল, ইরি চাল সবই পলিশিং করা শুরু করে। ৫ থেকে ১৮ শতাংশ পলিশিং করে মিনিকেট, নাজিরশাইল, বাংলামতী ইত্যাদি বিভিন্ন নামে চাল বাজারজাতকরণ শুরু হলো। বিজ্ঞানীরা বলেন, কোনো চাল ১০ শতাংশ ছাঁটাই করলে তার প্রায় ৬০ ভাগ পুষ্টি কমে যায়। তাই বাঙালির প্রধান খাদ্য চাল আজ কী অবস্থায় আছে, তা আর বলার অপেক্ষা থাকে না।

ভেজালের ক্যানভাসটা দিন দিন বিশালাকার হয়ে যাচ্ছে। এমন কোনো ক্ষেত্র পাওয়া যাবে না যেখানে ভেজালের থাবা পড়েনি। শুধু খাদ্যে ভেজাল তা-ই নয়, প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বত্রই মানুষগুলোর মধ্যে ভেজালের রমরমা অবস্থান। তরমুজ লাল হয়ে যাচ্ছে, আনারস হলুদ করা হচ্ছে, নতুন পটোলে সিরিঞ্জ দিয়ে পানি ভরে দেওয়া হচ্ছে, চিংড়ির মধ্যে জেল ঠুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কাঁচকলা পেকে যাচ্ছে। তেল-মরিচ-লবণ কোনো জায়গায় ছাড় নেই। একটা ভাবনা প্রায় সব সময়ই মনে আসে যে একজন লোক তেলে ভেজাল দিয়ে লাভ করে ঘি কিনে খাচ্ছে। এই ঘিও যে ভেজাল তা কি ক্রেতা জানে না? যে ভেজাল দেয়, তাকেও ভেজালই খেতে হচ্ছে। মুক্তির কোনো পথ নেই। গ্রামের এক সাধারণ কৃষক কিন্তু জানতেন না কিসে কী দিলে কী হবে। তাঁকে লাভের লোভ দেখিয়ে এসব শিখিয়েছে জ্ঞানী মানুষেরাই। তাই খাদ্যে ভেজাল মেশানোর দায় কোনোভাবেই শিক্ষিতজনেরা অস্বীকার করতে পারবেন না।

শ্রমজীবী মানুষকে ভেজাল শিখিয়ে তথাকথিত শিক্ষিত লোকেরা নিজেরা ভেজালমুক্ত থাকবেন, তা কীভাবে সম্ভব?

ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্য নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যবৃদ্ধি করে লাভ করেন। আমদানি-রপ্তানি করে তাঁরা লাভের টাকা দেশে আনেন না। প্রকৌশলীরা মিস্টার টেন পারসেন্ট হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন। তাঁরা যেকোনো প্রকল্প নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ে শেষ করেন না। চিকিৎসকেরা ওষুধ কোম্পানির চাহিদামতো ব্যবস্থাপত্র এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চাহিদামতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করে থাকেন। ওষুধ কোম্পানির উপহার ও দেশ-বিদেশে আকাশভ্রমণের বাস্তবতায় রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজন, অপ্রয়োজনীয়তায় হারিয়ে গেছে। কিছু ক্ষমতাধর মানুষ ব্যাংকের সঙ্গে সৌহার্দ্য গড়ে শিল্প ও ব্যবসার নামে হাতিয়ে নেওয়া হাজার কোটি টাকা পাচার করছেন। ব্যাংক জালিয়াতি করছেন, ঋণখেলাপি হচ্ছেন আর নিজেদের অভিজাত জীবন গড়ে তুলছেন। শিক্ষকেরা শিক্ষাকে শ্রেণিকক্ষ থেকে কোচিং সেন্টারে নিয়ে গেছেন, গাইড-বইনির্ভর করেছেন এবং এখন গবেষণাপত্র নকল করে পিএইচডি করছেন। দিনে দিনে শিক্ষকেরা মর্যাদাহীন আর শিক্ষা মানহীন হয়েছে। পুলিশের ভেজালের কথাও অজানা নয়। তাদের কাউকে কাউকে রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায়। তাদের কারণে কার শাস্তি কার ঘাড়ে কখন চেপে বসবে, তা বলার ক্ষমতা কারও নেই। একজন প্রশাসনের ছোট-বড় যেকোনো চেয়ারে বসতে পারলেই ভাবেন, তিনিই রাজা। বিভিন্নভাবে প্রজাদের আইনের কথা বলে, নৈতিকতার কথা বলে, মূল্যবোধের কথা বলে, দায়িত্ববোধের কথা বলে ফাইল আটকে স্পিড মানির ব্যবস্থা করেন।

দেশের প্রতিটি সেক্টর আজ ভেজালে ভরে আছে। সব সেক্টরের ভেজাল নিয়ে কথা বলতে গেলে পরিসর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। রাজনীতিবিদ আর জনপ্রতিনিধিদের ভেজাল নিয়ে ইচ্ছা করেই কথা বললাম না। সাধারণ জনগণ এখানে প্রতিদিন যে ভেজাল দেখছে তা আর নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই না। তবে দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস করি, এখানকার ভেজাল বন্ধ করতে না পারলে অন্য সব জায়গায় ভেজাল উত্তরোত্তর বেড়েই চলবে। মানুষ দলে দলে ভেজালের দলই ভারী করছে।

ব্যতিক্রম হিসেবে সৎ মানুষের অভাব—এমন কথা বলতে চাই না। তবে এই সৎ মানুষগুলো সমাজের চোখে বোকা মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে নিজেদের নির্লিপ্ত-নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছেন। 
আমাদের মানুষগুলো এমন ভেজাল হয়ে যাচ্ছে কেন? জানি না ইতিহাসবিদ বা সমাজবিজ্ঞানীরা বিষয়টা কীভাবে দেখছেন এবং ভাবছেন? অতীতের দিকে তাকালে তো দেখা যায়, আমরা কারও কাছ থেকে যতটা না ভালো গুণ গ্রহণে সমর্থ হয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ গুণের অধিকারী হয়েছি। ভেজাল দ্রব্য ফেলে দিয়ে হয়তো ভেজালমুক্ত হওয়া সম্ভব, কিন্তু ভেজাল মানুষ?

লেখক: এম আর খায়রুল উমাম, সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত